Tulu Mondal Birbhum

অনুব্রত ঘনিষ্ঠ টুলু বিদেশে পালিয়েছে, বলছে পুলিশ

রাজ্য

রণদীপ মিত্র : সিউড়ি
 মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া সোনার বাট গোপনে আনা করা হয়েছিল দুবাই এবং সুইজারল্যান্ড থেকে! এর অনেকগুলিতে লাগানো ছিল ‘ব্ল্যাকটেপ’ যা মূলত বিদেশে পাচারের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। অনুব্রত মণ্ডলের হাত ধরে পাথর বলয়ের ‘বেতাজ বাদশা’ হয়ে ওঠা টুলু মণ্ডলের আত্মীয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া সোনার বাট ঘিরে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। 
বুধবার দিনভর তল্লাশি শেষে অনুব্রত ঘনিষ্ঠ পাথর মাফিয়া টুলু মণ্ডলের আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছিল নগদ ২৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা এবং ১৫ কেজি সোনার বাট। বাড়ির মধ্যে স্রেফ ব্যাগের ভেতরে থরে থরে এই কোটি কোটি টাকা রাখা ছিল।
পুলিশের এই তল্লাশি অভিযানকে কার্যত সমর্থন জানিয়েই অধুনা মমতা তৃণমূল থেকে সরে এসে ঋতব্রত ব্যানার্জির তৃণমূল শিবিরের তরফে বীরভূমের জেলা সভাপতি হওয়া অনুব্রত মণ্ডল এদিন বলেন-‘ টুলুর ডেরায় তল্লাশি করছে ভালো করছে। প্রশাসন সঠিক কাজ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী ভালো কাজ করছেন, ধন্যবাদ জানাই।’ একইসঙ্গে বলেন- আমার সঙ্গে তো সবার ভালো সম্পর্ক। অনেকে আমাকে চেনে, আমিও চিনি। তাতে টুলু কি করল আমার কি। আমার নাম না নিলে ভালো নিউজ হয় না তাই নামটা ঢুকিয়ে দেয়।"
তবে এলাকাবাসীর বক্তব্য, যা উদ্ধার হয়েছে তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। এরকম অনেক ডেরায় টুলু ওরফে নিজামুদ্দিন মণ্ডলের টাকা মজুত আছে বলেই সন্দেহ। এদিনই সিউড়ি থানা এলাকার জিবধরপুরে টুলুর বিশাল বাগানবাড়ি থেকে গাড়ি বোঝাই ফাইল, নথি পাচার করা হচ্ছিল। গত দু’দিন ধরে হূলুস্থুল পড়ে যাওয়ায় কাগজপত্র বোঝাই গাড়ি দেখে সন্দেহ হয় এলাকাবাসীর। তাঁরা গাড়ি আটকে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ গাড়ি বাজেয়াপ্ত করে। তাতে ‘মণ্ডল স্টোন ক্র্যাশার’ সহ নানা সংস্থার নথি উদ্ধার হয়। গাড়ির চালক দাবি করেন, ‘‘টুলু মণ্ডলের শালার গাড়ি এটি। মালিকের নির্দেশেই গাড়ি করে ফাইলগুলি নিয়ে যাচ্ছিলাম।’’
অন্যদিকে এদিন দুপুর থেকে সিউড়িতে জিম, বেলজিয়াম গ্লাস, ইটালিয়ান মার্বেল সমৃদ্ধ টুলুর চোখ-ধাঁধানো বাড়ি ‘দলিলা ভবনে’ শুরু হয়েছে পুলিশের তল্লাশি। আনা হয়েছে সোনা ওজন করার মেশিন। এছাড়াও মহম্মদ বাজার, সোঁতসাল সহ টুলু এবং তার ঘনিষ্ঠদের একাধিক ডেরায় চলছে তল্লাশি। এই ডেরাগুলি থেকে আর কি কি উদ্ধার হয় সেই অপেক্ষাতেই রয়েছেন সকলে।
বুধবারের পর বৃহস্পতিবারও বীরভূমের নকল ‘ডিসিআরে’র নামে তোলাবাজির কারবারের হোতা টুলু মণ্ডলের একাধিক ডেরায় হানা অব্যাহত ছিল। সিউড়ির সুভাষপল্লির এই বাড়িতেই থাকতেন টুলু। তবে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তিনি বেপাত্তা। চারতলা বাড়িতে বিলাস-বৈভবের সব আয়োজনই রয়েছে। বাড়িতে লিফট থেকে জিম, সবই রয়েছে। ধৃত মিনার মণ্ডলের টাকার উৎস খুঁজতে টুলুর সুভাষপল্লির বাড়িতে জেলা পুলিশ তল্লাশিতে নেমেছে। একদিকে যেমন এই পাথর-বালি মাফিয়ার প্রাসাদোপম বাড়ি, কয়েক একর জায়গা জুড়ে থাকা পার্কিং, ফার্ম হাউসে চলছে পুলিশি অভিযান, অন্যদিকে সিউড়ি আদালতে টুলু মণ্ডলের কারবারের একের পর এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য সামনে এসেছে।
পুলিশকে চমকে দিয়েছে মিনার মণ্ডলের বাড়ি থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া সোনার বাটগুলির উৎস এবং আমদানির কাহিনী। গ্রাম, শহর, জেলা ছাড়িয়ে দেশের একাধিক বড় বড় শহর ছাড়াও দুবাইয়েও সম্পত্তি ক্রয়ের কথা জানেন না এমন কেউ নেই। ফলে তাঁর ডেরা থেকে দুবাই ও সুইজারল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের সর্বোৎকৃষ্ট মানের সোনার বিস্কুট উদ্ধার হওয়ার মধ্যে খুব একটা অস্বাভাবিকত্ব নেই। তবে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ১৪ টি একশো গ্রামের এবং একটি এক কেজি ওজনের মোট ১৫ টি সোনার বিস্কুট আনা হয়েছিল এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক মাখিয়ে। এব্যাপারে ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, ‘ক্যামোফ্লেজ’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এভাবে সোনা আনা হয় ‘ডিটেকশন স্ক্যানার’কে ফাঁকি দিতেই। অনুব্রত মণ্ডলের হাত ধরে সামান্য গৃহশিক্ষক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া টুলু মণ্ডলের স্রেফ অবৈধ কারবারই নয়, অপরাধ জগতের সাথেও নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকারও ইঙ্গিত করছে এই তথ্য। 
তবে টুলু কোথায় এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব এখনও মেলেনি। প্রশ্ন উঠেছে, এই পাথর মাফিয়াও কি কয়লা পাচার কাণ্ডে ভানুয়াতুতে পালিয়ে যাওয়া অভিষেক ঘনিষ্ঠ বিনয় মিশ্রের দেখানো পথই নিয়েছেন? এদিন আদালতে পুলিশের নিযুক্ত বিশেষ সরকারি আইনজীবী বিভাস চ্যাটার্জি তাঁর সওয়ালে বলেছেন, ‘‘২৩ মে’র পর থেকে টুলু মণ্ডলের গতিবিধির উপর নজরদারি করে মনে হচ্ছে তিনি দেশের বাইরে চলে গিয়েছেন।’’ পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, টুলু সম্ভবত দুবাইয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এই অনুমান থেকেই পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে লুক আউট নোটিস জারির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এখানেই সংশয়, তাহলে কি আদৌ টুলুকে দেশে ফিরিয়ে এনে সরকারি কোষাগারের টাকা লুটের অপরাধে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে? 
মহম্মদবাজার থানা এলাকায় ডাকাতির উদ্দেশ্যে জড়ো হওয়া যুবকদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে টুলু মণ্ডলের একের পর এক ডেরায় হানা দেওয়ার মাঝেই। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, এই যুবকদের মারফতই পুলিশ দেউচায় টুলুর আত্মীয় মিনার মণ্ডলের বাড়িতে বিপুল টাকা ও সোনা মজুতের খবর পায়। তারপর ত্রিশ ঘণ্টার তল্লাশি শেষে সাড়ে ২৮ কোটি নগদ ও পনেরো কেজি সোনা উদ্ধার করে। মিনার মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে এদিন তোলা হয়েছিল আদালতে। বিচারক ৮ দিনের পুলিশি হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি আইনজীবী জানিয়েছেন, ‘‘জেরায় মিনার মণ্ডল স্বীকার করেছেন এই বিপুল টাকা-সোনা টুলু মণ্ডল তাঁর বাড়িতে মজুত করেছিল নিরাপদে রাখার স্বার্থে। মিনারের বাড়ি থেকেই টুলু মণ্ডলের একাধিক সম্পত্তি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নথি মিলেছে। ফলে এই মজুত ভাণ্ডরের সঙ্গে টুলুর যোগাযোগ প্রমাণিত হয়। সরকারি রাজস্ব আদায়ের জন্য ডিসিআরের নকল কারবারের সিন্ডিকেট রাজের পান্ডা হচ্ছেন টুলু মণ্ডল। তদন্তের অগ্রগতিতে আরও অনেকের সংযোগ মিলবে।’’
বালি-পাথর-গোরু পাচারে অভিযুক্ত টুলু মণ্ডল পাঁচামীর সোঁতসালে গৃহশিক্ষকতা করতে করতেই নামেন পাথর সরবরাহের ব্যবসায়। তৃণমূল আমলে অনুব্রত ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই তিনি  ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান। তাঁর নিজের নামে প্রায় ৭ টি খাদান আছে। তৃণমূল সরকারে থাকাকালীন এই টুলুর মেয়ের বিয়ের জাঁকজমক ছিল একেবারে নজিরবিহীন। ২৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল তাতে। তৃণমূলের সরকারের তৎকালীন নেতা, মন্ত্রী, পুলিশ আধিকারিকদের পাশাপাশি হলিউডের শিল্পীরাও আমন্ত্রিত ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে।
 

Comments :0

Login to leave a comment