প্রতীম দে
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস শুধু কিংবদন্তি ফুটবলার, অবিস্মরণীয় গোল কিংবা নাটকীয় ফাইনালের ইতিহাস নয়। এই ইতিহাসের এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল অফিসিয়াল ম্যাচ বল। প্রযুক্তি, নকশা এবং উপকরণের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বকাপের বলও বদলেছে। কখনও তা খেলার গতি বাড়িয়েছে, কখনও গোলকিপারদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে, আবার কখনও রেফারিং প্রযুক্তির অংশ হয়ে উঠেছে।
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের সাধারণ চামড়ার বল থেকে ২০২৬ সালের সেন্সর-যুক্ত স্মার্ট বল—এই দীর্ঘ যাত্রা আসলে ফুটবলের প্রযুক্তিগত বিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি।
১৯৩০: T-Model
উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে ব্যবহৃত হয়েছিল T-Model। এটি ছিল মোটা চামড়ার তৈরি, ভারী এবং বৃষ্টিতে আরও ভারী হয়ে যেত। মজার বিষয়, ফাইনালের প্রথমার্ধে একটি দলের বল এবং দ্বিতীয়ার্ধে অন্য দলের বল ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে T-Model-কে প্রথম বিশ্বকাপের প্রতীকী বল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৯৭০: Telstar
মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। প্রথমবার বিশ্বকাপের জন্য একটি নির্দিষ্ট অফিসিয়াল বল তৈরি করে অ্যাডিডাস—Telstar।
এর ৩২টি কালো-সাদা প্যানেলের নকশা ছিল টেলিভিশন সম্প্রচারের কথা মাথায় রেখে। সাদা-কালো টিভিতে বলটি স্পষ্টভাবে দেখা যেত।
১৯৭৪: Telstar Durlast
পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপে আসে Telstar Durlast। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল পলিইউরেথেন কোটিং, যা বলকে জল ও কাদা প্রতিরোধী করে তোলে। এই বিশ্বকাপ থেকেই অফিসিয়াল বলে ব্র্যান্ডিং এবং টুর্নামেন্টের নাম ছাপানো শুরু হয়।
১৯৭৮ ও ১৯৮২: Tango যুগ
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে আসে Tango Durlast এবং স্পেনে Tango España।
বিশেষ ত্রিভুজাকার নকশা এতটাই জনপ্রিয় হয় যে পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে Tango-ধাঁচের বল ব্যবহৃত হয়েছে।
১৯৮৬: Azteca
মেক্সিকো বিশ্বকাপের Azteca ছিল প্রথম সম্পূর্ণ সিন্থেটিক বিশ্বকাপ বল।
চামড়া থেকে সিন্থেটিক উপাদানে এই পরিবর্তনের ফলে বলের স্থায়িত্ব, জলরোধী ক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণ অনেক উন্নত হয়। উচ্চ তাপমাত্রা ও উচ্চভূমির পরিবেশেও এর পারফরম্যান্স ছিল স্থিতিশীল।
১৯৯০: Etrusco Unico
ইতালি বিশ্বকাপের Etrusco Unico-তে প্রথমবার ব্যবহৃত হয় অভ্যন্তরীণ ফোম স্তর, যা বলকে আরও দ্রুত ও নরম অনুভূতি দেয়।
১৯৯৪: Questra
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের Questra-র মূল লক্ষ্য ছিল গতি বৃদ্ধি।
এর বহুপর্দার গঠন বলকে আরও হালকা ও দ্রুত করে তোলে। ফলে দূরপাল্লার শট ও ফ্রি-কিক আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
১৯৯৮: Tricolore
ফ্রান্স বিশ্বকাপের Tricolore ছিল প্রথম বহুরঙা অফিসিয়াল বিশ্বকাপ বল।
ফরাসি জাতীয় পতাকার রং এবং গ্যালিক মোরগের প্রতীক এতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০০২: Fevernova
জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপের Fevernova প্রচলিত কালো-সাদা নকশা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
সোনালি, লাল ও সবুজের আধুনিক ডিজাইন ফুটবলের নতুন যুগের সূচনা করে।
২০০৬: Teamgeist
জার্মানি বিশ্বকাপে আসে Teamgeist।
এই বলে মাত্র ১৪টি প্যানেল ছিল, যেখানে আগের অধিকাংশ বলে ৩২টি প্যানেল ব্যবহৃত হত। কম সেলাইয়ের কারণে বল আরও গোলাকার হয় এবং শটের নির্ভুলতা বাড়ে।
২০১০: Jabulani
দক্ষিণ আফ্রিকার Jabulani সম্ভবত বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত বল।
মাত্র আটটি প্যানেল ও অত্যন্ত মসৃণ পৃষ্ঠের কারণে বলের গতিপথ অনিশ্চিত হয়ে যেত। গোলকিপারদের অভিযোগ ছিল, মাঝ আকাশে বল হঠাৎ দিক বদলে ফেলত। তবু প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি ছিল এক বড় পরীক্ষা।
২০১৪: Brazuca
ব্রাজিল বিশ্বকাপে আসে Brazuca।
দীর্ঘ পরীক্ষার পর তৈরি এই বলে ছয়টি বিশেষ প্যানেল ব্যবহার করা হয়। Jabulani-র সমালোচনার পর Brazuca-র উড়ান অনেক বেশি স্থিতিশীল ছিল এবং খেলোয়াড়দের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পায়।
২০১৮: Telstar 18
রাশিয়া বিশ্বকাপে Telstar 18 ছিল ১৯৭০ সালের Telstar-এর আধুনিক সংস্করণ।
এতে প্রথমবার NFC চিপ যুক্ত করা হয়, যার মাধ্যমে স্মার্টফোনে বল-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যেত।
২০২২: Al Rihla
কাতার বিশ্বকাপের Al Rihla-তে ছিল Connected Ball Technology।
বলের ভিতরে সেন্সর বসানো হয়, যা প্রতি সেকেন্ডে শত শতবার ডেটা পাঠিয়ে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
২০২৬: Trionda
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল Trionda।
এটি উন্নত সেন্সর প্রযুক্তি বহন করে এবং ম্যাচ পরিচালনায় আরও নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করে। পাশাপাশি এর নতুন চার-প্যানেলের নকশা ও বায়ুগতিবিদ্যা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে; কিছু গোলকিপারের মতে, নির্দিষ্ট গতিতে বলের আচরণ বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে।
Comments :0