একদা রাজনাথ সিং বুক ফুলিয়ে সগর্বে ঘোষণা করেছিলেন বিজেপি সরকারের কোনও মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয় না। আরএসএস’র তৈরি করে দেওয়া ভিতের উপর মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের দম্ভ এতকাল এতটাই আকাশচুম্বী ছিল যে কোনও চাপের কাছে মাথা নিচু করে কোনও মন্ত্রীর পদত্যাগ অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিল। আসলে হিন্দুত্ববাদী আদর্শ আদতে মৌলবাদী চরিত্রের হওয়ায় এরা আলোচনা, মতবিনিময়, বোঝাপড়া, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মান্যতা দেয় না। তারা নিজেরা যেটা মনে করবে সেটাই করবে। বিশেষ করে বিরোধীরা যা বলবে তার উলটোটাই জোর করে করবে। বিজেপি মনে করে জনগণের নিজস্ব কোনও ভাষ্য, মতামত থাকতে পারে না। তারা যা বলবে বা করবে সেটাই হবে জনগণের মত। অর্থাৎ জনগণকেও তারা তাদের অন্ধভক্ত হিসাবেই দেখতে চায়। বিজেপি’র সরকার যদি দুর্নীতি করে, অযোগ্যতা বা অপদার্থতার নজির সৃষ্টি করে তাতেও বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না বা প্রতিবাদ করা যাবে না। এই একদলীয় স্বৈরচারী মনোভাব থেকেই বিজেপি মনে করে জিতে যখন ক্ষমতায় এসেছে তখন তাদের কথাই শেষ কথা। পাঁচ বছর অন্য কোনও কথা চলবে না।
কিন্তু আরএসএস-বিজেপি জনগণকে অনুগত ভক্ত বা দাস মনে করলেও দেশের মানুষ তা নন। তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা এখনও রীতিমতো চনমনে। তারা নাগরিক অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতায় প্রবলভাবে বিশ্বাসী। বিশেষ করে দেশের নব যৌবন তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কোনও মৌলবাদী আদর্শের কাছে তা সে হিন্দুত্ববাদী হোক বা ইসলামিক হোক, সমর্পণ করতে রাজি নয়। তারা আধুনিক ভাবনার অগ্রণী সমাজের মানুষ হতে চায়। তারা আধুনিক যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে এক উন্নত মানবিক সমাজের বাসিন্দা হতে চায়। তাদের দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবোধ ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঘৃণায় জারিত বিভাজন মূলক নয়। ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সকল ভারতবাসীকেই সহনাগরিক হিসাবে বিবেচনা করে এক সঙ্গে জোট বেঁধে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। তারা উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ ও যোগ্য হতে চায়। তারজন্য দেশে উপযুক্ত পরিকাঠামো প্রত্যাশা করে। গরিব, বড়লোক সকলেরই শিক্ষায় সুযোগ চায়। শিক্ষান্তে চায় যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান।
১২ বছরে অনেক গালভরা আশ্বাস আর ভাষণ তারা শুনেছে। কিন্তু শিক্ষার সুযোগ ও মান যেমন ক্ষয় হয়েছে তেমনি সসম্মানে ভদ্রস্ত জীবনযাপনের মতো রোজগারের সুযোগ তৈরি হয়নি। বিনিময়ে প্রতিদিন দেখে যাচ্ছে ধর্মের বিদ্বেষ, হুঙ্কার, অশান্তি, বিভাজন। গোটা সমাজটাকেই বিষিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রজন্ম হতাশ, ক্ষুব্ধ। তারা যা চায় না সেটাই করে যাচ্ছে ডাবল ইঞ্জিনের সরকার। দিনের পর দিন জমে থাকা ক্ষোভ প্রবল বেগে আছড়ে পড়েছে নিট বিক্ষোভকে সামনে রেখে। নতুন প্রজন্মের কেউ দরিদ্র শ্রমিক বা কৃষকের সন্তান। কেউ সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। আবার কেউ জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। কীভাবে তাদের পরিবার তাদের মানুষ করছে তারা দেখেছে। তাই অবাঞ্ছিত ধর্মান্ধ রাজনীতি তারা সহ্য করতে পারছে না। সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যন্তর মন্তরে প্রতিদিন যোগ দেওয়া ছেলে-মেয়েদের কথায়, স্লোগানে। এই প্রজন্ম গণতন্ত্রে, বাক্ স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। ধর্ম দেখে এরা কেউ কারও বন্ধু হয় না। খাদ্য, পোশাক বিশ্বাসে এরা খবরদারি পছন্দ করে না। এরা লেখাপড়া করতে চায়। দক্ষ হতে চায়। ধর্মান্ধ রাজনীতির দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে চায় না। উন্নত ভারতের সূর্যোদয় এই প্রজন্মের হাত ধরেই হবে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, পশ্চাৎপদ অন্ধ বিশ্বাসী সনাতনী ভক্তদের দিয়ে নয়।
Editorial
ঔদ্ধত্যের সৌধ ধূলিসাৎ
×
Comments :0