ভাস্কর দাশগুপ্ত: পুরুলিয়া
আজকের পুরুলিয়া। একদা নাম ছিল মানভূম। সেই সময় সারাদেশ নয় ,সারা বিশ্ব জুড়ে পরিচিত ছিল মানভুম লাক্ষা। মানভূমের লাক্ষা ছিল পৃথিবী বিখ্যাত। ব্রিটিশ আমলেই পুরুলিয়ার বলরামপুরে শুরু হয়েছিল লাক্ষা চাষ। ব্রিটিশ সাহেবরা ব্যবসার স্বার্থে সেখানে অসংখ্য লাক্ষা কুঠি স্থাপন করেছিল। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে যতই সে লাক্ষা শিল্প রুগ্ন হতে শুরু করেছে। চলতি বছরের জুন মাসে বলরামপুরে লাক্ষা শিল্প জি আই স্বীকৃতি পেয়েছে। চলতি মাসের কয়েকদিন আগেই লোকসভার প্রশ্নোত্তর পর্বে কেন্দ্রের বাণিজ্য ও শিল্প রাষ্ট্রমন্ত্রী জিতিন প্রসাদ পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোর প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন পুরুলিয়াকে ঘিরে লাক্ষা রপ্তানি হাব গড়ে তোলা হবে। যার ফলে জেলার অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। লাক্ষা শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটবে। এখানকার লাক্ষা ব্যবসায়ীরা বিদেশেও রপ্তানি করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু এখন যেখানে লাক্ষা চাষটাই বন্ধ হয়ে গেছে সেখানে কিভাবে লাক্ষা রপ্তানি করা যাবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছেন না লাক্ষা চাষী থেকে লাক্ষা ব্যবসায়ী সকলেই। বলরামপুরে কমেছে লাক্ষা চাষ ও চাষির সংখ্যা।
সারা দেশের মধ্যে এক সময় বলরামপুর হয়ে উঠেছিল সারা দেশের লাক্ষা শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র। একসময় এখানে প্রায় দেড় শতাধিক লাক্ষা কুঠি ছিল। সেখানে কয়েক হাজার পুরুষ এবং মহিলা শ্রমিক কাজ করতেন। সেই লাক্ষা কুঠির সংখ্যা কমতে কমতে আজ ১০ থেকে ১২ টা তে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবর্তন। কাঁচামালের দাম বেড়েছে। লাক্ষা একটি অতি ক্ষুদ্র পোকা। দেখতে উকুনের মতো। রেশম ও মৌমাছির মতো লাক্ষা পোকার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। পোকাটি প্রাণীজাত বহুমুখী কর্মশক্তি সম্পন্ন। এর নিঃসৃত রজন জাতীয় পদার্থ ও লাক্ষার উপাদান পারফিউম, অস্ত্র, রেলওয়ে, জাহাজ, ওষুধ, চামড়া ও বৈদ্যুতিক শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্প কলকাখানা এবং জুয়েলারীতে চুরিবালা তৈরী,পিতল ও আসবাবপত্রের বার্ণিশে ব্যবহার হয়। ইদানীং এর উপাদান চকলেট, চুইংগাম ও লেবু জাত্যীয় ফলের সংরক্ষণ গুন বৃদ্ধির জন্য কোটিন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বলরামপুর, বাগমুন্ডি সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রচুর গ্রামীণ মানুষ লাক্ষা চাষ করতেন কুসুম, কুল, পলাশ প্রভৃতি গাছে। ধীরে ধীরে সে কাজে ভাঁটা পড়েছে। বিশ্বনাথ হাঁসদা নামে এক লাক্ষা চাষি জানিয়েছেন, একসময় তিনি লাক্ষা চাষ করতেন। কিন্তু বীজের দাম এতটা পরিমাণ বেড়ে গেছে যে চাষ করে এখন আর লাভ করতে পারছেন না। সেই সমস্ত গাছের সংখ্যাও এখন কমে গেছে। একদা ছিলেন লাক্ষা চাষি- আজ তিনি হয়েছেন লাক্ষা কুঠির শ্রমিক। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়াতে চাষিরাও উৎসাহ হারিয়েছেন।
পুরুলিয়ার লাক্ষা চাষের রমরমা অবস্থা দেখে একসময় এখানে লাক্ষা রিসার্চ সেন্টারের শাখাও করা হয়েছিল। প্রধান অফিস ছিল রাঁচির নামকুম। বলরামপুরের রিসার্চ সেন্টারে গবেষণা করা হতো কোন গাছের চাষে কিভাবে লাক্ষা ব্যবসাকে এবং লাক্ষা চাষকে আরো লাভজনক করা যায়। কিন্তু সে সব কাজই এখন অতীত ইতিহাস। সেই রিসার্চ সেন্টার এখন বন্ধ হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ লাক্ষা আর্টিজেন্স সোসাইটি লিমিটেডের ম্যানেজার কৃষ্ণ কমল গড়াই জানিয়েছেন, বলরামপুরে লাক্ষা চাষের বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। লাক্ষা চাষির সংখ্যাটাও এখন বলরামপুরে কমে গেছে। বাইরে থেকে মাল নিয়ে এসে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ বলরামপুরের লাক্ষা শিল্প এখন ধুঁকছে।
বামফ্রন্ট সরকারের সময় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলরামপুরের লাক্ষা চাষের জন্য লাক্ষা ক্লাস্টার তৈরি করার। ২০১১ সালের পর তৎকালীন রাজ্য সরকার একেবারে নীরব ছিল লাক্ষা শিল্পের পুনরূজ্জীবনের ব্যাপারে। ২০১৭ সালে বলরামপুরে লাক্ষা ক্লাস্টার নির্মাণ করা হয়েছিল। ব্যাস সেখানেই সব শেষ। ইলেকট্রিক বিল বকেয়া থাকার জন্য সেই ক্লাসটারের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এখন আর কোন লাক্ষা চাষি বা লাক্ষা ব্যবসায়ী সেখানে যান না । সবকিছু তা তালা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এখন সেখানে বলরামপুর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দপ্তর করা হয়েছে।
এই জেলায় রয়েছে প্রচুর কুসুম,পলাশ, কুল গাছ। একসময় কুসুম গাছেও লাক্ষা চাষ হতো। সম্ভাবনা ছিল যথেষ্টই। কিন্তু উপযুক্ত পরিকাঠামো এবং সরকারি উদ্যোগের অভাবে বলরামপুরের লাক্ষা শিল্প একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন প্রকল্প নিয়ে এখনই আশায় বুক বাঁধতে চাইছেন না বলরামপুরের লাক্ষা। চাষের সঙ্গে সংযুক্ত মানুষজন। অপেক্ষা হারানো শিল্পের পুনরুজ্জীবনের। কবে তার বাস্তবায়ন হবে সেটার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সকলে।
Lac Industry
ধুঁকছে জিআই স্বীকৃতি পাওয়া বলরামপুরের লাক্ষা শিল্প
×
Comments :0