অর্ধেন্দু সেন
যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ নয়। কঠিন কাজ হলো যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া। তাই ট্রাম্প সাহেব বেশ কিছুদিন হলো তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায় দাবি করেছেন যে অপারেশন সিঁদুরের ভারত-পাক যুদ্ধ তিনিই থামিয়েছেন। এই কাজের জন্য যে নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য সে কথাও তিনি বলেছেন জোর গলায় । ভারতের তরফে এ বক্তব্যের সমর্থন করা হয়নি যদিও স্পষ্ট বিরোধিতাও করা হয়নি। কি জানি আবার যদি ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক বেড়ে যায়! কিন্তু আমরা ট্রাম্পের কথার কোনও মূল্য দিলাম না কেন? এমন তো নয় যে তিনি এই বিষয়ে ভারত এবং পাকিস্তানের সঙ্গে কোনও কথাই বলেননি। কোনও চেষ্টাই করেননি যুদ্ধ থামাবার?
সে চেষ্টাকে আমরা গুরুত্ব দিইনি কারণ আমরা মনে করি ভারত-পাকিস্তান সমস্যা আমাদের দ্বিপাক্ষিক ব্যাপার। এ ব্যাপারে কোনও তৃতীয় পক্ষ নাক গলাবে তা আমরা চাই না। ভারতের পক্ষে বলা হয় যে পাকিস্তানের মিলিটারি কর্তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে ভারতীয় মিলিটারি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধ থামিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। এ ব্যাপারে আর কারও কোনও ভূমিকা ছিল না। সরকারি ভাষ্য। তাই অবিশ্বাস করার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে যে দেশে সরকারের নির্দেশ ছাড়া ক্রিকেট খেলোয়াররা অন্য টিমের সঙ্গে হাত মেলাতে ভয় পায় সে দেশে যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় সরকারি অনুমোদন ছাড়াই! সে যাই হোক। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও কিন্তু ট্রাম্পের তুলনায় পিছিয়ে নেই। তিনিও একটা যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিলেন। সে ছিল রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ।
আমাদের ছেলে মেয়েরা দলে দলে ইউক্রেনে যেত মেডিক্যািল পড়তে। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হতে তারা আটকে পড়ে। তাদের অবস্থা হয় সঙ্গিন। না পারে থাকতে। না পারে চলে আসতে। ভারত সরকারের জন্য সম্পূর্ণ অযাচিত এক সমস্যা। বিজেপি’র ট্রোলরা তখন বলতে শুরু করে কি দরকার ছিল ওদের ইউক্রেনে পড়াশোনা করবার? দেশে এত ভালো মেডিক্যা ল শিক্ষার ব্যবস্থা থাকতে বিদেশে যাওয়া কেন? কিছুদিন পরে যখন তাদের দেশে ফেরানোর সম্ভাবনা তৈরি হয় তখন সরকার সচেষ্ট হয় ক্রেডিট নিতে। তখন মন্ত্রী সান্ত্রীরা জোটবদ্ধ হয়ে তাদের স্বাগত জানায়। ঠিক সেই সময়েই বিজেপি সেই ভিডিও তৈরি করে যাতে আমরা দেখি একটি মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছে,‘বাবা,আমাদের দেশে ফেরাবার জন্য মোদীজি যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছেন।'কিন্তু এ ছিল কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া। এর জন্য তো নোবেল পুরস্কার চাওয়া যায় না!
কিমাশ্চর্যম! আবার সেই পরিস্থিতি। আবার বিশ্বনেতাদের ডাক পড়েছে যুদ্ধ থামাতে। সেবার ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন। এবার যুদ্ধ ইজরায়েল আর ইরানের মধ্যে। এ যুদ্ধে আমেরিকা যোগ দিয়েছে ইজরায়েলের পক্ষে। ইউক্রেন চিরকালই একাধিক মূল্যবান খনিজ পদার্থের রপ্তানিকারক দেশ যেমন লিথিয়াম টাইটেনিয়াম ইউরেনিয়াম ইত্যাদি। গোটা পৃথিবীর খনিজ সম্পদের পাঁচ পারসেন্টের মালিক ইউক্রেন। তাছাড়াও ইউক্রেন ইউরোপের খাদ্যশস্য এবং ভেষজ তেলের প্রধান সরবরাহকারী দেশ। ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় ইউরোপ মুল্যবৃদ্ধির কবলে পড়ে।
তার তুলনায় ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধের অভিঘাত অনেকগুণ বেশি এবং তার প্রভাব বিশ্ব জুড়ে। তার কারণ মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোলিয়ামের ভাণ্ডার। খনিজ তেলের এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৬৫ পারসেন্ট আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। পারস্য উপসাগর আর তার সংলগ্ন হরমুজ প্রণালীর উপর দিয়ে আসে পৃথিবীর মোট রপ্তানি হওয়া তেলের ২০ পারসেন্ট। তাই বিশ্বের অর্থনীতিতে এই জলপথের গুরুত্ব অপরিসীম। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু করার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বুঝে নেওয়া উচিত ছিল ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করলে আমেরিকা কিভাবে তার মোকাবিলা করবে। কিন্তু তিন সপ্তাহ পরেও মনে হচ্ছে না আমেরিকার কাছে কোনও প্ল্যান আছে হরমুজ মুক্ত করে দেবার।
মাঝে ট্রাম্প সাহেব তাঁর বন্ধু রাষ্ট্র,বিশেষ করে নেটোর সদস্যদের কাছে আবেদন করলেন তাঁদের যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে তেলবাহী ট্যাঙ্কারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। কেউ রাজি হলো না। সবাই বলল এ আমাদের যুদ্ধ নয়। ইরান যদিও বলছে এই জলপথ তাঁদের শত্রুদের জন্য বন্ধ। বন্ধুদের জন্য খোলা। কিন্তু কেউই ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। হরমুজ তাই কার্যত বন্ধ। ভারতের জন্য এ এক বিশেষ সমস্যা কারণ শুধু তেল নয় আমাদের প্রাকৃতিক গ্যাসও আসে একই পথে। কাতার থেকে। আমরা এলপিজি ব্যবহার করি রান্নার জন্য। সিএনজি ব্যবহার করি গাড়ি চালাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এবং সার উৎপাদনে। এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। সঙ্কট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে রবি শস্যের উৎপাদনে সমস্যা হবে।
এসব যেমন আমাদের সমস্যা ট্রাম্প সাহেবেরও সমস্যা আছে। তিনি অতি সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার তেলের মালিকানা পেয়েছেন। কিন্তু শেল-এর তেল যা আমেরিকার প্রধান ভরসা ছিল তার পরিমাণ কমে এসেছে। আমেরিকায় পেট্রোলের দাম বেড়ে হয়েছে গ্যালনে সওয়া তিন ডলার। এর বেশি হলে বিপদ। নভেম্বর মাসে নির্বাচনের আগেই এই দাম কমিয়ে আনতে হবে। ট্রাম্প সাহেব পারবেন?
আরব-ইজরায়েল সমস্যায় ভারত বহুযুগ ধরে আরব দেশের পাশে থেকেছে। মোদীর ভারত কিন্তু ইজরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্টতা বাড়িয়েছে। ইজরায়েল এখন আমাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের উৎস । হায়দরাবাদে ভারত-ইজরায়েল যৌথ উদ্যোগে আদানির কোম্পানি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। সরকার ইজরায়েল থেকে কেনা পেগেসাস সফটঅয়্যার ব্যবহার করেছে মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ভারত নিরপেক্ষ থাকেনি। নৈতিকতার প্রশ্ন এড়িয়ে ইজরায়েলের পক্ষ নিয়েছে। বন্ধু দেশ ইরানের উপর আঘাতের নিন্দা না করে আমরা ইরানের প্রত্যাঘাতের সমালোচনা করেছি। তার ফল হয়েছে এই যে বিশ্বগুরু হয়েও ভারত এই যুদ্ধে মধ্যস্ততা করার অধিকার হারিয়েছে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে রাজমাতা কুন্তি আসেন রাজা কর্ণের শিবিরে। তিনি কর্ণকে জানান যে তিনিই কুন্তির জ্যেষ্ঠ পুত্র। যুধিষ্ঠিরের অগ্রজ। তাঁকে তিনি আহ্বান জানান দ্বেষ বিদ্বেষ ভুলে নিজ অধিকারে পাণ্ডব শিবিরের নেতৃত্ব গ্রহণ করার। দুর্যোধনের সঙ্গ পরিত্যাগ করে তাঁর বিরোধিতা করার। কর্ণ বলেন আমি তা পারি না। জানি পাণ্ডবের জয় নিশ্চিত। আমার বন্ধু দুর্যোধন পরাজিত হবে কিন্তু আমি তাঁকে ছেড়ে যেতে পারি না। কর্ণের মতে এই ছিল বীরের ধর্ম। আজকে আমরা বীরের ধর্ম নয় বাজারের ধর্মে বেশি বিশ্বাসী। বাজারে গিয়ে আমরা দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা করি না। যার কাছে কম দামে বেশি জিনিস পাই তার কাছেই যাই। যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু দেখি কার জয়ের সম্ভাবনা বেশি। চেষ্টা করি যেকোনও মূল্যে তার লেজুড় হয়ে যাবার। ভক্তেরা খুশি হয়। বলে এতদিনে এক পিএম পেয়েছি যিনি দেশের স্বার্থ বোঝেন।
Comments :0