মঙ্গলবার তিলজলায় একটি কারখানায় আগুন লেগে মৃত্যু হয়েছে দুজনের। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও তিনজন। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। তিলজলার চামড়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল রাজ্য সরকার। বুধবার সকালে সেই কমিটি রিপোর্ট জমা করে। মুখ্যমন্ত্রী এদিন জানান ওই কারখানার মালিক সহ দু’জন গ্রেপ্তার হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, টালিখোলা মসজিদের কাছে যে চারতলা বিল্ডিংয়ের দোতলায় আগুন লেগেছিল, সেই কারখানাটি ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ। বহুতলটির কোনও অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান ছিল না এবং বিপদের মোকাবিলায় কোনও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হয়নি। গাফিলতির জেরে মঙ্গলবার আগুন লাগে। দু’জনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে আরও তিন জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন, যাঁদের মধ্যে দু’জনকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। এদিন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এক ঘন্টার মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় পুলিশ, পুরসভা ও কেএমডি-এর আধিকারিকরা। সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীও পৌঁছয়। বিল্ডিং ভাঙতে নিয়ে যাওয়া হয় তিনটি জেসিবি। ওই চত্বর ঘিরে রাখা হয় ব্যারিকেড দিয়ে। ঘটনাকে ঘিরে সেখানে ভিড় জমে স্থানীয়দের। মুখ্যমন্ত্রী এদিন জানিয়েছেন, চিহ্নিত অবৈধ কারখানা ও কাঠামোগুলি এক দিনের মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। তিনি জানান, যে কারখানায় আগুন লেগেছিল সেটি বেআইনি। কারখানাটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন।
২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে ‘বুলডোজার-ন্যায়’ চালু করা হয়। কোনও ব্যক্তিকে অপরাধী মনে করলেই বিজেপি সরকার বুলডোজার দিয়ে বাড়ি-ঘর, দোকান, হোটেল বা অন্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বুলডোজার কার্যত বিজেপি’র প্রতীকে পরিণত হয়েছে। গোদী মিডিয়া যোগীকে ‘বুলডোজার বাবা’ আখ্যা দিয়েছে। নির্বাচনী সমাবেশগুলিতে বিজেপি নেতা-কর্মীরা বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র জয়ের সঙ্গেই বাংলায় রমরমিয়ে চলে আসে বুলডোজার রাজনীতি। ভোটপ্রচারের সময়েই বুলডোজার আমদানি করা হয়। বিজেপি কর্মীরা বুলডোজার চেপে সভায় এসেছিলেন। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ সমাবেশ করতে এলে। ভোটের ফলপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের নানাপ্রান্তে বুলডোজার নিয়ে আসা হয়। উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের সরকার এই নীতির পথিকৃৎ হয়ে উঠলেও পরে একাধিক বিজেপি-শাসিত রাজ্যে তা অনুসরণ করা হয়। এরপরে তা বিজেপি শাসিত মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে শুরু করে দেওয়া হয়। এবার পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয়ে গেল বুলডোজার সংস্কৃতি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, অভিযুক্তদের শাস্তি না দিয়েই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে বুলডোজার চালানো হচ্ছে সম্পত্তির উপর, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী। বুলডোজার নয়, আগে চাই আইন ও সংবিধান মেনে কাজ।
গত চার মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়। "বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে বাংলার মানুষ। বিজেপি রাজ্যে নতুন সরকার তৈরি করেছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর থেকেই বিজেপি তাদের ক্ষমতা জাহির করতে নেমে পড়ে। বুলডোজার নিয়ে একাধিক জায়গায় বিজয় মিছিল করে। বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয় নিউ মার্কেটের কিছু অস্থায়ী হকারদের ডালাও। তারপরই এসপ্ল্যানেড, বড়বাজার অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় গরিব হকারদের ওপর আরএসএস বিজেপির দুষ্কৃতি বাহিনী আক্রমণ চালিয়েছে। বুলডোজার নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় হকারদের ভয় দেখানো হয় তাদের ডালা ভাঙা হয়। যদিও তিলজলার ঘটনায় ভেঙে দেওয়া বহুতলের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বৈধ কাগজ থাকলেও ভেঙে দেওয়া হয়েছে নির্মাণ। তাঁদের আরও দাবি, 'আমাদের জিনিস সরানোরও সময় দেওয়া হয়নি'। বিজেপি রাজত্বে বুলডোজার সংস্কৃতিকে এখন একটি সাধারণ বিষয় করে দেওয়া হয়েছে। বিনা বাক্যে বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় বাড়িঘর। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষজনের বাড়ি পরপর ভাঙা হয়েছে নানা অজুহাতে। সুপ্রিম কোর্ট, বম্বে হাইকোর্ট এর বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া দিলেও থামানো হয়নি বুলডোজারের চাকা।
Kolkata's Tiljala Sees Bulldozer
তিলজলায় কারখানা ভাঙতে জেসিবি, ‘বুলডোজার ন্যায়’ চালু?
×
Comments :0