বিশ্বজিৎ দাস, গুয়াহাটি
তিন ধর্মগুরুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে মণিপুর। এই ঘটনায় অশান্তির আগুনে ঘি ঢালার মতো বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার সকালে কাঙপকপি জেলায় খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের গাড়িতে দুষ্কৃতীরা হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন। জখম হয়েছেন ছয়জন। নিহতরা হলেন ভুমথাঙ সিতলাউ, কাইগাউলেন ও পাওগাউলেন। হতাহতরা সকলেই ব্যাপ্টিস্ট অ্যা সোসিয়েশনের কুকি গোষ্ঠীর নেতা। রাজ্যের চুরাচাঁদপুর জেলায় গির্জা সংক্রান্ত একটি সভায় বৈঠক শেষে ফেরার পথে কাঙপকপি জেলার কোটলেন-কোটজিম সড়কের মধ্যবর্তী এলাকায় তাদের উপর অতর্কিত হামলা চালায় অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা। ধর্মগুরুরা দুটি গাড়িতে করে ফিরছিলেন। প্রথমে দুই গাড়ি চালকের গায়ে গুলি লাগে। এতে গাড়ির চালক টাল সামলাতে না পারায় গাড়ি দুটি রাস্তার ধারে পড়ে যায়। এরপর একেবারে কাছ থেকে তিনজনকে গুলি করে পালিয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। এই ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, নিহত ভুমথাঙ সিতলাউ মণিপুর ব্যাপ্টিস্ট কনভেনশনের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক। তিনি উত্তরপূর্বের প্রভাবশালী খ্রিস্টান ধর্মগুরু হিসাবে পরিচিত। তাঁকে শান্তির দূতও বলা হয়। রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর উদ্দেশ্যে খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজ্যে টাঙকুল নাগা ও কুকিদের মধ্যে যে সংঘর্ষ চলছে,তা সমাধান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন সিতলাউ। তাঁর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। সন্দেহ করা হচ্ছে, নাগা ও কুকিদের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে সিতলাউ যে ভূমিকা পালন করছেন, তা বিভেদকামী শক্তির পছন্দ হয়নি। তাই তাঁকে হত্যা করেছে। এই ঘটনার পেছনে নাগা উগ্রপন্থী সংগঠন জেলিয়াঙরঙ ইউনাইটেড ফ্রন্ট জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও এই সংগঠনের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে তাঁরা এই ঘটনায় জড়িত নয় বলে জানিয়েছে। আরেক নাগা উগ্রপন্থী সংগঠন এনএসসিএন(আইএম) ও মেইতেই উগ্রপন্থী সংগঠন আরামবাই টেঙলের বিরুদ্ধেও আঙুল উঠেছে। তাঁরাও অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হামলার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের পাঠানো হয়। জখম চার ধর্মগুরু ও দুই চালককে উদ্ধার করে ইম্ফলের সিজা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের কাঙপকপি জেলা হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। জখমদের দেখতে বিকেলে সিজা হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী ইয়ামনাম খেমচাঁদ। পরে তিনি সামাজিক মাধ্যমে বর্বরোচিত হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, রাজ্যে রাজ্যে ধীরে ধীরে যখন শান্তি ফিরে আসছে,তখন ফের রাজ্যকে অশান্ত করতে ধর্মগুরুদের হত্যা করা হয়েছে। তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। ঘটনায় জড়িতদের খোঁজে তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ। ফোনযোগে ঘটনার বিস্তারিত জেনেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রী সবগোষ্ঠীকে প্রতি শান্তির আবেদন জানিয়েছেন।
এদিকে, খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী। ঘটনায় জড়িতদের শীঘ্রই গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। মণিপুরের বিভিন্ন খ্রিস্টান সংগঠন প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। হামলার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় কাঙপকপি জেলায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েছেন। গোটা জেলায় অঘোষিত কারফিউর মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে। টানাটানা উত্তেজনা চলছে। কুকি ইনপি চুরাচাঁদপুর জেলায় বুধবার মধ্যরাত থেকে বন্ধের ডাক দিয়েছে। নাগাল্যান্ড,মিজোরাম ও মেঘালয়ের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন।
উল্লেখ্য, তিন বছরের বেশি সময় ধরে জাতিদাঙ্গা চলছে মণিপুরে। এই সময়কালে প্রায় সাড়ে তিনশো গির্জা জ্বালিয়ে দিয়েছে উগ্র মেইতেই সংগঠনগুলি। এবার খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের হত্যা করা হলো। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজ্যে নতুন করে দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
Manipur
অতর্কিত হামলা, মণিপুরে গুলিতে ঝাঁঝরা তিন খ্রিস্টান ধর্মগুরু
×
Comments :0