সায়ন দত্ত
ফ্রান্ৎস কাফকার কালজয়ী উপন্যাসিকা ‘দ্য মেটামরফসিস’-র সেই ঘুমভাঙা সকালটার কথা মনে পড়ে। প্রধান চরিত্র গ্রেগর সামসা একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে সে এক বিশাল, বীভৎস পোকায় পরিণত হয়েছে। এই পরাবাস্তব রূপক যে একুশ শতকের আধুনিক ভারতের রাজপথে আছড়ে পড়ে এক নগ্ন, রূঢ় বাস্তব হয়ে উঠবে, তা বোধহয় স্বয়ং কাফকাও কল্পনা করতে পারেননি।
দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি যখন অবলীলায় বেকার যুবক, চাকরিপ্রার্থী এবং বিক্ষোভকারীদের ‘আরশোলা’ (ককরোচ) বা ‘পরজীবী’ বলে কটাক্ষ করেন, তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে এই রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখে এক প্রজন্মের প্রকৃত অবস্থান ঠিক কোথায়। দিল্লির যন্তর মন্তরের পিচগলা রাস্তায় যখন অন্ধকার নেমে আসে, পুলিশের কেটে দেওয়া বিদ্যুতের লাইনের জেরে চারপাশ যখন নিশ্ছিদ্র কালোর চাদরে ঢেকে যায়, ঠিক তখন সেই নৈঃশব্দ্যের মাঝেই জ্বলে ওঠে কিছু না-ছোড়বান্দা তরুণ-তরুণীর চোখের আগুন।
এই আগুন কোন ফ্যান্টাসি নয়, এ হলো কর্পোরেট ফ্যাসিবাদের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা একদল নিঃস্ব, প্রতারিত যুবকের বেঁচে থাকার অদম্য স্পর্ধা। গ্রেগর সামসা তার রূপান্তরকে নিয়তি বলে মেনে নিয়ে নিঃশব্দে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। কিন্তু আজকের ভারতের এই ‘আরশোলা’-রা নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি, বরং সেই অপমানকেই হাতিয়ার করে তারা রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে ছুঁড়ে দিয়েছে এক ঐতিহাসিক স্পর্ধা।
কর্পোরেট-হিন্দুত্বের কাছে দেশের যুবসমাজ কেবল ‘জীবিত প্রাণী’-তে পরিণত হয়েছে। নিট, সিইউইটি, সিবিএসই-র মতো পরীক্ষায় লাগাতার দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁস আসলে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা নয়া উদারবাদী অর্থনীতির এক সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। এই কাঠামোগত দুর্নীতির জেরে গত কয়েকদিনে বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী আত্মঘাতী হয়েছেন। প্রদীপ মেঘওয়াল, আকাঙ্ক্ষা চতুর্বেদী, আমায়রা বা কাহান প্যাটেলের মতো তরুণ প্রাণগুলোর ঝরে যাওয়ার পরও মোদী সরকারের কোনও প্রতিনিধি তাঁদের পরিবারের সঙ্গে একবার দেখা করার বা দুঃখপ্রকাশ করার সৌজন্যটুকুও দেখায়নি। কারণ, কর্পোরেট-হিন্দুত্বের কাছে যুবসমাজ কেবলই একটা সংখ্যামাত্র।
গত এক দশকে ভারতের তরুণ প্রজন্মের লাঞ্ছনার ইতিহাস কেবল বেকারত্বের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা পরিণত হয়েছে এক কাঠামোগত নিপীড়নে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুঁকো তাঁর ‘ডিসিপ্লিনারি সোসাইটি’ তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা কীভাবে নজরদারি ও শৃঙ্খলার মোড়কে নাগরিকদের শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। আজ এদেশে যখনই কোনও তরুণ চাকরি বা ন্যায্য অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে, তখনই তার ওপর নেমে এসেছে পুলিশের লাঠি, জলকামান অথবা কাঁদানে গ্যাস। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্কলারশিপ। নিয়মিত হয়েছে ফি বৃদ্ধি।
এর প্রতিবাদ করলেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জামিয়া মিলিয়া বা যাদবপুরের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ বা ‘আরবান নকশাল’ বলে দেগে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী স্বরকে কীভাবে প্রতিনিয়ত পদদলিত করা যায়, বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্র তার এক নিখুঁত মেকানিজম তৈরি করেছে। সিএএ বা কৃষক আন্দোলনের মতো যেকোনও গণতান্ত্রিক প্রতিরোধকে ইউএপিএ-এনএসএ দিয়ে দমন করা হয়েছে। সংসদীয় বিরোধী দলগুলির কণ্ঠরোধ থেকে শুরু করে মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে ‘গোদী মিডিয়ায়’ পরিণত করার এই নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্রের সমস্ত পরিসর আজ কার্যত অবরুদ্ধ। গত এক দশক ধরে দেশে এক অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ আজ বুঝতে পেরেছে, এই ‘সিস্টেমে’ মেধা বা পরিশ্রমের কোনও কানাকড়ি মূল্য নেই। কেউ এই সঙ্কটকে এড়াতে ভার্চুয়াল দুনিয়ার অবিরত বিনোদনে ডুবে গেছে। কেউ আবার সঙ্কটের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমেছে।
বিহারের পলিটেকনিক পাশ করা কুড়ি বছরের সুনীল কুমারের মতো তরুণরা, যারা আগে ভোট পর্যন্ত দেয়নি তারাও আজ যন্তর মন্তরকে ‘রাজনীতির ক্লাসরুম’ বানিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে পথে নেমেছে। কাশ্মীর থেকে আসা জাহিদের মতো যুবকরা যখন বলে যে, পেলেট গান আর কাঁদানে গ্যাসের উপত্যকার চেয়ে দিল্লির এই ফুটপাথে বসে প্রতিবাদ করাটা অনেক বেশি গণতান্ত্রিক… তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে রাষ্ট্র তার প্রতিটি প্রান্তের যুবসমাজের কাছেই কতটা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছে।
প্রশ্ন এখানেই এই অসম সংঘাতের ভাষা কী হবে? ইতিহাস বারবার শিখিয়েছে, শোষণের জাঁতাকল যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন শোষিতের প্রতিরোধও চেনা ছক ভেঙে এক নতুন, অমসৃণ ভাষা খুঁজে নেয়। যন্তর মন্তরে তরুণদের আরশোলার মুখোশ পরে আসা, থালা-চামচ বাজিয়ে প্রতিবাদ করা, এসব নিছক কোনও উন্মাদনা নয়। এটা রাষ্ট্রের মেকি গাম্ভীর্যকে সরাসরি ব্যঙ্গ করার এক ধ্রুপদী কৌশল। এই ব্যঙ্গে ভীত হয়েই আইটি সেল পালটা আরশোলা মারার স্প্রে-র অনুকরণে ‘হিট জনতা পার্টি’ বা ছোটদের কার্টুনের অনুকরণে ‘ওগি জনতা পার্টি’ খুলে সোশাল মিডিয়ায় আগ্রাসী প্রচার চালিয়েছে। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই সিজেপি-র ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার প্রায় দেড় কোটি ছুঁয়ে গিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, যুবসমাজের এই স্রোতকে আর রোখা সম্ভব নয়।
বিজেপি অত্যন্ত সুকৌশলে এই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভকে ‘বামপন্থী চক্রান্ত’, ‘কৃত্রিম হতাশা’ এবং বকলমে ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে দেগে দিয়ে জনমানসে একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, যখন এই আদর্শগত মগজধোলাই ব্যর্থ হচ্ছে, তখন রাষ্ট্র তার নগ্ন পুলিশি ও আইনি শক্তি প্রয়োগ করছে। আইটি আইনের ৬৯এ ধারার জুজু দেখিয়ে সম্পূর্ণ মিথ্যে অজুহাতে সিজেপি-র ‘এক্স’ অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়।
যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের পুলিশি হেনস্তা করা হয়েছে, সন্ধ্যার পর আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, জল ও খাবার ঢোকা বন্ধ করা হয়েছে এবং শৌচালয়ও আটকে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের এই আগ্রাসন আসলে এক কোণঠাসা স্বৈরাচারের আদিম ভয়কেই প্রকট করে। যুক্তির ময়দানে হেরে গেলে স্বৈরাচারী ঠিক কতটা বীভৎস হয়ে উঠতে পারে, তা স্পষ্ট। আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে ‘ককরোচ’-দের মনে ইউএপিএ বা এনএসএ-র মতো দানবীয় আইনের ভয়ও সুকৌশলে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই ক্ষোভ কেবল প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের প্রতিবাদ নয়, এক গভীর কাঠামোগত পচনের বিরুদ্ধে সার্বিক বিদ্রোহ। কাঠামোগত পচনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক অটল হিমালয়ের নাম এখন সোনাম ওয়াঙচুক...আজকের উদয়ন পন্ডিত। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যাঁর লড়াইয়ের মূল ক্ষেত্র লাদাখের বরফমোড়া উপত্যকা, তিনি কেন আজ দিল্লির এই ধুলোমাখা রাজপথে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর গভীর জীবনদর্শনে।
ওয়াঙচুক স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁকে কেউ এখানে বসতে বাধ্য করেনি। গত চল্লিশ বছর ধরে ছাত্ররাই তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষ । একজন প্রকৃত শিক্ষক জানেন, কেবল লাদাখের পাহাড় বা নদী বাঁচালেই দেশের মুক্তি আসে না, যদি না প্রজন্ম তৈরির মূল ভিত অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থা সুরক্ষিত থাকে। যখন গোটা দেশ মেরুকরণের রাজনীতিতে বিভক্ত, তখন তাঁর মুখে শোনা যায় ‘ভয়মুক্ত, ঘৃণামুক্ত ভারত’ গড়ার এক অমোঘ ডাক। এই ডাকই নাড়িয়ে দিচ্ছে কর্পোরেট হিন্দুত্বের ভিত।
ওয়াঙচুক স্মরণ করিয়ে দেন, ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর যে রঙিন ফানুস রাষ্ট্র আজ ওড়াচ্ছে, তা আসলে এক চরম প্রহসন। যদি দেশের তরুণ প্রজন্মকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয় । ক্ষমতাদর্পী রাষ্ট্র যখন জবাবদিহি করতে অস্বীকার করে, তখন গণতন্ত্রে নিরলস প্রতিবাদই হয়ে ওঠে প্রান্তিক মানুষের একমাত্র হাতিয়ার। ওয়াঙচুকের এই জেদ আসলে কোনও একক ব্যক্তির জেদ নয়, এটি একুশ শতকের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্ভীক স্পর্ধা, যা প্রমাণ করে রাষ্ট্রযন্ত্র যত নির্মমই হোক না কেন, একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষের নৈতিক মেরুদণ্ডকে সে কোনোভাবেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে না।
শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে গত ২৮ জুন থেকে ওয়াঙচুক আমরণ অনশনে বসেছেন। ১৮ দিনের মাথায় তাঁর স্বস্থ্যের অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক। তবু তিনি এক চুলও সরতে রাজি নন।
এটা একটা সাময়িক ‘ট্রেন্ড’ বা সোশাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন হিসেবে দেখছে না তরুণ প্রজন্ম। এর মধ্যে তারা খুঁজে পাচ্ছে আত্মপরিচয় উদ্ধারের এক সূত্র। যে বেকার তরুণ কোনোদিন কোনও রাজনৈতিক মিছিলে হাঁটেননি, তিনিও আজ যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে এসে নিজের অস্তিত্বের সঙ্কট মেটানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন। ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ’আরশোলা’ কতটা প্রভাব ফেলতে পেরেছে, তার প্রমাণ মেলে খোদ বিজেপি আইটি সেলের মরিয়া আস্ফালনে। কোটি কোটি টাকার কর্পোরেট ফান্ডিংয়ের পরেও ‘আরশোলা’-দের ব্যঙ্গবাণ সামলাতে তারা রীতিমতো ঘাম ঝরাচ্ছে।
সিজেপি একটা বিষয় স্পষ্ট করেছে, বুলেট আর বুলডোজারের রাজনীতিকে মেধা, অদম্য সাহস এবং তীক্ষ্ণ শ্লেষ দিয়েও পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব। এটি আজ আর কেবল যন্তর মন্তরের ফুটপাথে সীমাবদ্ধ নেই। বরং, ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি লাইব্রেরিতে, প্রতিটি চায়ের ঠেকে… যা আগামী দিনের ভারতের এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত গড়ে দিচ্ছে।
আগামী ২০ জুলাই সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিন সিজেপি ‘চলো সংসদ’ অভিযানের ডাক দিয়েছে। রাষ্ট্র হয়তো তার পুলিশি ব্যারিকেড আর অহংকারের মিনার থেকে ভাবছে, অনেক আন্দোলনের মতো এটাও কিছুদিন পর জলকামান আর লাঠির ঘায়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, যে কাঠামোর নিচ থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করে, তার পতন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, সে মানুষের ভেতরের হার-না-মানা জেদকে পরিমাপ করতে পারে না। যন্তর মন্তরের ধুলোমাখা রাস্তায়, নিভে যাওয়া আলোর নিচে আজ স্পর্ধার বীজ বোনা হচ্ছে। যন্তর মন্তরের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা চোখগুলো সেই প্রমিথিউসের আগুনেরই আধুনিক সংস্করণ। এই লড়াই শুধু একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বা একজন মন্ত্রীর ইস্তফার লড়াই নয়, এটা বাঁচার মতো বাঁচার লড়াইয়ের সূত্রপাত। আর যে পচনশীল কাঠামোর পতনের গল্প লেখা শুরু হলো, তা কেবল এক অধ্যায় মাত্র। শাখা-প্রশাখায় তা আরও প্রসারিত হবে। পথের দাবি একমাত্র পথের লড়াইতেই পাওয়া সম্ভব। এর কোনও শর্টকাট নেই।
Highlights
ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলোা, সে মানুষের ভেতরের হার-না-মানা জেদকে পরিমাপ করতে পারে না। যন্তর মন্তরের ধুলোমাখা রাস্তায়, নিভে যাওয়া আলোর নিচে আজ স্পর্ধার বীজ বোনা হচ্ছে। যন্তর মন্তরের অন্ধকারে জ্বলে ওঠা চোখগুলো প্রমিথিউসের আগুনেরই আধুনিক সংস্করণ। এই লড়াই শুধু একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বা একজন মন্ত্রীর ইস্তফার লড়াই নয়, বাঁচার মতো বাঁচার লড়াইয়ের সূত্রপাত।
Comments :0