প্রায়শই সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি দেখা যায়। বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রাক্কালে সেই ছবি বেশ ভাইরাল হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালের আগে ওই ছবিটি ভাইরাল হওয়ার বিশেষত্ব কি রয়েছে?
সালটা ২০০৭। বার্সেলোনা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত একটি চ্যারিটি ক্যালেন্ডার ফটোশ্যুটে লটারির মাধ্যমে সুযোগ পান একটি পরিবার। একজন মহিলার কোলে পাঁচ মাসের একটি শিশু। ওই মহিলা তাঁর সন্তানকে তুলে দেন মেসির কোলে। ছয় মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে যথারীতি নার্ভাস লিও। পাশেই রাখা একটি বাথটব। সেখানেই মেসি বসিয়ে দিলেন শিশুটিকে। তারপর মায়ের সঙ্গে শিশুটিকে স্নান করাচ্ছেন মেসি। সেই ছবি ফ্রেমবন্দি করছেন জোয়ান মনফোর্ত।
সেদিনের সেই শিশু আজকের লামিন ইয়ামাল। বিস্ময় বালক। বার্সেলোনায় দশ নম্বর জার্সি গায়ে খেলেন। বলা হচ্ছে, মেসির উত্তরসূরি। আগামী রবিবার বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসির প্রতিপক্ষ লামিন। যে কারণেই এখন আবার ইয়ামালকে মেসির স্নান করানোর ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে সোশাল মিডিয়ায়।
সেদিনের ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন চিত্রগ্রাহক মনফোর্ত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে মনফোর্ত বলছেন, ‘‘এটা খুবই কাকতালীয় ঘটনা। যা আপনার কল্পনার চেয়েও অনেক বড়। এই গল্প যদি কোনও সিনেমায় লেখা হতো, তাহলে সেটাকেও অবাস্তব বলে মনে হতো।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘ছবির শিশুটি যে লামিনে ইয়ামাল, তা আমি জানতামই না। ২০২৪ সালে আমার এক বন্ধু ফোন করে জানায়, ইয়ামালের বাবা সেই ছবিটি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছেন।’’
সাক্ষাৎকারে একটি মজার তথ্য শেয়ার করেছেন মনফোর্ত। আজকের দিনে তিন সন্তানের বাবা লিও সেদিন ইয়ামালকে কোলে নেওয়ার সময় ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘মেসি এমনিতেই খুবই অন্তর্মুখী, শান্ত এবং লাজুক মানুষ। তিনি ড্রেসিংরুমে ঢুকে হঠাৎ দেখলেন, তাঁকে একটি ছোট্ট শিশুকে নিয়ে ছবি তুলতে হবে। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কী করবেন তিনি বুঝতেই পারছেন না! পরিস্থিতি তাঁর জন্য বেশ অস্বস্তিকর ছিল। প্রথমে তো তিনি বুঝতেই পারছিলেন না, শিশুটিকে কীভাবে কোলে নেবেন। লামিনে ছিল খুবই হাসিখুশি একটি শিশু। ওর মা শেইলা আমাদের অনেক সাহায্য করেছিলেন। তিনি তখন খুবই তরুণী ছিলেন। পরিবারটি আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল ছিল না, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল দারুণ। মেসিও সবসময়ের মতো পেশাদার ছিলেন এবং খুব দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন।’’
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল নামে পরিচিত। আদতে এটি তাঁর নামই নয়। তাঁর আসল নাম নাসারউ ইবানা। অবশ্য লামিন ইয়ামাল নামের নেপথ্যের কাহিনি খুবই আকর্ষণীয়। ইয়ামাল জন্মানোর আগে আর্থিক দুর্দশায় পড়েছিলেন মরক্কোন বাবা মুনির নাসারউ। তখন লামিন এবং ইয়ামাল নামের দু’জন ব্যক্তি তাঁর পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেছিলেন। খারাপ সময়ে মুনিরের পাশে থাকার সুবাদে মুনির-শেইলা মিলে সিদ্ধান্ত নেন, তাঁদের পুত্রের নামের সঙ্গে ‘লামিন’ ও ‘ইয়ামাল’ যুক্ত করবেন দুই সহৃদয় ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করার জন্যে।
লামিনের শৈশবেই তাঁর বাবা-মা আলাদা হয়ে যান। লামিনকে বড় করার দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর দিদার কাঁধে। চরম আর্থিক কষ্ট। কিন্তু লামিনকে বড় করে তুলতে লামিনের দিদা দিনরাত পরিশ্রম করতেন। ছোট থেকেই ফুটবলের প্রতি আর্কষণ লামিনের। ফুটবল বাড়িতেই খেলতেন। দিদা বুঝতেই পেরেছিলেন নাতির আগ্রহ। নিজের কাজ সামলেও লামিনকে রোজ ট্রেনিংয়ে নিয়ে যেতেন। তাঁর বয়স যখন চার, গ্রানোলার্সের একটি স্থানীয় ক্লাবে লা টোরেটায় ফুটবলের পাঠ নেওয়ার জন্য ভর্তি হন লামিন। তাঁর সহজাত প্রতিভা নজরে আসে বার্সেলোনার। মেসির মতো ছোট বয়সেই লা মাসিয়া স্কাউট করে তাঁকে। মাত্র ছ’বছর বয়সে বার্সার স্কাউটরা ইয়ামালকে নিয়ে যান লা মাসিয়াতে। লামিন এত দ্রুত সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করেন যে, তাঁর উত্থান দেখে রীতিমতো চমকে যান বার্সা অ্যাকাডেমির শিক্ষকরা। তাঁদের মনে হয়েছিলেন, মেসির পরবর্তী যুগে ইয়ামালই ব্যাটন বইবে। তাঁকে সরাসরি যুক্ত করা দেওয়া হয়, জুভেনাইল ‘এ’ টিমে। যে দলে সদস্যরা লামিনের চেয়ে বয়সে বড়।২০০২-২৩ মরশুমে বার্সার কোচ জাভি হার্নান্ডেজ। তাঁর মতো ফুটবলার কখনই জহুরি চিনতে ভুল করবেন না। লামিনকে একবার দেখেই সিনিয়র দলের সঙ্গে ট্রেনিং করানোর সিদ্ধান্ত নেন। জাভির প্রশিক্ষণে বার্সার হয়ে লামিনের অভিষেক মাত্র ১৫ বছর বয়সে। বার্সেনোলার ইতিহাস সর্বকনিষ্ঠ হিসাবে অভিষেক হয় তাঁর। ৮ অক্টোবর, ২০২৩ লা লিগার গ্রানাডার বিপক্ষে বার্সার জার্সিতে প্রথম গোল করেন তিনি। এরপর আর তাঁকে পিছন ফিরে তাঁকাতে হয়নি। ক্লাবের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বাদ দিলে সমস্ত ট্রফি জিতেছেন। লা লিগা, কোপা দেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ। দেশের জার্সিতেও ইউরো জিতেছেন দু’বছর আগেই। কেরিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপে নজর কেড়েছেন। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে গোল করেই হাতের আঙুল দিয়ে ’৩০৪’ সংখ্যাটি তৈরি করেন। এর নেপথ্যেও একটি গল্প রয়েছে। বার্সেলোনার মেট্রোপলিটান এরিয়ায় জন্ম হলেও বেড়ে উঠেছেন রোকাফোন্ডায়। সেখানকার পোস্টাল কোড হলো (০৮৩০৪)। লামিন বিখ্যাত হওয়ার পর থেকেই রোকাফন্ডার শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের জন্য গর্ব ও স্বীকৃতি উৎস হিসাবে ধরা হয়।
হয়তো এই বিশ্বকাপের শেষে বিদায় নেবেন মেসি। থেকে যাবেন ইয়ামাল। তাঁর সহজাত ড্রিবল, দু’তিন জন ডিফেন্ডারদের ছিটকে দিয়ে অনায়াসে গোল করে আনন্দ দেবেন ফুটবল পিপাসুদের। প্রশ্ন হচ্ছে, মেসিকে পরাস্ত করেই কি প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাবেন? না তাঁকে মেসির মতোই অপেক্ষা করতে হবে?
ফটোগ্রাফার মনফোর্ত অবশ্য চাইছেন, শেষ হাসি হাসুক মেসি। তিনি বলেন, ‘‘আমি বার্সেলোনার সমর্থক। আমার মনে হয়, মেসি যদি দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে ক্যারিয়ার শেষ করতে পারেন, সেটাই হবে তাঁর প্রাপ্য। আর লামিনের সামনে এখনও অনেক সময় আছে বিশ্বকাপ সহ বড় বড় শিরোপা জেতার। তবে যদি সে এখনই জিতে যায়, তাহলে এই সাফল্যের মূল্য হবে অন্য সব কিছুর চেয়ে অনেক বেশি। সত্যি বলতে, আমার হৃদয় যেন দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে।’’
FIFA World Cup Final
বাথটবে হাতে ধরা সেই শিশুই এবার প্রতিপক্ষ
×
Comments :0