STORY — SOURISH MISHRA — MALPOYA — NATUNPATA — 25 APRIL 2026

গল্প — সৌরীশ মিশ্র — মালপোয়া — নতুনপাতা — ২৫ এপ্রিল ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

STORY  SOURISH MISHRA  MALPOYA  NATUNPATA  25 APRIL 2026

গল্প  


 নতুনপাতা

  --------------
   মালপোয়া
  --------------

সৌরীশ মিশ্র

"রণ, নীচে চলে আয়। ঝড় উঠছে। ও, ছাদের দরজাটা বন্ধ করে আসিস।"
রণ মানে রণিক ছিল ওদের এই একতলা বাড়ির চিলেকোঠার ঘরে। রণ-র মায়ের রণ-র উদ্দেশে বলা এই কথাকটা ভেসে এল নীচতলা থেকে।
"আসছি, মা।" চেঁচিয়ে বলল রণ, যাতে শুনতে পায় মা। 
সে ড্রইং করছিল ওর আঁকার খাতায় মেঝেয় মাদুর পেতে বসে। খাতাটা চটপট ভাঁজ করে আর স্কেচপেনগুলো জড়ো করে মাদুরের একপাশে রেখে, উঠে পড়ল সে। 
রণ-র এখন ক্লাস ফাইভ। তাই মর্নিং স্কুল ওর। এগারোটায় স্কুল ছুটি হয়। স্কুলবাসে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে হয়ে যায় সাড়ে বারোটার কাছাকাছি। তারপর স্নান করে দুপুরের খাবার খেয়ে ও সারা দুপুরটাই কাটায় এই চিলেকোঠাটাতেই। এই ঘরে নিজের একটা দুনিয়া তৈরি করে নিয়েছে সে। সেই জগতে তার নিজের মতোন করে সারাটা দুপুর কাটায় রণ।
আজ সকাল থেকেই একটু একটু করে মেঘ জমছিল আকাশে। আর গত এক ঘণ্টায় কালো কালো মেঘে ছেয়ে গেছে পুরো আকাশটাই। এটা কালবৈশাখীর সময়। গত সপ্তাহে দু'দিন পরপর হয়েছে ঝড়-বৃষ্টি এই অঞ্চলে। 
নীচ থেকে জানলা বন্ধ করার আওয়াজ পেল রণ। ঝড় উঠবে, তাই মা নীচের ঘরের জানলাগুলো যে বন্ধ করছে, বুঝতে পারে সে। ওদের এই বাড়িটা একতলা হলেও, অনেকটা জায়গা জুড়ে। অনেককটা ঘর। তাই জানলাও অনেক। রণ ভাবল তাই, তাড়াতাড়ি নীচে যাওয়া দরকার ওর। ও যদি কয়েকটা জানলাও বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলেও মাকে একটু হলেও হেল্প করা হবে। তবে নীচে যাওয়ার আগে ছাদের দরজাটা বন্ধ করতে হবে। তাই, চিলেকোঠার ঘরটা থেকে ছাদের দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। দরজাটার ব্যাং লাগানো। সেটা খুলল রণ। মাঝেসাঝেই দমকা হাওয়া দিচ্ছে জোড়। সে দরজার পাল্লাটা জোর করে টেনে আনতে যাবে, তখনই ওর চোখে পড়ল দৃশ্যটা। ও দেখতে পেল, একটা সাদা রঙের শাড়ি উড়ে যাচ্ছে হাওয়ায় ওদের ঠিক ছাদের উপর দিয়ে। সে ঝটপট উঁকি মেরে দেখল, ওদের ঠিক পাশের বাড়ির ছন্দা ঠাম্মি ওনাদের বাড়ির দোতলার ছাদের প্যারাপিট্ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন শাড়িটার দিকে। রণ বয়সে ছোটো হলে কি হবে, খুবই ইন্টেলিজেন্ট সে। প্রতিটা ক্লাসে ওঠার পরীক্ষায় সে ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয়নি এখনো কখনো। সে ইতিমধ্যেই বুঝে গেছে, ঐ শাড়িটা যে ছন্দা ঠাম্মিরই। কারণ ঐরকম শাড়িই ছন্দা ঠাম্মি পড়ে। আর শাড়িটা যে সম্ভবত ছাদে শুকোতে দেওয়া ছিল এতোক্ষণ আর এখন সেটা তুলতে গিয়ে দমকা হাওয়ায় সেটা উড়ে এসেছে ওদের ছাদের দিকে, এটাও বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়না তার। সে তাই সাথে সাথেই ঠিক করে ফেলে, তার এই মুহূর্তে ঠিক কি করা কর্তব্য। সে তাই ছুটে ছাদে গিয়ে একটা ছোট্ট লাফ দিয়ে ধরে ফেলে উড়তে থাকা শাড়িটা।
"শাবাশ রণ, শাবাশ।" ছন্দা ঠাম্মি বলে ওঠেন চেঁচিয়ে।
মাথা উঁচু করে ছন্দা ঠাম্মির দিকে তাকায় রণ। মুখে তার ঝলমলানো হাসি। "এটা তোমারই শাড়ি তো ঠাম্মি?" শুধোয় সে।
"হ্যাঁ রে। আমি কাপড় তুলছিলাম। সবে ক্লিপগুলো খুলেছি ওটার। হঠাৎ জোড় একটা হাওয়ায় উড়ে গেল শাড়িটা। ভাগ্যিস তুই ছিলি। না হলে কোথায় গিয়ে পড়তো কে জানে! আর পাওয়াই যেতো না হয়তো..."
"আমি এক্ষুনি শাড়িটা দিয়ে আসছি গিয়ে তোমায় ঠাম্মি।" বলে রণ।
"ঠিক আছে আয়। আমিও যাচ্ছি নীচে।" বলেন রণ-র ছন্দা ঠাম্মি।
রণ এক ছুট লাগায় ফের। মুহূর্তের মধ্যে ছাদের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে, দরজাটা বন্ধ করে, দ্রুত পায়ে নামতে থাকে তারপর সিঁড়ি দিয়ে। 
ছন্দা দেবীও এখন তাঁর হাতে ধরা, ছাদ থেকে তোলা কাপড়গুলো সামলে ছাদের দরজার ছিটকিনি আটকাচ্ছেন আর মনে মনে ভাবছেন, রণ-কে কাল মালপোয়া করে দেবেন তিনি ক'টা বেশি করে। তাঁর হাতের মালপোয়া খেতে ভালোবাসে খুব ছেলেটা। মাঝেমধ্যেই তিনি করেও দেন ওকে তাই। তবে, কালকে যেটা করে দেবেন তিনি সেটা শুধুই রণ-র প্রতি স্নেহপরবশ হয়ে নয়, কৃতজ্ঞতাস্বরূপও। রণ যে কি উপকার করলো তাঁর আজ, তা তিনিই শুধু জানেন। এই শাড়িটার সঙ্গে যে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের একটি বড় মধুর স্মৃতি। শাড়িটা তাঁর বড় হৃদয়ের কাছের। তাঁর একমাত্র ছেলে ঝিলাম চাকরি পাওয়ার পর প্রথম মাসের স্যালারি পেয়ে এই শাড়িটাই উপহার দিয়েছিল তাঁকে। তাই এই শাড়িটা তাঁর কাছে বড্ড স্পেশাল। এরপরেও আরো অনেক কিছুই দিয়েছে ঝিলাম তাঁকে। অনেক দামী-দামী জিনিসও। তবুও, এখনও ঐ তাঁতের শাড়িটাই তাঁর কাছে সবচাইতে স্পেশাল হয়ে থেকে গেছে। যেকোনো প্রথমের ব্যাপারই আলাদা যে হয় সবসময়ই। এইসব ভাবছেন যখন ছন্দা দেবী, তখনই বেজে উঠল ওনার বাড়ির কলিংবেলটা। ছন্দা দেবী বুঝতে পারলেন রণ এসে গেছে। তাই তিনি যতটা সম্ভব দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকলেন এবার।

 


------------------------------------

Comments :0

Login to leave a comment