Jute Industry

পাট শিল্পের রক্ষার দায়িত্ব শুধু শ্রমিক, কৃষকের নয়

স্পটলাইট

বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়

অবিভক্ত বাংলায় যে শিল্পগুলি প্রধান সারিতে ছিল, তাদের অন্যতম হলো পাটশিল্প । গোটা দক্ষিণ এশিয়াতে পাট পাওয়া গেলেও অবিভক্ত বাংলায় (ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ ) পাটের রমরমা ছিল সবচেয়ে বেশি । মূল কারণ নদীমাতৃক বঙ্গদেশের পরিবেশ পাটচাষের পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী ছিল, ফলে ভারতবর্ষে ব্যবসা করতে আসা ব্রিটিশরা আজ থেকে ১৫০ বছর আগে পাটশিল্পের পত্তন করেন এবং তখন থেকেই সব ধরনের জিনিস এমনকি খাদ্যশস্য সারা পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত হতো পাটের তৈরি ব্যাগ। পাটশিল্প বাঙালি জনজীবনের এক অন্যতম সম্পদ। পাটশিল্পকে আশ্রয় করে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে এক বিশেষ আর্থ-সামাজিক পরিবেশ, যা বাঙালির বহমান ইতিহাসের অন্যতম সঙ্গী । বাংলার সাহিত্যে, বাঙালির মননে পাটশিল্প এক বিশেষ মূলধন, যার উপর দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির অর্থনৈতিক জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু আজ সেই পাটশিল্প বিপন্ন।

দেশভাগ

বলা বাহুল্য, অবিভক্ত বাংলায় পাট ব্যবসার প্রসিদ্ধি ছিল বিশ্ব জুড়ে। দেশভাগের পর এ রাজ্যেও পাট উৎপাদনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বছরে গড়ে ৮০ থেকে ৮২ লক্ষ বেল পাট উৎপাদিত হয় এই রাজ্যে। মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর চব্বিশ পরগনা, মালদা, জলপাইগুড়ি, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার, দার্জিলিং ও হাওড়া জেলার কিছু অংশে পাটচাষ হয়। ৪০ লক্ষ মানুষ পাটচাষের সঙ্গে যুক্ত। বিদেশি মুদ্রা অর্জনে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের বিপুল চাহিদা। 
উল্লেখ করা যেতে পারে ব্রিটিশ আমলে পাটচাষ হতো মূলতঃ বাংলাদেশে, কিন্তু চটকলগুলি স্থাপিত হয়েছিল অধুনা পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার অববাহিকায়, মূলতঃ দক্ষিণবঙ্গে। দ্বিখণ্ডিত স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে পাটচাষ আরম্ভ হয় এবং বহু জায়গাতেই কৃষকরা পাটচাষ করে অর্থ উপার্জনে সক্ষম হয়। ফলত পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ব্যবস্থায় বিশেষ পরিবর্তন আসে এবং রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার চটকলগুলির স্বার্থে কৃষককে পাট চাষের জন্য উৎসাহিত করেন এবং পরবর্তী ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জুট কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া গড়ে ওঠে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল জুট শিল্পকে আরও উন্নত পর্যায়ে উন্নীত করা কারণ বিদেশি মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বিষয় ছিল পাট রপ্তানি।
বলা বাহুল্য সারা বিশ্বে স্বীকৃত চট ও ফাইবার বায়ো ডিগ্রেডেবল ও পরিবেশ বান্ধব। একথা সকলেরই জানা আছে যে চটশিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে । পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে এটা কৃষিভিত্তিক শিল্প, শ্রমনিবিড়, বায়ো ডিগ্রেডেবল ও পরিবেশ বান্ধব এবং রপ্তানি যোগ্যও বটে। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ৪০ লক্ষ পাটচাষি ও ২.৫০ লক্ষ শ্রমিক, স্বনিযুক্ত হস্তশিল্পী এবং পরোক্ষভাবে আরও বহু শ্রমজীবী মানুষ, এ রাজ্যে, এর উপর নির্ভরশীল । আমাদের রাজ্য ছাড়াও পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বহু মানুষ এই ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত।
সারা দেশে Composite Jute Mill হচ্ছে ৮৩ টি। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ৬৪টি, বর্তমানে তার মধ্যে ৪৯ টি চালু আছে। অন্ধ্র প্রদেশে ৭টি, বিহারে ৩টি, উত্তর প্রদেশে ৩টি, আসামে ২টি, ওডিশায় ১টি, ছত্তিশগড়ে ২টি এবং ত্রিপুরায় ১টি। দেশের নানান জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ৮৩ টি চটকলে চটের উৎপাদনের পরিমাণ ২০ লক্ষ ৫০ হাজার টন । এই বিপুল উৎপাদনের মধ্যে গৃহস্থ জীবনে ব্যবহৃত হয় সাকুল্যে ২ লক্ষ ৪০ হাজার টন চট। তাছাড়া, প্রতি বছর গড়পড়তা ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টন চট রপ্তানি হয়। পড়ে থাকা ১৭ লক্ষ টন চট ‘জুট প্যাকেজিং আইন’-এর মাধ্যমে রেশনে খাদ্যদ্রব্য বণ্টন ও চিনির প্যাকিং-এ ব্যবহৃত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে চটের ব্যবহার ক্রমাগত নিম্নমুখী, যদিও নির্বাচনের সময় প্রত্যেক রাজনৈতিক দলই জুট শিল্পকে ঘিরে নানা প্রতিশ্রুতি দেন কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী অধ্যায়ে সমস্ত প্রতিশ্রুতি হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

ছিন্নমূল কৃষকের আবাস চটকল

ইংরেজ আমল থেকে সামন্ততান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থাতে কৃষক ছিল জমিহীন খেতমজুর। জমিদারের অত্যাচারে প্রায়শই খেতমজুররা গ্রামছাড়া হতো আর তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল নবনির্মিত চটকল। কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’ নামক ছোটগল্পটি তার এক অনন্য উদাহরণ। সর্বস্বান্ত রহমৎ গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হয়ে তার ছোট মেয়ে আমিনার হাত ধরে উলুবেড়িয়ার চটকলের দিকে পা বাড়িয়ে ছিল, কেবলমাত্র বেঁচে থাকার জন্য। এইভাবে বিহার, উত্তর প্রদেশ, ওডিশা এবং সুদূর দক্ষিণ থেকেও জমিহীন কৃষক কাজের সন্ধানে চটকলে শ্রমিকে পরিণত হতো। চটকলে কাজ করে সর্বস্বান্ত কৃষকরা সর্বহারা শ্রমিকে পরিণত হতেন। তাঁদের না আছে কোনও ভবিষৎ, না আছে বেঁচে থাকার সুখ। সাম্প্রতিককালে চট শ্রমিকদের সমস্যা আরও গুরুতর আকার ধারণ করেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, গ্রামে আজ পাটচাষও সঙ্কটের মুখে কারণ জলের অমিল। সবদিক থেকেই এক গভীর সঙ্কটের আবর্তে পাটচাষ ও চটশিল্প। শিল্পায়ন নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, সভা হচ্ছে, বিদেশে যাতায়ত হচ্ছে মন্ত্রী আর আমলাদের। কিন্তু শিল্পমেলা বা শিল্প সংক্রান্ত সভাতে চটকলের সমস্যাটি ব্রাত্যই থেকে গেছে।

উত্তরণের পথ খোঁজা

সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গে চট শিল্প এক গভীর বিপন্নতায় আক্রান্ত। প্রত্যেকদিনই খবরের কাগজ খুললেই চটকল বন্ধের খবর পাওয়া যায়। হাজার হাজার জুটমিল শ্রমিক তাঁদের আইনি প্রাপ্য পাচ্ছেন না। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে এসে পাটশিল্পের উন্নতির কথা বলেছেন। আগেও প্রধানমন্ত্রী পাটশিল্পের সমস্যার সমাধানের জন্য আশ্বাস দিয়েছিলেন। নির্বাচন এলেই এমন প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়। কিন্তু বর্তমানে ২৩টি জুটমিলের মালিকরা ক্রমাগত তাদের লোকসানের গল্প তৈরি করে শ্রমিকদের সঠিক পাওনা আত্মসাৎ করে চলেছে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন। পাটকল মালিকরা ভারত সরকারের কাছ থেকে চটের বস্তা বানানোর বরাত বা অনুমোদন পায়। এই চটের বস্তা তৈরির অর্থমূল্য কি হারে দেওয়া হবে সেটিও ভারত সরকার ঠিক করে দেন। এই মূল্যের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন এবং অন্যান্য আইনি আর্থিক সুবিধার হিসাবও ধরা থাকে। এক্ষেত্রে অবসরের পর শ্রমিকদের প্রাপ্য টাকা না দেওয়ার একটাই অর্থ করা যায় যে পাটকল মালিকরা ইচ্ছাকৃতভাবেই শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চিত করছে। এমনকি সুকৌশলে শ্রমিকদের অবসর সংক্রান্ত সামাজিক সুরক্ষার বিধি এড়াতে মালিকরা ঠিকা কর্মী ও চুক্তি-ভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করছে। উদ্দেশ্য একটাই যে এই ধরনের অস্থায়ী শ্রমিকদের বেলায় অবসর সংক্রান্ত দেনা-পাওনার কোনও ঝক্কি নেই।
চটশিল্পের বিপন্নতা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা কেবলমাত্র শ্রমিক বা কৃষকের দায়িত্ব নয়। পাটচাষে যেমন ৪০ লক্ষ কৃষক এবং ২ লক্ষের বেশি শ্রমিক জড়িত ঠিক তেমনিভাবে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মসংস্থানের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই শিল্প। প্রত্যেকটি জুটশিল্পে ম্যানেজার থেকে সুপারভাইজার সহ কেরানির সংখ্যা কমপক্ষে ৭৫ থেকে ১০০। এই পাটচাষ এবং চটশিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ছোট বড় ব্যবসায়ী শ্রেণি যাদের মূল ক্রেতা চটশিল্পের শ্রমিক এবং পাটচাষিরা। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে পাটচাষ ও চটশিল্প এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই শিল্পকে ঘিরে কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় এবং যার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির উত্তরণ ঘটে আর সেই উত্তরণের অংশীদার প্রান্তিক চাষি, সর্বহারা শ্রমিক তথা মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত যুবক সহ ছোট বড় অসংখ্য ব্যবসাদার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়বস্তু হলো পাটশিল্পের এই বিপন্নতা নিয়ে শ্রমিকরা কমবেশি চিন্তিত হলেও কৃষকরা সেইভাবে চিন্তিত নয় কারণ তারা পাটচাষের জমিতে অন্য ফলন করতে অভ্যস্ত হয়েছে। কিন্তু সবথেকে বেশি সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে শ্রমিক সহ মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও পাটশিল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ীদের জীবন। 
স্বাধীনতার পরে জুটশিল্পের ইতিহাসে ক্রমান্বয়ে বিপন্নতা বাড়ছে বিশেষ করে ১৯৮০-র দশক থেকে পাটশিল্পের সমস্যা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। জুটমিল বন্ধ হবার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক আক্রান্ত হলেন। দু’-একটি ছোটখাট মিছিল হলেও পশ্চিমবঙ্গের বুকে তেমন কোন আন্দোলনের ঝড় উঠল না। এমন একটা মনোভাব যেন বিষয়টি খুবই তুচ্ছ। এই আন্দোলন বিমুখতা গণতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তার পক্ষেও অশনিসংকেত। বিকাশ মানে কেবলমাত্র ভোটদান নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী ভাবনা ও তার প্রকাশই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি বিশেষ চরিত্র। গণতান্ত্রিক প্রকাশ জন্ম দেয় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আর তারই গর্ভে জন্ম নেয় প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ।

 

Comments :0

Login to leave a comment