বারুইপুরে নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ধৃত প্রভাস মণ্ডলের ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হওয়ার ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট পুলিশের কাছে চাইলো কলকাতা হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী, বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিসন বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পুলিশ সুপারকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ হলফনামা আকারে আদালতে জমা দিতে হবে। আগামী ১৮ আগস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে তার আগেই বারুইপুর জেলা পুলিশ সুপার অরবিন্দ কুমার আনন্দকে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানাতে হবে।
নাবালিকা ধর্ষণের ঘটনায় ও খুনের অভিযোগে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ, যাদের অন্যতম ছিল প্রভাস মণ্ডল। গ্রেপ্তারির কয়েকদিনের মধ্যেই গভীর রাতে তাকে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ বাহিনী। পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থলে পৌঁছেই প্রভাস নাকি এক পুলিশকর্মীর হাত থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পালটা গুলি চালালে প্রভাসের মৃত্যু হয়। পুলিশের এই ‘এনকাউন্টার’ তত্ত্ব নিয়ে রাজ্য জুড়ে জোরালো সন্দেহ দেখা দেয়।
প্রশ্ন উঠেছে যে, কিশোরীর ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য গভীর রাতে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কেন পুলিশি ‘এনকাউন্টারে’ মৃত প্রভাস মণ্ডলকে? পুলিশের একাংশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, অপরাধ যেহেতু রাতে হয়েছে তাই কীভাবে সেখানে অভিযুক্তরা নাবালিকাকে নিয়ে গেছিল তা জানতেই রাতে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। যদিও প্রভাস নিহত হওয়ার পর বাকি ৩ অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে, একই কারনে পুলিশ নিয়ে গেছিল দিনে। এতে এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। পুলিশের সেদিনের দাবি যদি সত্যি হয় তাহলে পরে দুপুরে ‘পুনর্নির্মাণ’ হলো কিভাবে? অতি গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে একাই বা কেন গভীর রাতে পুনর্নির্মাণের নামে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? তখন বাকিদের নেওয়া হয়নি কেন? প্রশ্নের কোনও জবাব নেই পুলিশের কাছে।
গত ৭ জুলাই রাতে এই ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে ঘটনাস্থলে পুনর্নির্মাণ করতে নিয়ে আসা হলে ‘এনকাউন্টারে’ তার মৃত্যু হয় বলে দাবি পুলিশের। রহস্যজনক এই ‘এনকাউন্টারের’ ঘটনায় বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে, তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। কোন পরিস্থিতিতে সেদিন রাতে পুলিশ প্রভাস মণ্ডলকে গুলি চালিয়েছিল, তারও তদন্ত করছেন সিআইডি আধিকারিকরা। কোন পথে নাবালিকাকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছিল এখানে, সেখান থেকে কোথায় নিয়ে গিয়ে পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছিল তার পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছিল বলে দাবি জেলা পুলিশের। জেলা পুলিশের দাবি অনুযায়ী, পুনর্নির্মাণ করার সময়েই পুলিশকর্মী রনি সরকারের কোমর থেকে রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে জলাজমি ধরে পালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্ত প্রভাস মন্ডল। পালানোর সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি চালায়। পালটা নিজেদের রক্ষায় সার্ভিস রিভলভার দিয়ে প্রভাসকে লক্ষ্য করে গুলি চালান বারুইপুর থানার পিসি ইনচার্জ অর্ঘ মণ্ডল। দু’টি গুলির একটি লাগে প্রভাসের ডান দিনের বুকের একটু নিচে, আরেকটি কোমরের একটু ওপরে। তারপরেই প্রভাসকে তুলে নিয়ে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। পুলিশের দাবি, ‘‘আত্মরক্ষায় গুলি চালাতে হয়েছে!’’ সেই মর্মেই পুলিশ রিপোর্ট দেয়।
এই বিতর্কিত ‘এনকাউন্টার’ নিয়েই হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন আইনজীবী শিলাদিত্য রক্ষিত। মামলাকারীর পক্ষে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এদিন প্রশ্ন তোলেন, গভীর রাতে কেন অভিযুক্তকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? আর এমন মারাত্মক অভিযুক্তকে নিয়ে যাওয়ার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার বন্দোবস্ত ছিল না কেন? ঘটনার পুনর্নির্মাণের কোন ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়েছিল কি? তিনি বলেন, আইনত এই ভিডিও রেকর্ডিং পুলিশের কাছে থাকার কথা। কিন্তু এনকাউন্টারের কথা পুলিশ এমনভাবে জনমানসে এনেছে তাতে বিভ্রান্তি রয়েছে। নিহত প্রভাস মণ্ডলকে এই মামলায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসাবে প্রয়োজন ছিল।
রাজ্যের আইনজীবী রাজদীপ মজুমদার পুলিশি পদক্ষেপকে সঠিক বলে আদালতে দাবি করেন। তিনি জানান, অভিযুক্ত নিজ মুখে অপরাধের কথা স্বীকার করায় তাঁকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণে যাওয়া হয়েছিল। সে সময় প্রভাস গুলি চালালে বাধ্য হয়েই আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়। তাতেই প্রভাসের মৃত্যু হয়। সরকারি আইনজীবীর এই যুক্তি পুরোপুরি মেনে না নিয়ে হাইকোর্টের ডিভিসন বেঞ্চ পুলিশকে হলফনামা পেশের নির্দেশ দিয়েছে। ১৮ আগস্টের শুনানিতে জেলা পুলিশ সুপারের পেশ করা রিপোর্টের ভিত্তিতে মামলার শুনানি হবে। মামলায় আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে সহায়তা করেন আইনজীবী উদয়শঙ্কর চ্যাটার্জি, সুদীপ্ত দাশগুপ্ত।
Baruipur encounter High Court
বারুইপুরের ‘এনকাউন্টার’ রিপোর্ট তলব হাইকোর্টের
×
Comments :0