নতুনপাতা
গল্প
নতুন বন্ধু
সৌরীশ মিশ্র
২২ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
"বাবা, ওঠো, ওঠো না!"
বেশ ঘুমোচ্ছিলাম। মেয়ের ডাকাডাকিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।
কাল বেশ রাত অবধি লিখেছি। পুজোসংখ্যার সব কাজ চলছে এখন। পুজো তো এসেই গেল বলতে গেলে।
"কি হলো, উঠলে না!" ফের আমাকে দু'হাতে ঠেলা দিয়ে বলল কুঁড়ি।
চোখ খুললাম। ঘুম জড়ানো গলায় বললাম, "কি হয়েছে কি? ডাকছিস কেন?"
"ওঠো না, ওরা তো চলে যাবে! ওঠো না, ওঠো না।" বলে চলে মেয়ে।
"কারা চলে যাবে?" আর যে এখন ঘুম হবে না সেটা বেশ বুঝতে পেরে বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললাম আমি।
"আমার নতুন বন্ধুরা।" বলল কুঁড়ি।
"তারা আবার কে?" শুধোই।
"চলো না বারান্দায়, দেখতে পাবে। আঃ, এখনও বসে আছো। চলো না তাড়াতাড়ি, চলো না।" বলতে বলতেই আমার হাত ধরে টানাটানিই শুরু করে দিল মেয়ে।
বুঝতে পারলাম, ওর সাথে বারান্দায় না গিয়ে ছাড় নেই আমার। বিছানা থেকে নামতে নামতে বললাম, "চল্।"
বারান্দাতে এলাম দু'জনে। এটা আমাদের দোতলার ব্যালকনি। টিপ্ টিপ্ করে বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। কাল যখন মাঝরাতে ঘুমোতে যাই তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছিল। ছোটোবেলা থেকেই বৃষ্টি দেখতে বেশ লাগে আমার। শোওয়ার আগে কাল কিছুক্ষণ এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই বৃষ্টি দেখে তবে শুতে গেছিলাম।
যাই হোক। মেয়ের দিকে তাকালাম। দেখলাম, ওর চোখ দুটো কি যেন খুঁজছে! একবার এইদিকে দেখছে ও, পর মুহূর্তেই আবার অপর দিকে। কয়েকক্ষণ এইরকম চলার পর রাগ-রাগ গলায় বলে উঠল কুঁড়ি আমার দিকে তাকিয়ে, "বললাম, তাড়াতাড়ি চলো, তাড়াতাড়ি চলো। এত্তো দেরী করলে না! দেখলে তো চলে গেছে। অতক্ষণ থাকে ওরা! ওদের কি কাজ নেই!"
"যা: বাবা, আমি আবার কি করলাম! তুই একবার ডাকতেই তো উঠে পড়লাম।" মেয়েকে বলি আমি।
"একবার! কতোক্ষণ ধরে ডাকার পর তারপর উঠলে। তাও ঠেলা দিয়ে ডাকলাম তারপর। আমি তো এমনি করেই ডাকছিলাম। মা দেখে বলল, ওর'মে হবে না। তুই ঠেলা দিয়ে দিয়ে ডাক! তোর বাবার যা ঘুম, বাব্বা!"
মনে মনে খুব রাগ হোলো কেয়ার উপর। আমার ঘুম যেমনই হোক সেটা আমার ঘুম। ওর কি!
এইদিকে মেয়ে আমার, একটুখানিক চুপ করে থেকে ফের আরেক চোট আমাকে বকতে যাচ্ছিল, তখনই আমাদের দু'জনেরই সামনে দিয়ে কোথা থেকে যেন একটা পাখি উড়ে এসে বসল ব্যালকনিটার রেলিংটায়। আর ঐ পাখিটা রেলিং-এ থিতু হতে না হতেই আরো একটি পাখিও এসে বসল প্রথম পাখিটার পাশটায় রেলিংটার উপর। আর ঐ দেখেই আমার মেয়ে আমায় "এসে গেছে, এসে গেছে বাবা। ওদের দেখাতেই নিয়ে এলাম তোমায়।" বলে উঠল।
আমাদের থেকে হাত পাঁচেক দূরে বসে এখন পাখিদুটো। বুলবুলি পাখির জোড়া। একটা ব্যাপার বেশ অবাক করলো আমায়। পাখি দুটো আমাদের দেখেও উড়ে যাচ্ছে না। দূর থেকে আগে বহুবার দেখেছি বুলবুলি পাখি, কিন্তু, এতো কাছ থেকে দেখিনি কখনো। মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, "এরাই তোর নতুন বন্ধু?"
"হ্যাঁ তো। দেখবে বাবা, ওরা কেমন আমায় চেনে?" বলতে বলতেই কুঁড়ি ওর পরনের পাজামার পকেট থেকে বের করলো একটা অর্ধেক বিস্কুট। সেটা তারপর ছোটো ছোটো কয়েকটা টুকরো করে ব্যালকনিটার মেঝেতে রাখলো সে। আর সত্যিই বিস্মিত করার মতোই কাণ্ড, আমার মেয়ে তখনও সড়ে আসেনি, বিস্কুটের টুকরোগুলো রাখছে তখনো সে, দুটো বুলবুলিই রেলিং থেকে উড়ে এসে নামলো ব্যালকনির মেঝেতে আর খেতে শুরু করে দিল ওরা বিস্কুটের টুকরোগুলো!
বুঝতে পারলাম, আমার মেয়েকে ভালোই চেনে পাখিদুটো। এবং তা, ওদের নিয়মিত খাওয়ার দেওয়ার সূত্রেই যে তাও বুঝতে অসুবিধা হোলো না। মনে মনে ভাবি, কে ভালোবাসে তা বোঝার ক্ষমতা সবার মধ্যেই আছে, তা মানুষই হোক বা পশু কিংবা পাখি।
এক হাত দূরত্বের মধ্যেই ওর, পাখিদুটো, তবু দেখলাম কুঁড়ি বিরক্ত করলো না ওদের। বরং বিস্কুটের টুকরোগুলো দিয়েই ধীর পায়ে চলে এলো ওখান থেকে। এসে দাঁড়াল আমার পাশটায়।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "কি সুন্দর খাচ্ছে, না বাবা?"
আমি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বুলবুলিদুটোর খাওয়া দেখতে দেখতে বললাম, "হ্যাঁরে।"
Comments :0