Annapurna Yojana Protest

মেলেনি অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা, রাজ্যজুড়ে মহিলাদের বিক্ষোভ

রাজ্য জেলা

ঝাড়গ্রামে সড়ক অবরোধ করে মহিলাদের বিক্ষোভ।

রাজ্য সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে অন্নপূর্ণা যোজনার উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছনোর কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেকের অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকলেও এখনও বহু উপভোক্তা টাকা পাননি বলে অভিযোগ। তাঁরাই এদিন রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় মহকুমা শাসক ও ব্লক অফিসে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, ধূপগুড়ি, বালুরঘাট, কল্যাণী, পূর্ব বর্ধমান ও মালদহ সহ বিভিন্ন এলাকায় আবেদন করেও টাকা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এদিন মহিলা বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ, মাথাভাঙ্গা সহ বিভিন্ন এলাকায়।  এদিন বঞ্চিত মহিলাদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ল রাজ্যের নারী ও শিশু কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী মালতি রাভা রায়ের বাড়িতেও।
বিক্ষোভকারিদের অভিযোগ একাধিকবার এই অন্নপূর্ণা যোজনার আওতাভুক্ত হতে অফলাইন, অনলাইনে আবেদন করা হয়েছে কিন্তু এখনও এই যোজনার আওতাভুক্ত হননি তারা। এখনও পর্যন্ত তাদের অ্যাকাউন্টে ঢোকেনি টাকা। বারবার হয়রানি শিকার হতে হচ্ছে তাদের, তাঁরা কোচবিহার সদর মহকুমা শাসকের দপ্তরে গিয়েও ফিরে আসতে হচ্ছে। কারণ দপ্তরের কেউই সঠিক উত্তর দিতে পারছেন না। তাই বাধ্য হয়েই সংশ্লিষ্ট এই ওয়ার্ডের ব্যাপক অংশের অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে বঞ্চিত মহিলারা জড়ো হন এই কোচবিহার শহরের হাজরা পাড়া সংলগ্ন সংহতি ক্লাবের পার্শ্ববর্তী এলাকার এই মন্ত্রীর বাড়ির সামনে। বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এই মহিলারা। তারা দাবি করেন মন্ত্রীকেই সদুত্তর দিতে হবে, কেন এখনও পর্যন্ত এই অন্নপূর্ণা যোজনার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত রয়েছেন তারা? কবে নাগাদ এই টাকা ঢুকবে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে? বিক্ষোভে রীতিমতো উত্তেজনার সৃষ্টি হয় সংশ্লিষ্ট এই এলাকায়। পরবর্তীতে কোচবিহার কোতোয়ালি থানার পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এদিন মন্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। 

আলিপুরদুয়ারে মহকুমা শাসকের দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ।
এদিন  তুফানগঞ্জ ১নং ব্লক দপ্তরের সামনে ভাটিবাড়িগামী রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে সামিল হন বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে আসা মহিলারা। অভিযোগ, একাধিকবার কাগজপত্র ঠিক করে দিলেও বারবার শুধু ভুল দেখাচ্ছে। বিডি অফিসে আসলে বলা হয় গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে যেতে। আবার পঞ্চায়েত অফিসে গেলে বিডিও অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাদের। তাদের অভিযোগ দরিদ্র মহিলারা এই যোজনার সুবিধা পাচ্ছে না, অথচ চাকরিজীবী পরিবারের মহিলারা পাচ্ছেন এই অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা। তাদের আরও অভিযোগ যে যাদের বাড়ি গাড়ি সব রয়েছে তারাই টাকা পাচ্ছেন, অথচ যাদের কিছুই নেই তারা পাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে পথে নেমেছেন তারা।
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পাওয়ায় প্রতিবাদে এদিন  মাথাভাঙ্গা - শিলিগুড়ি রাজ্য সড়কের শিকারপুরে মাথাভাঙ্গা ১নং ব্লক  দপ্তরের  সামনে পথ অবরোধ করেন মহিলারা। এদিন আলিপুরদুয়ারে মহকুমা শাসকের দপ্তরের সামনে অন্নপূর্ণা ভান্ডার টাকা না মেলায় বিক্ষোভ দেখিয়েছেন আন্দোলনকারী মহিলারা। 
মুখ্যমন্ত্রীর পূর্বঘোষিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা না পড়ায় বৃহস্পতিবার ধূপগুড়ি পৌরসভায় বিক্ষোভ দেখালেন উপভোক্তাদের একাংশ। বিভিন্ন ওয়ার্ডের মহিলারা এদিন সকাল থেকে পৌরসভায় জড়ো হয়ে পৌরসভার কার্যনির্বাহী আধিকারিককে ঘিরে বিক্ষোভ দেখান। তাঁদের অভিযোগ, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে গিয়ে বারবার পৌরসভায় ঘুরতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। বিক্ষোভকারীদের আরও অভিযোগ, আবাসন-সহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়ম ও স্বজনপোষণ হচ্ছে। যোগ্যদের নাম বাদ দিয়ে অযোগ্যদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়। পৌরসভার আধিকারিকের কাছ থেকে স্পষ্ট উত্তর না মেলায় ক্ষোভ আরও বাড়ে। বিক্ষোভ ঘিরে পৌরসভা চত্বরে উত্তেজনা ছড়ালে পরিস্থিতি সামাল দিতে ধূপগুড়ি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, কোনও অজুহাত বা জটিলতা ছাড়াই দ্রুত বকেয়া টাকা তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা দিতে হবে। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে পৌরসভার কাজ অচল করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

কোচবিহার শহরে মন্ত্রী মালতি রাভা রায়ের বাড়ির সামনে বিক্ষোভরত অন্নপূর্ণা যোজনা বঞ্চিত মহিলারা।
বিক্ষোভকারী শালিনী ঘোষ বলেন,‘‘আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করছি। বারবার পৌরসভায় এসে ঘুরতে হচ্ছে। আমাদের পুলিশের ভয় দেখানো হচ্ছে। যারা টাকা পাওয়ার কথা, তাঁদের টাকা দেওয়া হচ্ছে না। অথচ অনেক পরিবারের তিনটির বেশি ঘর থাকা সত্ত্বেও টাকা দেওয়া হচ্ছে। এটা কী ধরনের নিয়ম? ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে পৌরসভা বন্ধ করে দেওয়ার পথে যেতে বাধ্য হব।’’
আর এক বিক্ষোভকারী প্রিয়া বসাক  বলেন, অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ায় উপভোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অবিলম্বে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার করে প্রাপ্য টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
এদিন ঘাটাল মহকুমা দপ্তরের সামনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মল্লিকা দোলই, জয়ন্তী সাউ প্রমুখ বলেন, ‘‘আমরা আবাস যোজনায় ঘর করেছি। তবুও পাকা বাড়ি অজুহাতে অন্নপূর্ণা যোজনা বাতিল করা হয়েছে। সরকারি টাকা ঘরের জন্য ভাতা বন্ধ কেনো হবে?  সেটা ভোটের আগে বললো না কেনো।’’

 ধূপগুড়ি পৌরসভায় বিক্ষোভ দেখালেন উপভোক্তাদের একাংশ।
মল্লিকা দোলই বলেন, ‘‘আমার স্বামীর একটি হাত জন্ম থেকে বিকলাঙ্গ। সে রাজ মিস্ত্রীর কাজ করে। সরকারের দুই কামরার ঘরের সাথে একদিকে বারান্দা নিজেদের পরিশ্রমের টাকায় বানিয়ে সেখানে রান্নাঘর সহ একটি খোপ বানিয়ে সেখানে বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়িকে রেখেছি। সেটাই নাকি তিন কামরার ঘর অজুহাতে অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে বাতিল করা হয়েছে। আমাদের গতর খাটলে সংসার চলে। বাড়িতে এক প্রতিবন্ধী মেয়ে সহ বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ি রয়েছে। তাঁর অভিযোগ বয়স্ক ভাতাও কেবল শ্বশুর পেতেন। সেটাও আজ দুই মাস বন্ধ।’’ চন্দ্রকোনা থানার বিভিন্ন গ্রাম থেকে এমন শতাধিক মহিলা এদিন ঘাটাল শহরে মহকুমা শাসক দপ্তরে এসে বিক্ষোভ দেখায়। অনেকে বলেন গত তিন মাস ধরে তারা আগের লক্ষী ভান্ডারের মতো কোনো টাকা পায়নি। এর আগেও মহকুমা শাসক দপ্তরে এসে খোঁজ নিলে তাদের জানানো হয়, আগষ্ট মাস থেকে পাবেন। আগে লক্ষী ভান্ডার পেতেন এমন বহু মহিলা গত তিন মাস ধরে সেই ভাতা থেকে বঞ্চিত। অপর দিকে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা অ্যাকাউন্টে না ঢোকায় ক্ষোভে ফেটে পড়লেন ঝাড়গ্রাম শহরের শত শত মহিলা। এদিন দুপুর ১২টা নাগাদ ঝাড়গ্রাম শহরের ৫ নম্বর রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান তাঁরা। বিক্ষোভকারী মহিলাদের অভিযোগ, চলতি মাসে একাধিক মহিলার অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা ঢুকলেও তাঁদের অ্যাকাউন্টে এখনও পর্যন্ত টাকা জমা পড়েনি। ক্ষুব্ধ মহিলারা ঝাড়গ্রাম ফ্লাইওভার সংলগ্ন ৫ নম্বর রাজ্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ঝাড়গ্রাম থানার পুলিশ। বেশ কিছুক্ষণ পথ অবরোধ চলায় রাজ্য সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে ঝাড়গ্রাম থানার আইসির পরামর্শে মহিলারা অবরোধ তুলে নেন। তবে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা কবে তাঁদের অ্যাকাউন্টে ঢুকবে, তা নিয়ে এখনও ক্ষোভ রয়েছে বিক্ষোভকারী মহিলাদের মধ্যে।

Comments :0

Login to leave a comment