Flood situation in East Medinipur: CPI(M) stands by the distressed people

বন্যা পরিস্থিতি পূর্ব মেদিনীপুরে, আর্ত মানুষের পাশে সিপিআই(এম)

রাজ্য জেলা

খেজুরির বঙ্গোপসাগর উপকূল।

রামশঙ্কর চক্রবর্ত্তী


সমুদ্র ছুঁয়েছে গ্রাম। বঙ্গোপসাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে খেজুরির কাদেরাবাড়চর সমুদ্র বাঁধে। ফলে প্রায় দেড় কিলোমিটার সমুদ্র বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পথে। ইউক্যালিপটাসের খুঁটি মেরে কোনো রকম ঠেকানো আছে। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যাবে বাঁধ। আমফান পরবর্তীতে এমন পরিস্থিতি এবার তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যেই পটাশপুরে কেলেঘাই নদীর জলে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা।
লাগাতার বৃষ্টিতে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আশঙ্কা বন্যার। বিশেষ করে সমুদ্র ও নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছে। আসলে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকবার শঙ্করপুর, শৌলা, খেজুরি, পটাশপুর, ভগবানপুর, পাঁশকুড়া, মহিষাদল, নন্দীগ্রাম, হলদিয়া, তমলুক গ্রামীন, নন্দকুমার সহ অন্যান্য এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বহু ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। দেশপ্রাণ ব্লকের বাঁকিপুট থেকে শুরু করে রসুলপুর নদীর এপারে বিস্তীর্ণ খেজুরি এলাকায় বঙ্গোপসাগরের পাড় ধরে কেন পাকাপোক্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি? প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। তেমনি কেলেঘাই, কাসাই নদীর পাকা বাঁধ, নদীর ড্রেজিং এবং নিকাশি খাল গুলি সংস্কার না করার মাশুল দিতে হচ্ছে পটাশপুর, ভগবানপুর, পাঁশকুড়া এলাকার বাসিন্দাদের। লক্ষাধিক মানুষ প্রতি বর্ষাতেই আতঙ্কে থাকেন প্লাবিত হওয়ার। গবাদি পশু নিয়ে ইতিমধ্যেই খেজুরির উপকূল এলাকার বাসিন্দারা রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে বাঁধ ভাঙতে পারে তার জন্য এলাকার বাসিন্দারাই ভাঙা বাঁধ মেরামত করছে। রবিবার রাত থেকে যেভাবে লাগাতার বৃষ্টি হচ্ছে তাতে  বাঁধ ভাঙার সম্ভাবনা প্রবল। সমগ্র খেজুরি সহ নন্দীগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা গুলি বন্যায় ডুবে যাবে। খেজুরির উপকূল এলাকায় সিপিআই(এম)'র প্রতিনিধি দল পৌঁছেছে।
কেলেঘাই নদীর একাংশে বাঁধ ভেঙে পটাশপুরের একাংশ জলমগ্ন হয়েছে ইতিমধ্যেই। পটাশপুর ডেবরা রাজ্য সড়ক জলমগ্ন।
অন্যদিকে হলদিয়া পৌরসভার সমস্ত ওয়ার্ড জলমগ্ন হয়েছে। স্বাভাবিক জনজীবন একেবারেই স্তব্ধ হলদিয়া শহরে। অধিকাংশ কারখানায় জল জমে একাংশে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। মাখনবাবুর বাজার, টাউনশিপ, চিরঞ্জীবপুর প্রভৃতি এলাকায় রাস্তা ছাপিয়ে ঘরের মধ্যে জল জমেছে। বস্তি এলাকা জলমগ্ন। বস্তির বাসিন্দাদের এখন আশ্রয় পাকা রাস্তার উপর। সুতাহাটা, ব্রজলালচক সহ হলদিয়া গ্রামীণের বিস্তৃর্ণ এলাকায় রাস্তা ডুবেছে। সিপিআই(এম) এর পাশাপাশি সিআইটিইউ কর্মীরা এলাকায় থেকে দুর্গতদের সহায়তা করছে।
অন্যদিকে মহিষাদলের নদী তীরবর্তী অমৃতবেড়িয়া, দনিপুর এলাকায় নদী বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি তমলুক শহরের একাধিক ওয়ার্ডে কোথাও হাঁটু সমান কোথাও কোমর সমান জল। গতবছর কাঁসাই নদীর বাঁধ ভেঙে পাঁশকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জল জমেছিল এই এলাকায় এবারের লাগাতার বর্ষণে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পাঁশকুড়া জুড়ে। রীতিমত বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন এলাকাবাসী। চন্ডিপুর এলাকার কিছু অংশে ঘরবাড়ি জলে ডুবেছে।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বর্তমান যা পরিস্থিতি তাতে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। কেলেঘাই, কাঁসাই, হলদি, রূপনারায়ন নদী বিপদ সীমার উপর দিয়ে বইছে। জেলার সমুদ্র ও নদী উপকূলবর্তী শংকরপুর, তাজপুর, শৌলা, জুলপুট, বাঁকিপুট, রসুলপুর, খেজুরি, নন্দীগ্রাম, হলদিয়া, মহিষাদল, নন্দকুমার, তমলুক, পাঁশকুড়া, কোলাঘাট, ময়না, ভগবানপুর, পটাশপুর এলাকার কয়েক লক্ষ বাসিন্দা বন্যার আশঙ্কায় রয়েছেন। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ইতিমধ্যেই। ধান, সবজি এবং পান চাষে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। অতি বর্ষণে সবজি এবং পান চাষে ক্ষতি হয় সর্বাধিক। কিছুদিন আগেই ধান রোয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যেই এমন বর্ষায় ফসল উৎপাদন হবে না বলেই বলছেন কৃষকরা। তেমনি সবজি চাষের জমিতে জল জমার ফলে উৎপাদন একেবারেই নষ্ট হবে। যার ফলে সবজি এবং ধানের দাম বাড়বে। আবার পান গাছের গোড়া জমা জলে পচে যায় ফলে এই বৃষ্টির পর নতুন করে পান চারা রোপন করার কাজ করতে হবে। ধান পান এবং সবজি চাষের এমন বিপুল পরিমাণ ক্ষতি সরকারি সহযোগিতা ছাড়া পূরণ করা সম্ভব নয় বলছেন কৃষকরা। এদিকে লাগাতার বৃষ্টিতে ভগবানপুরের বিভিন্ন এলাকায় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী চাল, মুড়ি, ডিম, সবজি দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছে। জেলার এমন দুর্যোগে সিপিআই(এম) সহ ডিওয়াইএফআই, রেড ভলেন্টিয়ারের কর্মীরা এলাকায় দুর্গতদের পাশে রয়েছেন। ডিওয়াইএফআই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পক্ষ থেকে মহকুমা ও ব্লক স্তরে হেল্পলাইন নাম্বার খোলা হয়েছে। হলদিয়া সহ বিভিন্ন এলাকায় সিপিআই(এম)'র পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় খাবার, জল বিতরণ করা হয়েছে। জেলা সম্পাদক নিরঞ্জন সিহি বলেন আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী আগামী ৪৮ ঘন্টা এমন লাগাতার বৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপর্যস্ত সমস্ত এলাকায় প্রশাসনের সহযোগিতা তেমন মিলছে না। সরকারের চরম উদাসীনতা। সিপিআই(এম)'র পক্ষ থেকে জেলার প্রতিটি ব্লক এলাকায় প্রতিনিধি দল সহায়তার জন্য পৌঁছেছে। কোথাও শুকনো খাবার, জল দেওয়া চলছে। পাঁশকুড়া, পটাশপুর সহ নদী ও সমুদ্র তীরবর্তী এলাকাগুলির জন্য বিশেষ নজর দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে ইতিমধ্যেই আবেদন করা হয়েছে।"
এদিকে বর্তমান খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন এলাকায় জল জমে বন্যার মতো যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের সাহায্যের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান পটাশপুর ও হলদিয়ায় ২টি এনডিআরএফ দল এবং পটাশপুরে ১টি এসডিআরএফ দল মোতায়েন রয়েছে। ত্রাণ ও জরুরি পরিষেবার কাজে সাহায্য করার জন্য জেলার সব ব্লকে প্রায় ৪০০ জন সিভিল ডিফেন্স কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতির উপর সারাক্ষণ নজর রাখতে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্লক, মহকুমা ও জেলা স্তরে ২৪ ঘণ্টা ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে। বিভিন্ন দফতরের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ চলছে।জেলা প্রশাসন গোটা পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখছে। মাঠে থাকা দলগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

Comments :0

Login to leave a comment