দীর্ঘ টানাপোড়েন ও একাধিক দফার বৈঠকের পর অবশেষে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের অচলাবস্থা কাটল। সোমবার থেকে উত্তরবঙ্গের সমস্ত বটলিফ চা কারখানা পুনরায় চালু হবে এবং ক্ষুদ্র চা চাষিদের উৎপাদিত কাঁচা চা পাতা সংগ্রহ শুরু করবে। শনিবার শিলিগুড়িতে জলপাইগুড়ির সাংসদ ড.জয়ন্ত রায়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
গত ২৭ জুলাই থেকে নিষিদ্ধ কীটনাশক মনোক্রোটোফস ব্যবহারের অভিযোগ তুলে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বটলিফ চা কারখানা কাঁচা চা পাতা কেনা বন্ধ করে দেয়। এরফলে জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং-সহ উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার লক্ষাধিক ক্ষুদ্র চা চাষি এবং কয়েক লক্ষ চা বাগান শ্রমিক চরম সংকটে পড়েন। বাগানে কাঁচা পাতা জমে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং চাষিরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
এই পরিস্থিতিতে শিলিগুড়িতে আয়োজিত প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠকে বটলিফ কারখানার মালিক, ক্ষুদ্র চা চাষি সংগঠনের প্রতিনিধি, টি বোর্ড,জেলা প্রশাসন, ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া-এর প্রতিনিধি, চা ক্রেতা ও প্যাকার্স সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি চায়ের গুণগত মান বজায় রাখা এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সোমবার থেকেই উত্তরবঙ্গের প্রায় ২৭০-২৮০টি বটলিফ চা কারখানা চালু হবে এবং ক্ষুদ্র চা চাষিদের কাঁচা পাতা সংগ্রহ করবে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে চাষি সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভবিষ্যতে কোনও অবস্থাতেই নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হবে না। বিশেষ ভাবে মনোক্রোটোফস ও কার্সিনোজেনিক রাসায়নিকের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সংগঠন গুলি ছয় মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কোনও চাষি এই নিয়ম ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সমিতির পক্ষ থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
বৈঠকে থেকে রাজ্যের কৃষি দপ্তরকে নিষিদ্ধ কীটনাশকের বিক্রি ও ব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।কৃষি দপ্তরের আধিকারিকরা নিয়মিত অভিযান চালাবেন এবং কোনও কীটনাশকের দোকানে যাতে নিষিদ্ধ রাসায়নিক বিক্রি না হয়,তা নিশ্চিত করা হবে।এই বিষয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও শীঘ্রই প্রয়োজনীয় সরকারি নির্দেশিকা জারি করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ভবিষ্যতে চা পাতার গুণগত মান পরীক্ষার জন্য প্রতিটি বটলিফ কারখানায় টি বোর্ড অনুমোদিত আধুনিক পরীক্ষার যন্ত্র বসানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।চা বোর্ডের অনুমোদনের পর কারখানা কর্তৃপক্ষ নিজস্ব খরচে এই যন্ত্র বসাবে।এর মাধ্যমে চা পাতার মান পরীক্ষা করা হবে এবং সেই খরচ ক্ষুদ্র চা চাষিদের বহন করতে হবে না।
বৈঠক শেষে সাংসদ ড. জয়ন্ত রায় বলেন, উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি চা শিল্প। এই শিল্পে দীর্ঘদিন অচলাবস্থা চলতে পারে না। বহু মানুষের জীবিকা এর সঙ্গে জড়িত।সব পক্ষের ইতিবাচক উদ্যোগে সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হয়েছে এবং সোমবার থেকেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নর্থবেঙ্গল টি প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সঞ্জয় ধানোটি, সিস্টা-র সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী এবং জলপাইগুড়ি জেলা ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির প্রতিনিধিরাও বৈঠকের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সোমবার থেকে স্বাভাবিকভাবে কাঁচা চা পাতা তোলা ও বিক্রির কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কয়েকদিনের অনিশ্চয়তার পর এই সিদ্ধান্তে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পে আপাতত স্বস্তির পরিবেশ ফিরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
Comments :0