জয়ন্ত সাহা: কোচবিহার
কাজের কথা নেই। বন্ধ চা বাগান খোলার কথা নেই। শিল্প, কারখানার কথাও নেই। বিধানসভা নির্বাচন ঘোষিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রথম নির্বাচনী জনসভায় রাজ্যবাসীর জন্য বার্তা একটিই— যত দোষ শুধু ঘুষপেটের, অর্থাৎ অনুপ্রবেশের। বিজেপি রাজ্যে সরকার গড়লে অনুপ্রবেশ বন্ধ হবে।
এদিন রাসমেলার মাঠে রীতিমতো ভয় দেখিয়েছেন মোদী। দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অনুপ্রবেশের জন্য বাংলার ডেমোগ্রাফি (জনসংখ্যার বিন্যাস) বদলে যাচ্ছে। নিজের দেশে স্বাধীনতা হারানোর ভয় আছে।
যদিও ২০১১-র জন সমীক্ষা এমন তথ্য দেয়নি। আর মোদী সরকার সময়মতো নতুন জনগণনা করায়নি। তার রিপোর্টও নেই। তবে তাঁরই সরকার জানাচ্ছে, চীন ছাড়া দেশের আর প্রতিটি আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়ে তাঁর শাসনে অনুপ্রবেশ হয়েছে, হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী হয়ে, সারদা, নারদ স্টিং অপারেশন সহ কোন দুর্নীতির তদন্ত শেষ হয়নি। কারো শাস্তি হয়নি। উলটে শুভেন্দু অধিকারী, মুকুল রায় সহ নানা দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের বিজেপি দলে নিয়েছে। রবিবার কোচবিহারে সেই প্রধানমন্ত্রী বললেন, রাজ্যে বিজেপির সরকার হলে সব দুর্নীতিগ্রস্তদের টাকা উদ্ধার করা হবে। ছাড়া হবে না কাউকে।
রবিবার তিনি ৪০ মিনিট বক্তব্য রাখলেন ঠিকই। কিন্তু উত্তরবঙ্গের চা- শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে মুখ খুললেন না। অথচ এই সভায় এসেছিলেন আলিপুরদুয়ার জেলার চা শ্রমিকেরাও। প্রধানমন্ত্রীর সভার শেষে বেরনোর সময় কালচিনি বাগানের শ্রমিক সূরজ ওরাওঁ তাঁর সঙ্গীদের বললেন, “প্রধানমন্ত্রী বহুত কুছ বোলা, লেকিন হাম লোগোকো বারে মে কুছু নেহি বোলা।এ ঠিক নেহি হুয়া।”
এর আগে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আলিপুরদুয়ারে নির্বাচনী সভা করতে এসে বন্ধ বাগান অধিগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিলেও কোন বাগান নতুন করে অধিগ্রহণ হয়নি। উলটে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিগৃহীত চার বাগানের পিএফ বকেয়া রয়েছে প্রায় দশ কোটি টাকা!
এদিন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে শুধু চা-বাগান শ্রমিকদের কথাই নয়, একটি শব্দও ছিল না শিল্প, কাজ নিয়ে। উত্তরবঙ্গের পর্যটন নিয়েও তিনি কিছুই বলেননি।
পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত মাদারিহাটের পর্যটন ব্যবসায়ী সমীর সাহা বলেন,”ওনাকে হয়তো ওনার দলের কেউ বলে দেয়নি উত্তরবঙ্গে পর্যটনের বিরাট সম্ভবনা রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে পর্যটন উহ্যই রয়ে গেল রবিবার।"
এদিন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য রেখে চলে যাবার পর অনেককেই বলতে শোনা যায়, মনীষী পঞ্চানন বর্মার জন্মভিটেকে ঘিরে ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের আগে রাসমেলার মাঠে এসেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ যে ট্যুরিজিম সার্কিট গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার কি হল? এদিন প্রধানমন্ত্রী তার পুরো বক্তব্যের কোথায় কেন কোচবিহারের স্পোর্টস হাব কেন গড়া হল না সে বিষয়েও নীরব ছিলেন। অথচ ২০২২ সালের ২১ শে মে নিউ কোচবিহারে রেলের ২৫ একর জমিতে ২৫০ কোটি টাকায় স্পোর্টস হাবের শিলান্যাস করেছিলেন তৎকালীন ক্রীড়া দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। ২০২৪ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও সীমানা প্রাচীর ছাড়া আর কোন কাজই হয়নি।
আসলে এদিন বিজেপির কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারের প্রার্থীর হয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রচারে এলেও দুই জেলার উন্নয়নের কোন সদর্থক বক্তব্যই রাখেননি। বক্তব্যের শুরুতেই মাঠ থেকে দলে দলে কর্মী সমর্থকদের বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এমনকি মঞ্চের একেবারে সামনের ভিআইপি চেয়ারে যারা বসেছিলেন সেই আসনও ফাঁকা হতে থাকে। এদিকে কোচবিহার নাটাবাড়ি কেন্দ্রের বিধায়ক মিহির গোস্বামী এবারে টিকিট পাননি। ওই আসনে প্রার্থী হয়েছে গ্রেটারের বংশীবদনের অনুগামী। এদিন মিহির গোস্বামীও আসেননি প্রধানমন্ত্রীর জনসভা মঞ্চে। এদিন দলের আমন্ত্রণ না পেয়ে সভায় থাকেননি বিধানসভায় বিজেপির দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
Comments :0