সুদীপ্ত বসু : কালীগঞ্জ
বিচারাধীন’ ভূখণ্ডে রক্তে ভেজা দশ বছরের কন্যার নিথর দেহ ছুঁয়ে থাকা জননীর গলায় লাল উত্তরীয়, চোখে মুখে দৃঢ়তা।
তামান্নার নৃশংস হত্যার বিচার এখনও ‘বিচারাধীন’।
‘বিচারাধীন’ ছিলেন মোসনেমা বিবিও, সঙ্গে তাঁর দুই কন্যা, স্বামীও।
শনিবার রাত থেকে তাঁরা ‘ডিলিটেড’। তামান্নার জন্মভূমি দেখছে একই গ্রামে ৪৪৪ জন ‘বিচারাধীন’ ছিলেন এক রাত আগেও। এখন ভোটার তালিকা থেকে ৪২৮জন বেবাক ‘ডিলিটেড’!
মোসনেমা বিবি হাত ধরেছেন শহীদ জননী সাবিনা ইয়াসমিনের। ‘‘তামান্না তো আমাদেরও মেয়ে। ওকে যারা মেরেছে তাদের ক্ষমা করবো না, আর আমাদের যারা ডিলিট করল তাদের বিরুদ্ধেও একসঙ্গে লড়ব।’’ শুধু এই বিধানসভাতেই ১৬ হাজার মানুষ বিচারাধীন, যাদের সিংহভাগ ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা থেকে ‘ডিলিটেড’!
এই বাংলায় ভোট-যুদ্ধের এক অনিবার্য বাস্তবতার চিহ্ন আঁকা প্রত্যন্ত এই প্রান্তর অনেক অমীমাংসিত জবাবের সন্ধান দিয়েছে। সিপিআই(এম)’র নির্বাচনী প্রচার ঠিক কেমন হয়, কি বলতে বলতে মানুষজনের দুয়ারে পৌঁছচ্ছে প্রার্থী, গ্রামবাসীদের আকাঙ্খা কি প্রার্থীর কাছে, এমন অনেক চিরকালীন প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠতে পারে রবিবারের সকালে কালীগঞ্জের গোবরা পঞ্চায়েতের নসিপুর, কাদিহাটার মতো একের পর এক গ্রামীণ জনপদ।
ভোর পাঁচটায় উঠে চাট্টি ভাত ফুটিয়ে নেওয়া। তারপর শহীদ তামান্না খাতুনের বাবা হোসেন শেখ আর মা সিপিআই(এম) প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন বেরিয়ে পড়ছেন লাল পতাকা হাতে নিয়ে। সঙ্গে সিপিআই(এম) নেতা-কর্মীরা। গ্রামের পর গ্রাম। সকাল থেকে রাত। ‘‘মেয়ের মুখটা সারাক্ষণ চোখে ভাসে। কিন্তু সকাল থেকে রাত এত মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের কথা শোনা; আমি জানি তামান্না থাকলে ও খুশি হত, ওঁর মা গরিব মানুষের জন্য লড়ছে।’’ প্রচারের ফাঁকেই বলছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন।
নসিপুর গ্রামে সকালে পৌঁছতেই দেখা গেল, ‘তামান্নার মা’র সঙ্গে দেখা করতে ঘরে থেকে বেরিয়ে আসছেন মহিলারা, কারো চোখে জল, কেউবা জড়িয়ে ধরছেন।
— আমি তামান্নার মা। আমার মেয়েকে ওরা (তৃণমূল) খুন করেছে; কোনও বিচার হয়নি। ওইটুকু মেয়েকেও ওরা ছাড়েনি। ওদের শাস্তি দিন ভোটের বাক্সে।
নসিপুর গ্রামের বাসিন্দা রেজিনি বিবি— তামান্নার কথা তো আমরা সবাই শুনেছি। কি বলব বলুন। আপনি সাহস করে লড়ছেন, ভালো তো। তবে জানেন ওরা বলেছেন ওদের ভোট না দিলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বন্ধ হয়ে যাবে।
— কে বন্ধ করবে? এসব মিথ্যা কথা। লাল ঝান্ডা সরকারে এলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকার বরাদ্দ বাড়বে, টাকা লুট হবে না। আর টাকা কি মুখ্যমন্ত্রী নিজের ঘর থেকে দিচ্ছেন? ওটা জনগণেরই টাকা। ভোট আপনি তৃণমূলকেও দিতে পারেন, কোনও ভয়ে বা মিথ্যা কথা শুনে ভোট দেবেন না।
— হ্যাঁ, ঠিকই।
—আর শুনুন আমি শুধু তামান্নার কথা বলে ভোট চাইছি না। এই রাজ্যটাকে বাঁচাতে হলে ভোটটা দিন লাল ঝান্ডায়, ঘরের ছেলেমেয়েগুলো মাথা উঁচু করে কাজ করতে চায়, ওদের জন্য ভোটটা দিন লাল ঝান্ডাকে। ভাতায় জীবন চলে না। কাজ চাই, ঘরের পুরুষরা সব বাইরে।
এই কথোপকথন শুধু নসিপুরের রেজিনা বিবির সঙ্গে নয়, গ্রামের ঘরে ঘরে মানুষজন আসছেন বেরিয়ে। সাবলীলভাবে মানুষের কাছে লাল ঝান্ডার জন্য, ন্যায়বিচারের জন্য ভোট চাইছেন শহীদ জননী। নসিপুরের গ্রামেরই প্রৌঢ়া বদন বিবি বলছিলেন, চাষবাস করে আমাদের সংসার চলে। গরিব মানুষের বাস এখানে। ছেলেদু’টো পড়াশুনো করে মিস্ত্রির কাজ করে। বাইরে কাজে পাঠাতেও ভয় হয় এখন। শুধু বেকার ভাতা দিল আর সব মিটে গেল? ওরা জানে টাকা বিলোলেই সব হবে!
সাবিনা ইয়াসমিন তখন ছুটছেন ঘরে ঘরে। আকুন্ঠ বেওয়া তাঁকে ঘিরে দাঁড়ালেন। ‘‘তোর মেয়ের কথা শুনেছি। তুই জেত, তা হলে সব মায়েরা জিতবে।’’
নসিপুরেই ভরদুপুরে সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে দেখা করতে এলেন গ্রামের ২৫৮ নম্বর বুথের মোসনেমা বিবি। সঙ্গে দুই কন্যা। বললেন, ‘‘স্বামী থাকে কাটিহারে, ওখানে ভোটার লিস্টে ছিল জাহাঙ্গীর নাম। ওখানে এসআইআরে নাম বাদ যায়। এখানেও বাদ যায়, কারণ এখানে নাম ছিল জাহাঙ্গীর শেখ। অথচ আমার নাম আছে, বাবার নামের সঙ্গে লিঙ্ক করে। কিন্তু দুই মেয়ের নাম নেই। গত তিনটা ভোটেও ওরা তো ভোট দিয়েছিল।’’ এখানকার বিএলও ভোলন শেখের কথায়, ‘‘আমি তো সব ডকুমেন্ট জমা দিলাম, এখন দেখছি নাম বাদ। ট্রাইবুনালে আবার চেষ্টা করব।’’ এরপর জানালেন, তাঁরই জামাইবাবু ২৪৬ নম্বর বুথের বিএলও, প্রাইমারি শিক্ষক হবিবউদ্দিনের নামও বাদ চলে গেছে বিচারাধীন তালিকায়! বিএলও’র নামই ডিলিট!
পাশের গ্রামে কাদিহাটিতে ২৬২ নম্বর বুথে ৭২ জনের নাম ছিল ‘বিচারাধীন’ তালিকায়, এখন প্রকাশিত তালিকায় দেখা যাচ্ছে ৩৫জনের নাম বাদ! মসিতুল্লা শেখ, ৬৫ বছর বয়স। ‘‘সেই কবে থেকে ভোট দিচ্ছি, কাস্তে হাতুড়িতেই ভোট দি। ২০০২’র তালিকাতেও ছিল নাম, এখন ডিলিট!’’
শুধু এখানেই নয় কালীগঞ্জের পানিঘাটা পঞ্চায়েতের মির্জাপুর মধ্যমপাড়ায় বিচারাধীন তালিকায় ছিল ৩১৯ জনের নাম। প্রকাশিত অতিরিক্ত তালিকায় ২২জন (পুরুষ ১৭, মহিলা ৫)’র নাম কেবল রয়েছে, ২৯৭জনের নাম বাদ একটা বুথ থেকে! সংখ্যালঘু প্রধান এলাকা। এদিন দুপুরে রবিউল ইসলাম বলছিলেন, আমার নাম নেই অথচ স্ত্রী, বাবা-মায়ের নাম আছে। আবার সাহারুল শেখের বাড়ির তিনজনের নামই বাদ গেছে। পাশের রায়পুর গ্রামে বিচারাধীন তালিকায় ছিল ৪৪৪জনের নাম। এখন দেখা যাচ্ছে মাত্র ১৬ জন ‘পাস’ করেছে, মানে তালিকায় আছে, বাকি ৪২৮জন বাদ! পাশের জামালপুর এলাকায় মাত্র দু’জনের নাম বিচারাধীন তালিকা থেকে বাদ গেছে। নাম- জুয়ারেজ মুন্সি, রাজা মুন্সি! ট্রাইবুনালে কোথায় যেতে হবে জানেন না তাঁরা। কিভাবে আবেদন করবেন জানেন না। সিপিআই(এম) পাশে থাকবে সবরকমভাবে, শুনেছেন তা।
সাবিনা ইয়াসমিন প্রচারেরই বলছিলেন, ভাগাভাগির রাজনীতি চলছে। গরিব মানুষগুলো হেনস্তার মুখে পড়ছে, বাঁচাতে হবে আমাদের। লালঝান্ডা ওদের জন্যই লড়ছে।
সাবিনা ইয়াসমিনের বিপক্ষে তৃণমূলের আলিফা আহমেদ। গত বছরের জুনে উপনির্বাচনে তাঁর জয়ের উল্লাসে উন্মত্ত তৃণমূলী বাহিনীর ছোঁড়া বোমায় খুন হওয়া নাবালিকা তামান্নার বাড়িতে গত দশ মাসেও একবার যেতে পারেননি তিনি। তামান্নার খুনে অভিযুক্ত ২৪ জনের মধ্যে ১৪ জন এখনও অধরা। তারাই শাসক তৃণমূলের ভোট লুটের হাতিয়ার। আর বিজেপি? এখনও পর্যন্ত ‘রাজনৈতিক প্রচার’ বলতে এলাকায় এলাকায় গীতাপাঠের আয়োজন চলছে। প্রায়ই আসছেন সেই কার্তিক মহারাজও।
আর অন্যদিকে ব্যারিকেডের এ’প্রান্তে শহীদের জননী- কাজের কথা, আর্সেনিকমুক্ত জল সরবরাহ, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রাইমারি স্কুল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলার কথা বলছেন। তামান্নার জন্য সব মায়েদের কাছে আরজি জানাচ্ছেন।
১২০ বছর আগে ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাসে পাভেলের মায়ের উচ্চারণ ফিরছে আজকের বাংলায়, কালীগঞ্জেও- ‘‘রক্তে ওরা যুক্তিকে ডুবিয়ে দিতে পারবে না, সত্যের শিখাকে নিভিয়ে দিতে পারবে না তারা।’’
In Kaliganj Assembly 16,000 people under trial
লাল ঝান্ডাই পথ, ‘বিচারাধীন’ জনপদে অতন্দ্র শহীদ-জননী
ক্যাপশন: রবিবার কালীগঞ্জে প্রচারে বামফ্রন্টের সিপিআই(এম) প্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন। ছবি : বিজন কুমার বিশ্বাস
×
Comments :0