চন্দন দাস: বহরমপুর
‘নির্মূল করতে হবে বামপন্থীদের যাতে তারা আর কোনও দিনও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।’ বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের এটিই ডাক।
শত্রু তৃণমূল নয়। নিশ্চিহ্ন করতে হবে বামপন্থীদের। এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস’র লক্ষ্য তাই। কারণ, সঙ্ঘের আশঙ্কা ‘ফুটে বেরতে পারে বামপন্থীরা।’
না, ভাষণ নয়। রীতিমতো ছাপানো বক্তব্য। মুর্শিদাবাদ সঙ্ঘের মধ্যবঙ্গ বিভাগের মধ্যে পড়ে। মমতা ব্যানার্জির শাসনে হিন্দুত্ববাদীরা বৃদ্ধির কতটা সুযোগ পেয়েছে, ‘মধ্যবঙ্গ’ বলে আরএসএস’র আলাদা বিভাগ খুলে বসা তার প্রমাণ। গত পাঁচ বছরে মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বীরভূম সহ পাঁচটি জেলা নিয়ে তৈরি সঙ্ঘের এই বিভাগেই শাখা, মিলন সহ আরএসএস’র বিস্তার সবচেয়ে বেশি। বহরমপুরনিবাসী সেই বিভাগের এক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীর কথায়, ‘‘মুর্শিদাবাদে ৬টি আসন এবং নদীয়ায় অন্তত ১৪টি আসন বিজেপি জিতবে বলে আমরা আশা করছি। বীরভূমেও আমরা ভালো ফল করতে পারি।’’ নির্বাচনে অংশ নেয় না বলে দাবি করা ‘সাংস্কৃতিক সংগঠন’ আরএসএস এই নির্বাচনী ময়দানে বিজেপি’কে ‘আমরা’ বলেই চিহ্নিত করছে। লালগোলার মতো সংখ্যালঘু নিবিড় এলাকাতেও আরএসএস স্বয়ংসেবক পাঠিয়েছে বিজেপি’র হয়ে প্রচারের জন্য।
মুর্শিদাবাদে ২২জন বিজেপি প্রার্থীর মধ্যে ১২ জন আরএসএস’র লোক। যেখানে আরএসএস’র প্রার্থী নেই, সেখানেও বিজেপি কর্মী, সমর্থকদের মধ্যে সেই লেখা বিলি করা হচ্ছে। রচনাটি রাজ্যে সঙ্ঘের অন্যতম সংগঠক শিবেন্দ্র ত্রিপাঠীর। নন্দীগ্রামের যে এলাকায় ত্রিপাঠীর বাড়ি সেই এলাকা থেকেই বিজেপি’র নেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে তৃণমূল প্রার্থী খুঁজে বের করেছেন অভিষেক ব্যানার্জি, যাঁর বিরুদ্ধে ইডি, সিবিআই সহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলি গত ১২ বছরে দুর্নীতির কোনও প্রমাণ খুঁজে পাননি।
শিবেন্দ্র এখন কলকাতাতেই থাকেন মূলত। তবে তাঁর লেখা মুর্শিদাবাদের কেন্দ্রগুলিতে বিজেপি কর্মীদের উজ্জীবিত করতে বিলি করা হচ্ছে শুনে কোনও মন্তব্য করলেন না সঙ্ঘের দক্ষিণবঙ্গের সহ প্রচার প্রমুখ। লালগোলার বিজেপি প্রার্থী অমর দাস অবশ্য জানালেন, ‘‘লেখাটি আমরা আমাদের কর্মীদের সঠিক দিশা দেখাতে পড়াচ্ছি। আমার কেন্দ্রে এসআইআর’র পরে হিন্দু ভোটদাতা পৌঁছেছে প্রায় ৩০ শতাংশে। আমরা এই কেন্দ্রে নির্দিষ্টভাবে তৃণমূলকে প্রধান শত্রু বলে বিবেচনা করছি না।’’
কেন? সঙ্ঘ বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষে কী বলছে, উত্তর আছে সেখানে।
‘বঙ্গের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধ্বংসকারী বামপন্থীদের চিরতরে নির্মূল করতে হবে’ শীর্ষক প্রবন্ধটিতে লেখা হয়েছে, ‘‘এই বামপন্থী নামের জীবাণুগুলি পশ্চিমবঙ্গে আজ অস্তিত্বহীন হয়েছে বটে কিন্তু সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। শরীরের কোথাও কোথাও অল্প হলেও জীবিত আছে। ওদের অস্তিত্ব চিরতরে শেষ না করলে বাঙালি বাঁচবে না।’’ অর্থাৎ প্রথম, প্রধান শত্রু বামপন্থীরা। আসন সংখ্যা শূন্য হলেও। তবে তৃণমূল সম্পর্কে কী কৌশল সঙ্ঘের বিধানসভা নির্বাচনের আগে? বিশেষত যখন ‘তৃণমূল তাড়াও’ এখন খুব স্পষ্ট এক দেওয়াল লিখন। দেবীপুর পঞ্চায়েতের বিজেপি কর্মী হাতে তুলে পড়ালেন প্রবন্ধটি। সঙ্ঘের পক্ষ থেকে লেখা হয়েছে, ‘‘আপনারা বলতে পারেন তারা তো আজ শূন্য। না, তারা শাসনে প্রশাসনে শূন্য হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চিরতরে মরেনি, সমাজে আত্মগোপন করে আছে। উপযুক্ত সময় ও সুযোগ পেলে আবার ফুটে বেরোবে। তাই বাঙালির কর্তব্য আগামীদিনে বাঙালির এই শত্রুটিকে এমনভাবে নির্মূল করতে হবে যাতে তারা আর কোনও দিনও পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।’’
হরিহরপাড়ার সিপিআই(এম) প্রার্থী, পার্টির মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির সম্পাদক জামির মোল্লার কথায়, ‘‘বিজেপি, তৃণমূল যোগাযোগ রেখে চলছে। আমরা বুঝতে পারছি। সামগ্রিকভাবে তৃণমূল বিরোধী একটি স্রোত আছে মানুষের মধ্যে। বিজেপি সেই পরিস্থিতিতে হিন্দুদের এককাট্টা করে ভোট নিতে চাইছে। এমনকি বিজেপি-পন্থী মুসলমানদের একাংশকে নির্দল অথবা বিভিন্ন দলের নামে প্রার্থী করেছে। যাতে তৃণমূলের উপর ক্ষুব্ধ গরিব সংখ্যালঘুদের ভোট ভাগ করে দিয়ে তারা জিততে পারে। তাঁদের ভয়ের কারণ মুর্শিদাবাদে একটি। প্রথমত, আমরা লাগাতার আন্দোলন সংগ্রামে আছি। সেই আন্দোলনে হিন্দু-মুসলমান সব অংশের মানুষ আছেন। আর মুর্শিদাবাদের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস হলো, হিন্দু প্রধান গ্রামগুলিতে বামপন্থীরা শক্তিশালী থেকেছে। তার প্রভাবও আছে।’’
মুর্শিদাবাদে নাম বাদ গিয়েছে ৪ লক্ষ ৫৫ হাজার ১৩৭ জনের। তাঁদের বড় অংশ সংখ্যালঘু মুসলমান। প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় ‘অনুপ্রবেশ’-এর নামে তীব্র সংখ্যালঘু-বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে লাগাতার। এই প্রচারে ধর্মের নামে হিন্দুদের তৃণমূল বিরোধী অংশের ভোটকে বিজেপি হাসিল করতে চাইছে। আর তীব্র তৃণমূল বিরোধী হয়ে ওঠা সংখ্যালঘুদের ভোট নানাভাবে ভাগ করার কৌশলও সঙ্ঘের। দু’টি কৌশলেরই লক্ষ্য এক— বামপন্থীদের ‘নির্মূল’ করা।
এই অবস্থায় ভাঙনের সমস্যা সমাধান, কাজের সঙ্কট নিরসন, ফসলের দাম বামপন্থীদের প্রচারের প্রধান বিষয়। লালগোলার সিপিআই(এম) প্রার্থী বাবলুজ্জামান ওই এলাকার দীর্ঘদিনের বামপন্থী আন্দোলনের কর্মী। যশইতলা মোড়ে প্রচার শেষে বললেন, ‘‘কয়েক হাজার ছেলে বাইরে কাজ করে। তাঁরা ফিরছে। যোগাযোগ করছে। তরুণদের মধ্যে আমাদের পক্ষে ইতিবাচক সাড়া দেখতে পাচ্ছি। আর আছে পদ্মার ভাঙনের সমস্যা। অনেক মানুষ গত কয়েক বছরে ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ের কোনও ব্যবস্থাই সরকার করেনি। আমাদের প্রচারের বিষয় প্রধানত এগুলি। তাছাড়া কিছু স্থানীয় সমস্যা আছে।’’
Comments :0