অরিজিৎ মণ্ডল: বক্রেশ্বর
কৃষির উন্নয়নের ভিত্তিতে গণতন্ত্রকে সম্প্রসারণকে হাতিয়ার করে শিল্পসম্ভাবনার রাস্তা খুলেছিল বামফ্রন্ট সরকার। তাকে ধ্বংস করার চক্রান্তে তৃণমূলের সঙ্গে শামিল ছিল বিজেপি-ও। সিঙ্গুরের তৈরি কারখানাকে তুলে পাঠানো হয়েছিল গুজরাটের সানন্দে।
শনিবার জননেতা জ্যোতি বসুর ১৭তম প্রয়ান দিবসে বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে সমাবেশে একথা বলেছেন ডিওয়াইএফআই এবং এসএফআই নেতৃবৃন্দ।
এদিনই ভোট প্রচারে এসে ‘আসলি পরিবর্তন’-র ডাক ফের দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপি’র শীর্ষনেতা নরেন্দ্র মোদী।
বক্রেশ্বরের ছাত্র-যুব সমাবেশ থেকে পালটা বলা হয়েছে, বামপন্থা ছাড়া পথ নেই। বামপন্থার পুনর্জাগরনেই শিল্প সম্ভাবনার পথ খুলবে রাজ্যে। বলা হয়েছে যে এই প্রধানমন্ত্রীই নীরব থাকেন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে বাংলার যুবদের ওপর আক্রমণের বেলায়।
বক্রেশ্বরে সমাবেশের প্রধান দাবি, বামফ্রন্ট সরকারের অন্যতম সাফল্য এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ষষ্ঠ ইউনিট খুলতে হবে। তার জন্য জায়গা রয়েছে। অপর গুরুত্বপূর্ণ দাবি, শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ করতে হবে। অস্থায়ী শ্রমিক দিয়ে কাজ চালানো যাবে না।
বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিকরাই জানিয়েছেন দিন তিনশো টাকার বিনিময়ে অন্তত আট ঘন্টা কাজ করতে হয়। সারা মাসে আট হাজার টাকাও বেতন হয় না অস্থায়ী কর্মীদের।
সারা দেশে বিজেপি ব্যাঙ্ক, বিমার মতো সরকারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে নিয়মিত স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ করেছে। ঠিকা এবং চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করে চলছে শোষণ। এরাজ্যে পুলিশ থেকে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সেই নীতিই নিয়ে চলেছে তৃণমূল সরকার। ছাত্র-যুবদের সমাবেশ শ্রমিকদের স্থায়ীকরণের জোরালো দাবি তুলেছে।
শনিবার মিছিল হয় কচুজোড় থেকে বক্রেশ্বরের মূল গেট পর্যন্ত। মিছিলে ছিলেন বীরভূমের প্রাক্তন সাংসদ এবং গণআন্দোলনের নেতা রামচন্দ্র ডোম। ছিলেন গণআন্দোলনের নেতা গৌতম ঘোষ, ডিওয়াইএফআই সাধারণ সম্পাদক হিমঘ্নরাজ ভট্টাচার্য, রাজ্য সম্পাদক ধ্রুবজ্যোতি সাহা, সভাপতি অয়নাংশু সরকার। অংশ নেন এসএফআই’র রাজ্য সভাপতি প্রণয় কার্য্যী এবং সম্পাদক দেবাঞ্জন দে। সভাপতিত্ব করেন অয়নাংশু সরকার।
ধ্রুবজ্যোতি বলেন, গোটা দেশে ভাগাভাগি চালানোই বিজেপি’র প্রধান শক্তি। এরাজ্যের ভাগাভাগির রাজনীতিকে বজায় রাখতে তৃণমূল নিয়ে এসেছে বিজেপি-কে। দুই দলই পরিচালিত হয় নাগপুর থেকে। একের পর এক শিল্প কলকারখানা তৈরি হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগেই।
এদিন বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামনে ছিল তৃণমূল সরকারের সাফল্য ঘোষণার ব্যানার। বলা হয়, দেশের মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রথম বক্রেশ্বর, দ্বিতীয় হয়েছিল সাঁওতালডিহি। পঞ্চম হয়েছিল সাগরদিঘি।
ধ্রুবজ্যোতি বলেন, বামফ্রন্টের সাফল্যকে আত্মসাৎ করতে নেমেছে তৃণমূল। বিজেপি-র পথেই চলছে।
বিজেপি স্টেশনের নাম, জায়গার নাম বদলে ইতিহাস বদলে দেয়। তৃণমূল সেই শিক্ষা নিয়ে ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে চাইছে। জননেতা জ্যোতি বসুকে বা বামফ্রন্টকে সরকারকে মানুষ ভোলেনি। তিনি বলেন, একদিন রক্ত দিয়েই এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়া হয়েছিল। আজ এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে রক্ষা করব।
তিনি বলেন, সিঙ্গুরের মাটিকে শিল্প ধ্বংস করেছে বিজেপি তৃণমূল একসঙ্গে। রাজ্যের স্থায়ী কাজ নেই। ফলে পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। বাইরের রাজ্যেও বাংলাদেশি তকমা দিয়ে হামলা। খুন হচ্ছেন একের পর এক সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিক। রাজ্য ও কেন্দ্রের সরকার নীরব। তার প্রতিফলন গতকাল বেলডাঙার ঘটনা। তিনি বলেন, বামপন্থা ছাড়া পথ নেই। বামপন্থার পুনর্জাগরনেই শিল্প সম্ভাবনার পথ খুলবে।
হিমঘ্নরাজ বলেন, জ্যোতি বসুর প্রয়াণদিবসে লড়াইয়ের শপথ নিচ্ছে যুবরা। অপরেশন বর্গা জমিতে পৌঁছেছিল সেচের জল। পঞ্চায়েত পৌরসভা, গ্রাম থেকে সরকার পরিচালিত হতো। আজকে সেই বাংলায় দুর্নীতি-দুষ্কৃতীদের হাতে শাসন। বেকারদের কাজ নেই। তাদের দুর্নীতিতে যুক্ত করা হচ্ছে। আর এই পরিবেশকে কাজে লাগাচ্ছে বিজেপি। বিভাজনের রাজনীতি গোটা দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করেছে। তেমনই মৌলবাদী শক্তির পালে হাওয়া দিচ্ছে। সরকার মন্দির তৈরি করছে। আইটি হাব না করে। এই নীতিকে প্রতিহত করার লড়াই চালাচ্ছে ডিওয়াইএফআই।
দেবাঞ্জন বলেন, এই জেলায় তীব্র আক্রমণ হয়েছে বামপন্থীদের ওপর। ‘অনুব্রত মডেল’ সারা রাজ্যে ছড়িয়েছে। বামফ্রন্ট সরকার সর্বজনীন শিক্ষার অধিকার। প্রতি বছর নিয়োগ হয়েছে সরকারি চাকরি, স্কুল, মাদ্রাসায়। সেই পরিকল্পনাতেই হয়েছিল শিল্প-কারখানা। সেই মাটি কামড়ে পড়ে থেকে লড়াইকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে। ছাত্রযুবদের স্বপ্ন ধ্বংস করেছে বিজেপি আরএসএস। তাকে এরাজ্যে সমর্থন করে গিয়েছে তৃণমূল। আজকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার লড়াই আমাদের। জ্যোতি বসুর বাংলা ফের গড়ার লড়াই চলবে।
Comments :0