মালিনী ভট্টাচার্য
২০২৬ সালটি মানুষের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে মনে হয়, যদি মানব প্রজাতি এর ধাক্কা সামলে উঠতে পারে। এর একেবারে গোড়াতেই লাতিন আমেরিকার একটি সার্বভৌম দেশে বোমার হামলা করে রাষ্ট্রপতির আবাসে ঢুকে তাকে হাতকড়া পরিয়ে তুলে এনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েদখানায় বন্দি করে ফেলা হলো। যে অজুহাতে তা করা হলো সেই মাদক ব্যবসায়ীদের নিধন ঘটল কিনা বা ভেনেজুয়েলার মানুষ এ নিয়ে কী ভাবল তাও আমরা জানি না, কিন্তু দেখা গেল তার তেলের ব্যবসা দখল করে নিয়ে ট্রাম্প পছন্দসই দেশের কাছে বিক্রির জোগাড় করছে। পরের ধনে পোদ্দারি যাকে বলে।
ষাটের দশক থেকে সমাজতান্ত্রিক কিউবার মানুষের ওপর নানা আন্তর্জাতিক নিষেধের বোঝা চাপিয়ে রেখেছে মার্কিন সরকার। এবছরে সামরিক ঘেরাবন্দি জোরদার করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হলো সেখানে অন্যদেশ থেকে তেল আমদানি, তার বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, খাদ্যব্যবস্থাকে গভীর সঙ্কটে ফেলে। আর ফেব্রুয়ারির শেষদিনে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে যে আলোচনা চলছিল, আচমকাই তার মাঝখানে ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ মদতে ইজরায়েল সরকার কয়েকমাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার তেহরান সহ বিভিন্ন শহরে বোমাবর্ষণ করল যার প্রথম ধাক্কাতেই নিহত হলো একটি প্রাথমিক স্কুলের শিশু-ছাত্রীরা। সিআইএ’র প্রদর্শিত নিশানায় বেপরোয়া আক্রমণ করে খতম করা হলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইকেও।
ভেনেজুয়েলার উল্লেখ যেমন কিছুদিন হল মিডিয়া থেকে অন্তর্হিত হয়েছে, ইরানের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি, কারণ ইরান বহুদিন ধরেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল। তারা হামলার জবাব দিয়েছে যদিও এটা তারা এখনও স্পষ্টভাবে বলছে যে তারা শুধু নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকারই প্রয়োগ করছে, আলোচনার মাঝখানে এক সার্বভৌম দেশের ওপর আক্রমণের বিশ্বাসঘাতকতা তারা কোনোমতেই মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। বরং ইরানের ইসলামিক সরকারের বিরুদ্ধে দেশের ভিতর যে অসন্তোষ পাকিয়ে উঠছিল তা বহিঃশত্রুর আক্রমণের সামনে কিছুটা চাপা পড়ে গেছে। মার্কিনিদের সাহায্যে সরকার পালটানোর প্রস্তাবকে ইরানের মানুষ আপাতত বাতিল করে দিয়েছেন বলেই মনে হয়।
ফলস্বরূপ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ভয়ঙ্কর অস্থিরতা এবং প্রসারমান যুদ্ধের অশনিসংকেত দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে আবার হঠাৎ করেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যেও একদফা গোলাগুলির বিনিময় হয়ে গেছে। পাকিস্তান সরকার এখন কাদের অঙ্গুলিহেলনে চলছে খেয়াল রাখলে এখানেও ট্রাম্পের সাঙ্গোপাঙ্গদের উপস্থিতির গন্ধ মিলতে পারে।
ঘটনার এই ঘনঘটা আমাদের ভুলিয়ে দিয়েছে গাজায় এখনো নামকা ওয়াস্তে এক যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যেই ইজরায়েল-কৃত গণহত্যার তালিকায় রোজ যুক্ত হচ্ছে অসংখ্য শিশু-সহ বহু সাধারণ মানুষের নাম; রোজ বেআইনি দখলদারদের দিয়ে প্যালেস্তিনীয় মানুষকে উৎখাত করা চলেছে তাদের বাসভূমি থেকে; ইজরায়েলী সেনার গুলিতে যারা মরছে তারা ছাড়াও ক্ষুধায়, শীতে, চিকিৎসার অভাবে রোজ মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ। এখন এমনই মনে হচ্ছে যে গাজায় গত তিনবছর ধরে বা তারও অনেক বছর আগে থেকে চলে-আসা ইজরায়েলী আগ্রাসন এবং শেষতক খোদ ট্রাম্পকে সর্দার বানিয়ে বোর্ড ফর পিসের নামে পাকাপাকি লুটের ব্যবস্থাকে যে ঠেকানো যায়নি, সেটাই ভেনেজুয়েলা বা ইরানের ওপর হামলাকেও মদত জুগিয়েছে।
১৯৪৭-এ ভারত যখন স্বাধীনতা পেল তার পর থেকে আমরা কখনো আজকের মতো অবস্থায় পড়িনি যখন সাম্রাজ্যবাদ একেবারে আমাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে। ১৯৪০-৫০-এর দশকগুলি জুড়ে আগেকার উপনিবেশগুলি নিজেদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দেশছাড়া করেছিল; সেই সংগ্রাম তাদের যে মূল্যবোধ দিয়েছিল তার মূলকথাই ছিল সার্বভৌমত্ব, দখলদারির বিরোধিতা এবং শান্তি ও পারস্পরিক আলোচনার স্বার্থে জোট। পঞ্চশীলের নীতিতে যার প্রকাশ। সে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। এই মূল্যবোধগুলিকে একেবারে ধূলিসাৎ করে ‘যো জিতা ওহি সিকন্দর’ এই নীতিকে ত্রিশের দশকের ফ্যাসিবাদের জমি থেকে নতুন জীবন দিয়ে তুলে এনে তা নিয়েই লড়াই লড়ছে আজকের সাম্রাজ্যবাদ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছিল সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত রাশিয়ার জনগণের বীরত্বের কাছে সেই ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পরাজয়ের প্রেক্ষাপটে। তখন ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীরাও বাধ্য হয়েছিল তাদের যুদ্ধক্লান্ত দাঁত নখগুলিকে অনেকখানি লুকিয়ে ফেলতে। নতুন করে মুনাফার সাম্রাজ্য স্থাপনে তারপরে অনেকদিন পর্যন্ত তারা দক্ষিণ ভূগোলকের সদ্যমুক্ত দেশগুলিতে প্রভাব বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করেছে মূলত অর্থনৈতিক হাতিয়ার—ওয়াশিংটন-অবস্থিত আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার ও বিশ্বব্যাঙ্কের শর্তযুক্ত ঋণ, অবাধ বাণিজ্যের লোভ-দেখানো নানা বাণিজ্যচুক্তি, অমান্য করলে অর্থনৈতিক নিষেধের ব্যবস্থা ইত্যাদি। স্বভাবতই এর মূল ক্ষীরটা ওয়াশিংটনই খেয়েছে। কিন্তু গত দু’-তিনমাস ধরে এটা খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে যে নিজেদের অস্তিত্বরক্ষার জন্যই সীমিত বশ্যতা নয়, বিশ্ব জুড়ে আবার নতুন করে দাসত্বের শর্তে নতুন উপনিবেশ তৈরি করতে বদ্ধপরিকর সাম্রাজ্যবাদ। যেখানেই এর পথে কোনো বাধা আসবে সেখানেই তাদের সামরিক শক্তি নেমে পড়বে অবাধ ধ্বংসলীলায়। গাজা, ভেনেজুয়েলা বা ইরানে যেসব অবিশ্বাস্য ঘটনা আমরা দেখতে পাচ্ছি সেসব তারই নিদর্শন।
তাই আজ আবার রব তোলা হচ্ছে, সাম্রাজ্যবাদীরা এক হও! ইউরোপের দেশগুলিতে বা আমেরিকায় নানাশ্রেণির সাধারণ মানুষের মধ্যে আমরা মার্কিন-ইজরায়েলী বর্বরতার বিরুদ্ধে, নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন দেখেছি। তা দেখা গেছে আমেরিকা বা ইজরায়েলের মধ্যেও। দেশ-বিদেশের ইহুদিরাও আগ্রাসী জায়নিজম-এর বিরুদ্ধে বলেছেন: আমাদের নামে এ বর্বরতা চলবে না। কিন্তু ইউরোপ-কানাডায় যারা রাজনৈতিক নেতৃত্বে রয়েছে তারা মুখে অনেক সময়ে ট্রাম্প বা নেতানেয়াহুর বাড়াবাড়ির প্রতিবাদ করলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মঞ্চে বা রাষ্ট্রসঙ্ঘে স্পেন ছাড়া প্রায় কেউই এমন কোনও পদক্ষেপ নেয়নি যা অনেকে একত্রে নিলে এই সাম্রাজ্যবাদী ধ্বংসলীলা বন্ধ হতে পারত।
তাই আজ মার্কো রুবিও—মার্কিন সরকারের সেক্রেটারি অফ স্টেট—প্রকাশ্যে এই স্পর্ধিত আওয়াজ তুলতে পারে যে ‘খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী পাশ্চাত্য শক্তিসমূহ’ এক হও, তোমাদের ‘হৃতগৌরব উদ্ধার করো’। ‘আমেরিকাকে আবার মহৎ করো’ ট্রাম্পের এই বুলিকে রুবিও আরও বিস্তৃত করতে চাইছে ‘ পাশ্চাত্যকে আবার মহৎ করো’ এই রণধ্বনিতে। সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ লেগেই থাকবে কারণ তাদের হারাবার আছে অনেককিছুই। কিন্তু পূর্ব-উপনিবেশগুলির সমস্ত সম্পদের বখরা পাবার লোভে বর্বরতার সঙ্গে তারা আপস করেই চলেছে। মুখে ধর্মীয় ক্রুসেড বা অগ্রগামী সভ্যতার যে বড়াই করা হচ্ছে তার ফাঁকি ধরা পড়ে সৌদি আরবের মতো কট্টরপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল সরকারগুলির সঙ্গে তাদের আবহমান দোস্তিতে।
প্রশ্ন হলো, ভারতে আমরা সাম্রাজবাদের এই নতুন আগ্রাসনকে কীভাবে দেখছি। আমাদের বিদেশনীতি ইতিপূর্বে কী ছিল আর বিজেপি’র কবলে পড়ে কী হয়েছে তা নিয়ে বিতর্ক তো চলছেই। ট্রাম্পের যে বাণিজ্য করের নীতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টই বাতিল করে দিয়েছে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সে সুযোগ নিয়েও তার ফাঁদ থেকে বেরোতে পারলেন না, তা থেকেই তো বোঝা যায় স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের ধারণাকে তিনি কার পায়ে বিসর্জন দিয়ে এসেছেন। ইতিমধ্যে তিনি লজ্জা ঘৃণা ভয় ঝেড়ে ফেলে ইজরায়েলে আগত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিজেকে তুলে ধরার জন্য যখন আন্তর্জাতিক অপরাধীর ছাপ-মারা নেতানেয়াহুকেও জড়িয়ে ধরলেন, ইজরায়েলের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে ইজরায়েলকে ‘ফাদার-নেশন’ এবং ভারতকে ‘মাদার-নেশন’ বলে উচ্ছ্বসিত হলেন, তখন বিতর্ক আরও জোরদার হয়ে উঠে গেল।
তিনি ফিরে আসার ঠিক পরের দিন ইরানের ওপর হামলা করল ইজরায়েল। ‘বিশ্বগুরু’ নীরব রইলেন, ভুলে গেলেন ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের মৈত্রী, কাশ্মীর নিয়ে ইরানের ভারতের পাশে দাঁড়ানোর কথা, ইরানের কাছে সুবিধাজনক দরে তেল কিনতে পারার কথা, ভুলে গেলেন ইজরায়েলী ক্ষেপণাস্ত্রে গান্ধীজীর নামাঙ্কিত হাসপাতাল এবং ইরানে ভারতীয় বিনিয়োগে তৈরি চা বাহার বন্দর ধ্বংস হবার কথা। যা আজ প্রকট তা কিন্তু ঘটছিল আরও অনেক আগে থেকেই। মার্কিন-ইজরায়েলী অক্ষশক্তির সঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একের পর এক সামরিক ও প্রযুক্তিগত চুক্তি পার্লামেন্টের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে নিষ্পন্ন করে মোদী যেদিকে চলেছিলেন, আজ শুধু তা নীতি-নৈতিকতার ঘোমটা খুলে সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে চলে এল।
কিন্তু স্বাধীনতা-সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যে দেশ গেছে সে দেশের মানুষের উপযোগী ব্যাপক প্রতিবাদ গাজার গণহত্যা, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন বা ইরানের ওপর ইজরায়েলী হামলা নিয়ে আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি না কেন? আমরা কি এমনই ভেবে নিশ্চিন্ত আছি যে উপরোক্ত দেশগুলিতে আমরা যেধরনের আক্রমণ দেখেছি সেধরনের হামলা তো আর আমাদের দেশে হবার সম্ভাবনা নেই। তাই সোশ্যাল মিডিয়াতে ক্ষেপণাস্ত্রের তুবড়িবাজি দেখে রোমাঞ্চিত হলেও তা নিয়ে দুশ্চিন্তা অবান্তর? বড়জোর যেসব ভারতীয় ছাত্র বা পরিযায়ী শ্রমিক এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে আটকা পড়ে আছে বা যে পর্যটকেরা দুবাইতে আটকে আছে তাদের পরিবার-পরিজন কিছুদিনের জন্য দুর্ভাবনায় ভুগতে পারেন। আর মোদী সরকারও তো খামেনেই-হত্যা নিয়ে ভারতীয় শিয়া সম্প্রদায়ের ক্ষোভ যেন মাত্রা না ছাড়ায় এইটূকু সতর্কতা জারি করেই চুপচাপ আছে। কাশ্মীরে যে মুসলিম মহিলারা রাস্তায় নেমে শোকপ্রকাশ ও প্রতিবাদ করছিলেন, পুরুষ পুলিশ তাদের পিটিয়েই রাস্তাছাড়া করেছে। কিন্তু প্রতিবাদ কি শুধু এঁরাই করবেন?
দুঃখের বিষয়, আমাদের নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ আজ ভূগোলকের অন্যপারে ভেনেজুয়েলা নিয়ে ভাবতেই শুধু নারাজ তাই নয়, আমাদের মূলধারার মিডিয়াতে প্যালেস্তাইন বা ইরান কট্টরবাদী মুসলিমদের, সন্ত্রাসবাদীদের দেশ বলেই চিহ্নিত হয় এবং শিক্ষিত উদারবাদী লোকেদের একটি বড় অংশ এই ব্যাপারটাই মেনে নিয়ে তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন। সৌদি আরব কিন্তু তাঁদের অনেকেরই প্রিয় ভ্রমণস্থল। ইরানের ইসলামিক রাষ্ট্রে বিরোধীদের বিরুদ্ধে নানা নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা থাকতে পারে (যদিও আগেকার মার্কিন-পোষিত শাহী আমলে বিরোধীদের ওপর উৎপীড়ন কিছু কম ভয়ঙ্কর ছিল না), কিন্তু একই সঙ্গে সেই রাষ্ট্র যে নারীশিক্ষা বা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভারতকে অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছে একথা তাঁরা বিশ্বাস করবেন না। গাজা থেকে সেখানকার অধিবাসীদের উৎখাত করে যদি সেখানকার সমুদ্রতটে ‘রিভিয়েরা’ তৈরি হয়, তাঁরা হয়তো তাকে উন্নয়নের বিরাট উদাহরণ বলেই মনে করবেন।
আরএসএস– প্রচারিত ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ তত্ত্বে এঁরা সবাই ঠিক বিশ্বাস না করলেও এইসব কট্টরপন্থীদের প্রতি প্রকাশ্যে বেশি সহানুভূতি দেখাতে যাওয়া যে দেশদ্রোহিতা বলে পরিগণিত হতে পারে, এব্যাপারে ভারসাম্য রেখে চলাই যে ভালো (নেতানেয়াহুকে দোষ দিলে হামাসকেও নিন্দা করতে হবে) এরকমই মনে করেন তাঁরা। তাছাড়া পাশ্চাত্যের আলোকায়িত মানসিকতায়, তাদের সভ্যতা-ভদ্রতায় এসব মানুষ এখনো বিশ্বাস রাখেন। সাম্রাজ্যবাদী লোভের সামনে সেসব যে কতো অবান্তর, রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধে সেকথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে যাওয়ার পরেও। এই কারণেই মোদী নেতানেয়াহু বা ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখালে তাঁরা তেমন বিচলিত হন না, তাঁদের মনে হয় ভারতীয় বিদেশনীতি ভারসাম্য রেখেই চলেছে। সভ্যতার আলোকিত দিকটাতেই রয়েছে। ট্রাম্পকে এদেশে শস্তায় বাণিজ্য করতে দিলে আমরাও তো প্রবেশাধিকার পাব মার্কিন দ্রব্যসামগ্রীর অঢেল ভাণ্ডারে। ভেনেজুয়েলার তেল ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে না কিনে ট্রাম্পের কাছ থেকে কিনলেই বা ক্ষতি কি? হয়তো তাতে ভেনেজুয়েলারও মঙ্গল।
কিন্তু কেন ট্রাম্প বা নেতানেয়াহু মোদীর সান্নিধ্যেই স্বস্তি বোধ করে একথা তাঁদের মনে আসে না। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে ফেলার আগে পর্যন্ত আমাদের বেশির ভাগ মানুষেরই ধারণা ছিল শেষ পর্যন্ত সব ঠিক হয়ে যাবে, মসজিদ কেউ ভাঙবে না। ঠিক তেমনই ভেনেজুয়েলায় হামলার আগে পর্যন্ত আমরা মনে করতাম একটি সার্বভৌম দেশের ওপর আক্রমণ চালাতে আমেরিকা সাহস পাবে না। গাজার ওপর ইজরায়েল ঝাঁপিয়ে পড়ার পরেও এই হামলা যে নিরস্ত্র জনসাধারণের দীর্ঘস্থায়ী গণহত্যার রূপ নেবে তা আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু এই অবিশ্বাস্য ঘটনাগুলির প্রত্যেকটিই ঘটেছে। আর ঘটে যাবার পরে আমরা সেগুলি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। ট্রাম্প বা নেতানিয়াহুর সঙ্গে মোদির স্বাভাবিক দোস্তির পিছনের কারণ তারা প্রত্যেকেই যে সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা পরিচালিত তার মূল প্রকৃতি। সেই প্রকৃতি সভ্যতার সমস্ত অর্জনকে বেপরোয়াভাবে ধ্বংস করেই নিজের জীবনীশক্তি বাড়িয়ে তোলে। দেশে সবচাইতে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধিদের সহজ সম্পর্ক এরই ফল। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন আমাদের যা কিছু দিয়েছিল তার সবই আমরা হারাতে বসেছি এই দুই শক্তির সংযোগের ফলে।
কেউ কেউ বলছেন, এপস্টাইন ফাইল প্রকাশ পাবার ভয়েই এরা একত্র হয়েছে এবং নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটিয়ে একে অন্যের অপরাধ ঢাকছে। কিন্তু আমরা জানি, অপরাধ এবং ধ্বংসের প্রবণতা এই সাম্রাজ্যবাদ ও তার দক্ষিণপন্থী সাঙ্গোপাঙ্গদের মজ্জায় মজ্জায়। কিছু অপরাধী ধরা পড়লেও বা সাজা পেলেও ব্যবস্থাটা যতক্ষণ একই থাকছে ততক্ষণ তা আরও উৎকট রূপ নিয়ে প্রকাশিত হবে। তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে না যতক্ষণ স্থিতাবস্থার প্রভাবে আমরা ভাবতে থাকব এসবের সঙ্গে আপস করেই এদের বাগ মানিয়ে রাখা যাবে। ইতিহাসের পাতা উলটে আগের অবস্থায় ফেরার আশা ভ্রান্তিমাত্র। আসল কথা আরও স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ্যে সংগঠিত বৃহত্তর প্রতিবাদে দুই দানবকে একই সঙ্গে চরম আঘাত হানার প্রস্তুতি। দক্ষিণ গোলার্ধের নিপীড়িত মানুষের বিকল্পের সন্ধানের সঙ্গে যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
Comments :0