সিবিআই’র তৃতীয় চার্জশিটে বিস্ফোরক অভিযোগ ‘কালিঘাটের কাকু’র বাড়িতে তোলা আদায়ের মিটিং টাকা না পেলে গ্রেপ্তার, বদলির হুমকি নিজেদের অভিষেক নয় বলে তৃণমূলের দাবি
সাল ২০১৭। ভাইপো-সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির পারিবারিক সংস্থার একদা ডিরেক্টর সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র ওরফে ‘কালীঘাটের কাকু’র বেহালার বাড়িতে হাজির হয়েছেন যুব তৃণমূলের নেতা কুন্তল ঘোষ, হুগলীর তৃণমূল নেতা শান্তনু ব্যানার্জি, কুন্তলের ব্যবসার কর্মী অরবিন্দ রায় বর্মন এবং সুরজিৎ চন্দ। সেই মিটিংয়ের কথোপকথন মোবাইলে রেকর্ড করেছিল অরবিন্দ রায় বর্মন। পরে সেটি মোবাইল অডিও ফাইল হিসাবে ল্যাপটপে তোলা হয়েছিল। সেই ল্যাপটপই নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে হাতে আসে সিবিআই’র।
সেই কথোপকথন সামনে আসতেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে। গোটা কথোপকথনের নির্যাস প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে মামলার তৃতীয় অতিরিক্ত চার্জশিটে উল্লেখ করেছে সিবিআই। গত ২১ ফেব্রুয়ারি নগর দায়রা আদালতে সেই চার্জশিট দায়ের করেছিল সিবিআই।
এর আগে কালীঘাটের কাকুর বিরুদ্ধে ইডি’র চার্জশিটেও এসেছিল অভিষেক ব্যানার্জির প্রসঙ্গ। তাঁরই নির্দেশে অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের সুপারিশের তালিকা মানিক ভট্টাচার্যের অফিসে পৌঁছে দিতেন কালীঘাটের কাকু।
আর এবার সিবিআই’র চার্জশিটে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ। কার্যত পেশাদার তোলাবাজের মতো ১৫ কোটি টাকা দর হাঁকিয়েছিলেন অভিষেক ব্যানার্জি!
অবৈধভাবে তত দিনে যাদের নিয়োগ হয়ে গিয়েছিল, তাদের কাছ থেকেই সেই টাকা তুলে দিতে বলেছিলেন তাঁরই সঙ্গী ‘কালীঘাটের কাকু’কে। তাঁর টাকার খিদে না মেটাতে পারলে তত দিনে টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে যারা স্কুলে চাকরি পেয়েছিল, তাদের গ্রেপ্তার করিয়ে দেওয়া বা বাসস্থান থেকে অনেক দূরের এলাকায় বদলি করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন অভিষেক ব্যানার্জি।
তৃতীয় অতিরিক্ত চার্জশিটে এই ছবি সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়।
২০১৭ সালে ‘কালীঘাটের কাকু’র বাড়িতে সেই মিটিংয়ের যে অডিও টেপ হাতে এসেছে সিবিআই’র, তাতে কী রয়েছে?
চার্জশিটের ১২ নম্বর পাতায় ১৭.১০ নম্বর অনুচ্ছেদে তার বিবরণ দিয়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করেছে, সেই মিটিংয়ে কুন্তল ঘোষ, শান্তনু ব্যানার্জি এবং সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র কীভাবে অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা তুলতে হবে, কীভাবে অবৈধভাবে তাদের নিয়োগের জন্য মেধা তালিকাকে বিকৃত করা হবে এবং কলকাতা হাইকোর্টে মামলা রুজু করে কীভাবে তাদের পক্ষে রায় নিয়ে আসতে হবে, তার বিস্তারিত কৌশল আলোচনা করেন। সেই আলোচনার রেকর্ডেড অডিও থেকে জানা গিয়েছে, নিয়োগ সংক্রান্ত ও টাকা তোলার বিষয়ে অভিষেক ব্যানার্জির সঙ্গে পার্থ চ্যাটার্জির মধ্যে খানিকটা দ্বন্দ্বও ছিল। এই মিটিং প্রথম নয়, অবৈধ নিয়োগের জন্য ‘কালীঘাটের কাকু’র বেহালার বাড়িতে গিয়েই ৫-৬ কোটি টাকা দিয়ে এসেছিল কুন্তল ঘোষ।
এরপরেই চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই অডিও ক্লিপেই সুজয় কৃষ্ণ ভদ্রকে বলতে শোনা গিয়েছে যে, অভিষেক ব্যানার্জি ১৫ কোটি টাকা দাবি করেছেন। এই টাকা তাদের কাছ থেকে নিতে বলা হয়, যাদের ইতোমধ্যেই অবৈধভাবে নিয়োগ করা হয়েছে। এরপরে ওই কথোপকথনে শোনা গিয়েছে, কালীঘাটের কাকু বলছেন, ইতোমধ্যে নিযুক্ত প্রার্থী পিছু সাড়ে ছয় লক্ষ টাকা তোলা হয়েছে। তারপরে ফের যখন এত পরিমাণ টাকা জোগাড় করার বিষয়ে অপারগতার কথা জানান অভিষেক ব্যানার্জিকে, তখন তিনি সুজয় ভদ্রকে ওই প্রার্থীদের নিয়োগ আটকে দিতে বলেন। নয়তো তিনি ওই নিয়োগ প্রার্থীদের পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করিয়ে দেবেন। নয়তো তাঁদের প্রত্যন্ত এলাকায় বদলি করে দেবেন।
শুধু তা নয়। ওই আলোচনা থেকে জানা গিয়েছে, সুজয় কৃষ্ণ ভদ্র, শান্তনু ব্যানার্জি এবং কুন্তল ঘোষ আরও ২ হাজার প্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা তোলার পরিকল্পনা করেছিল। সেই টাকা থেকে ২০ কোটি টাকা করে অভিষেক ব্যানার্জি, পার্থ চ্যাটার্জি এবং মানিক ভট্টাচার্যকে দেওয়ার কথা ছিল। বাকি ৪০ কোটি টাকা ওই তিন জনের নিজেদের নেওয়ার কথা ছিল।
এর মধ্যেই সিবিআই’র এই তৃতীয় অতিরিক্ত চার্জশিটে উল্লেখিত ‘অভিষেক ব্যানার্জি’ই কি মমতা ব্যানার্জির ভাইপো ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি— এমন নিরীহ শিশুসুলভ প্রশ্ন তোলা শুরু হয় নির্দিষ্ট একটি মহল থেকে। আর তারপরেই সেই সুরে শাসক তৃণমূলও দাবি করতে থাকে, এই অভিষেকই যে তাদের অভিষেক, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও কিছু বলা নেই চার্জশিটে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আর কোন অভিষেক ব্যানার্জি আছেন, যাঁর সঙ্গে ‘কালীঘাটের কাকু’র এতটাই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ যে, অবৈধ নিয়োগের জন্য তাঁকে ১৫ কোটি টাকা তুলে দেওয়ার কথা বলতে পারেন? যদি টাকা না দেয়, তবে পুলিশ দিয়ে ওই প্রার্থীদের গ্রেপ্তার বা অন্যত্র বদলির হুঁশিয়ারি দিতে পারেন? কিংবা কোন অভিষেক ব্যানার্জির জন্য কুন্তল ঘোষ, শান্তনু ব্যানার্জি, ‘কালীঘাটের কাকু’ অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে তোলা টাকা থেকে ২০ কোটি টাকা তাঁকে দেওয়ার কথা বলেন? কোন সেই অভিষেক ব্যানার্জি, যার সঙ্গে এই টাকা তোলা ও অবৈধ নিয়োগ নিয়ে তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির মতবিরোধ হতে পারে? যদি সেই অভিষেক ব্যানার্জি তৃণমূলের অভিষেক না হন, তবে পশ্চিমবঙ্গে শাসক দল ও সরকারে আর কোন ব্যক্তি এই নামে রয়েছেন, যার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এত বিপুল ক্ষমতা থাকতে পারে?
পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ালেও ‘ঠাকুরঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি’ গোছের মনোভাব থেকে বুধবার সকালেই তৃণমূল সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির আইনজীবী সঞ্জয় বসু বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, সিবিআই তাঁর মক্কেলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্ত করছে। কিন্তু বিবৃতিতে এমন বাক্য নেই যে, চার্জশিটে যে অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ করা হয়েছে, সেই অভিষেক ব্যানার্জি তাঁর মক্কেল নয়। বরং বলা হয়েছে, ‘‘মামলার তদন্তকারী সংস্থা ইডি আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে কোনও চার্জশিট দাখিল করেনি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের কোনও উপাদানের উপস্থিতিও মেলেনি। তার পরেও সিবিআই’র তৃতীয় অতিরিক্ত চার্জশিট আমার মক্কেলকে হয়রানির উদ্দেশ্য ছাড়া আর কিছু নয়। অন্যায়ভাবে আমার মক্কেলকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।’’ অর্থাৎ অভিষেক ব্যানার্জির আইনজীবীর দাবিতে স্পষ্ট, এই সেই অভিষেক ব্যানার্জি।
তবে ভাইপো-সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে সরাসরি চার্জশিট দেয়নি সিবিআই। এই তৃতীয় চার্জশিটে মূলত ‘কালীঘাটের কাকু’, তৃণমূল নেতা শান্তনু ব্যানার্জি এবং তৎকালীন তৃণমূল ও বর্তমানে বিজেপি নেতা চিনু হাজরার নাম রয়েছে, যিনি কালীঘাটের কাকুর এজেন্ট হিসাবে কাজ করতেন। প্রাক্তন তৃণমূল ও বর্তমান বিজেপি নেতা এই চিনু হাজরা অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ৭৮ কোটি টাকা তুলে ‘কালীঘাটের কাকু’কে দিয়েছিল বলে চার্জশিটে অভিযোগ এনেছে সিবিআই।
এই প্রথম নয়। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে নিয়োগ দুর্নীতিতে ‘কালীঘাটের কাকু’র বিরুদ্ধে ইডি’র চার্জশিটেও অভিষেক ব্যানার্জির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ৭৫ নম্বর পাতায় বলা হয়েছিল, সুজয় ভদ্র (কালিঘাটের কাকু) সেই সময়ে অভিষেক ব্যানার্জির আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি দেখভাল করতেন। সেই সময়ে অভিষেক ব্যানার্জি যুব তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। সুজয় ভদ্র তৎকালীন প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি মানিক ভট্টাচার্যের অফিসেও নিয়মিত যাতায়াত করতেন। মূলত অভিষেক ব্যানার্জির হয়ে বার্তা মানিক ভট্টাচার্যের কাছে পৌঁছে দিতেই তিনি যেতেন।
primary recruitment scam
প্রাথমিকে নিয়োগে ১৫ কোটি দর হাঁকিয়েছিলেন ‘অভিষেক ব্যানার্জি’

×
Comments :0