BOOK | BRAHAMHA ASHTARAMVA | ARNAB ROY | MUKTADHARA | 4th YEAR | 21 JULY 2026

বই | রামায়ণ বিভেদের নয় সমন্বয়ের প্রতীক | সুবিনয় মিশ্র | মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২১ জুলাই ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

BOOK  BRAHAMHA ASHTARAMVA  ARNAB ROY  MUKTADHARA  4th YEAR  21 JULY 2026

বই | বিভেদের বঞ্চনা‌ ও একতার লড়াই
      অর্ণব রায়

মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২১ জুলাই ২০২৬

 মহাভারতের পৌরাণিক আখ্যানে ভৃগু যখন ভরদ্বাজকে বললেন যে, মানুষের গাত্রবর্ণই সমাজে জাতি-বর্ণ বিভাজনের কারণ এবং তাই তা স্বাভাবিক, তখন ভরদ্বাজ প্রতিবাদে পালটা মত জানান যদি ভিন্ন গাত্রবর্ণ ভিন্ন জাতি-বর্ণের জন্য দায়ী হয়, তাহলে সব জাতিই মিশ্র জাতি এবং তাই এমন বিভাজন কৃত্রিম। সেই সঙ্গে ভরদ্বাজ আরও গুরুতর বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে বলেন যে, প্রত্যেক মানুষই কামনা, ক্রোধ, ভয়, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, ক্ষুধা ও শ্রমের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে জাত-বর্ণগত পার্থক্য আসে কি করে? প্রাচীন অন্যান্য গ্রন্থে, যেমন একটি হলো ভবিষ্যপুরাণ, একই ধরণের সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। এই সংশয়গুলি সেসময়ও ভারতে বহুত্ববাদ তথা  বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি বোঝালেও এনিয়ে তখন গভীরে বস্তুগত ভাবনা বিশেষ হয়নি। বরং আর্যরা আগমনের পর প্রবলভাবে প্রাচীনকাল থেকে বর্ণাশ্রমভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা হয়েছে। ভারতীয় সমাজে শ্রেণিবিভাজন তার আগেও ছিল, কিন্তু ধর্মকে হাতিয়ার করে জাতবিভাজনও শক্তপোক্তভাবে তৈরি করা হল এবং কায়িক শ্রমজীবী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের ওপর শ্রেণিশোষণ ও জাতশোষণ একইসঙ্গে চলল। মনুর বিভেদমূলক শাস্ত্র লেখার পর তার কঠোর প্রয়োগে জাতবিভাজন সমাজে ও রাজনীতিতে সাঙ্ঘাতিকভাবে ভিত গেড়ে বসল। এই দুর্দশা থেকে আধুনিক ভারত আজও মুক্ত নয়, শ্রেণিস্বার্থে এবং কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষিত মানুষদের বিজ্ঞানসম্মত ভাবনার অভাবে এই জাতবিভাজন-মানসিকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম সফল হয়নি। ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলিতে ভারতের মত বিভাজন-সমস্যা এত তীব্র নয়, তবে "রেসিজম" , বর্ণবিদ্বেষ চোরাস্রোতের মতো চালু আছে সেখানেও। বিজ্ঞানপ্রযুক্তিতে তারা অনেক উন্নত, কিন্তু বিজ্ঞানমনস্কতায় সফলতার থেকে তারাও ভারতের মতো পিছিয়ে না থাকলেও,  কিছু দূরে আছে, বলতেই হবে। 
এই বিভেদের মাঝেও ভারত সম্প্রীতির চর্চা করেছে বহু যুগ ধরে সেকালের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু বিভাজনের বিরুদ্ধে বহু অর্থনৈতিক- সামাজিক- সাংস্কৃতিক লড়াই বাকি আছে। তার জন্য চিন্তাগত ও প্রয়োগগত সব ধরনের প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে। গণ-আন্দোলনের সংগঠক, প্রাক্তন সাংসদ অলকেশ দাস এসব বিষয়ে নিয়ে লেখালিখি করছেন অনেকদিন। এক-দু’বছর  আগে তাঁর লেখা চব্বিশটি প্রবন্ধের সংকলন "ব্রহ্মা অষ্টরম্ভা" বইটি প্রকাশিত হয়েছে। জাতপাত বিভাজন ছাড়াও এন আর সি, কোভিডকালে বিশেষত দরিদ্র-শ্রমজীবী মানুষদের অবর্ণনীয়  দুর্দশা, পরিযায়ী শ্রমিকদের সেই অসহায় হাঁটা, মৃত্যু ও রাষ্ট্রের উদাসীনতা, জেলবন্দী প্রয়াত ষ্ট্যানস্বামীর প্রতি অবিচার, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি বিষয়কে কেন্দ্র করেও লেখা আছে, তবে প্রায় সব  লেখাতে জাতপাত বিভাজনের সমস্যা ঘুরেফিরে এসেছে। লেখক প্রবন্ধগুলিতে আলোচনায় অজস্র বিষয়কে ছুঁয়ে গেছেন। প্রাচীন ভারতে বর্ণাশ্রম, গরিব অন্ত্যজ শূদ্রদের ওপর ধর্মের অনুশাসনের নামে অত্যাচার, মধ্যযুগে বাংলায় চৈতন্যর নেতৃত্বে আধ্যাত্মিকতার পরিসীমায় হলেও জাতবর্ণ-দেওয়াল ভাঙার সামাজিক ঢেউ, মতুয়া- রাজবংশী-লেপচা- তামাং-ভুটিয়া- আদিবাসী সহ বিভিন্ন জাতিগত পরিচিতি সত্তা  তথা  বিভিন্ন জনজাতির ভাষাগত পার্থক্যকে সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে উস্কে দেওয়ার জন্য বর্তমান রাজ্য ও কেন্দ্রীয় শাসকদলের উত্তর-আধুনিক কৌশলে নানা কার্যকলাপ, যুক্তির ক্ষয়সাধন, ডোলের রাজনীতি  ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।‌ এসেছে হরিচাঁদ গুরুচাঁদ ঠাকুর, পঞ্চানন বর্মাদের নামও। বর্তমানে দেশে বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষানীতির প্রয়োজনীয়তা , সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের পারস্পরিক  আপস, নিওলিবারেল ক্যাপিটাল আর হিন্দুত্বের মহা ককটেলের প্রসঙ্গ, ‘ইসলামোফোবিয়া’ ও হিন্দুরাষ্ট্রের বিপদের কথা স্থান পেয়েছে। লেখক স্বাধীনতার পর উদ্বাস্তু আন্দোলন, গান্ধী বর্ণাশ্রমের সমর্থক হলেও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর আংশিক দেওয়াল হয়ে দাঁড়ানো ও তাঁকে হত্যায় হিন্দু-সাম্প্রদায়িকদের উল্লাসের কথা বলেছেন। আরএসএস’র ব্রিটিশ-দালালি, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আনীত নাগরিকত্ব নিয়ে  সিএএ- এনপিআর- এনারসির কর্মসূচির আসল কু-উদ্দেশ্য , জাতি-সেন্সাসের সম্ভাব্যতা  নিয়ে আলোচনা করেছেন। আম্বেডকর তাঁর ছাত্রজীবনে জাতপাতের অপমান ও বঞ্চনা সহ্য করেছেন, পরে উচ্চতম পর্যায়ে বিদ্যা অর্জন করে এবং দেশের  বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হয়েও সারা জীবন আপসহীন লড়াই করেছেন জাতপাত প্রথার বিরুদ্ধে এবং শেষে হিন্দুধর্ম ছেড়ে জাতপাতহীন বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এদেশে জাতপাত শোষণের বিরুদ্ধে বহু গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখে গেছেন তাঁর বিভিন্ন বইতে।
লেখক বলেছেন স্বাধীনতার এত বছর পরেও নিম্নবর্ণের বহুল অংশে অনগ্রসরতার কথা।  এনেছেন সংরক্ষণের ইস্যুটিও— আইন অনুযায়ী সংরক্ষণের পূর্ণ প্রয়োগ যে হচ্ছে না, তা কিছু তথ্য সহযোগে ব্যাখ্যা করেছেন। সংরক্ষণের সুবিধা নিম্নবর্ণের কিছু সম্প্রদায়েরই মধ্যেই আটকে থাকছে — লেখক জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে এবং সরকারি চাকুরিতে সংরক্ষণের সুবিধার পঞ্চাশ শতাংশ কেবলমাত্র চল্লিশটি সম্প্রদায় পেয়েছে।  সংরক্ষণের সুবিধাপ্রাপ্ত ও আর্থিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত বা উচ্চবিত্ত- ধনী কিছু নিম্নবর্ণের পরিবারের সন্তানদের সংরক্ষণের সময় আর্থিক মানদণ্ড চালু না হওয়ায়, বেশ কিছুদিন যাবৎ, সোশাল মিডিয়া সহ বিভিন্ন ‘পাবলিক ডোমেইনে’ নানা বিতর্ক হচ্ছে— এই বিষয়টি নিয়ে একটু আলোচনা থাকলে ভালো হতো।
প্রবন্ধগুলি সম্পাদনার প্রয়োজন ছিল। কিছু পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, দু’একটি ক্ষেত্রে ধারণাগত অসঙ্গতি থেকে গেছে। পরবর্তী সংস্করণে এসব সংশোধিত হয়ে যাবে, আশা করি। লেখাগুলি তথ্যসম্বলিত। মাঝে মাঝে তির্যকভঙ্গি, সুপ্রযুক্ত উদ্ধৃতি, অর্থবহ শিরোনাম— উপশিরোনাম লেখাগুলিকে আকর্ষণীয় করেছে নিঃসন্দেহে। লেখাগুলির মধ্যে মাটির গন্ধ পাওয়া যায়। রেফারেন্সের খোঁজে লোকাচার- পুরাণ- সমাজ- ইতিহাস- রাজনীতির  বিভিন্ন অনুষঙ্গে লেখক যে সঞ্চরণ করেছেন তাতে সাবলীলতা আছে। জাতবর্ণ নিয়ে দক্ষিণপন্থীদের পক্ষ থেকে পরিচিতিসত্তা সহ বিভিন্ন বিভ্রান্তিসৃষ্টির হীনকৌশলগুলি  ও তার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের ধারাবাহিক লড়াইয়ের কথা বলা হয়েছে।  পরিস্ফূট হয়েছে জাত-বর্ণ-সম্প্রদায়-শ্রেণি বিভেদ নিয়ে বস্তুগত বিশ্লেষণ এবং তার বিরুদ্ধে সামাজিক সম্প্রীতি  তথা রাজনৈতিক সংগ্রামের অভিমুখ, কথা, কাহিনির নির্যাস।
ব্রহ্মা অষ্টরম্ভা
অলেকশ দাস। জয়িতা প্রকাশনী। ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড, কলকাতা-৭০০ ০০৯। ১৫০ টাকা।

Comments :0

Login to leave a comment