North Bengal Tea Crisis

নজিরবিহীন সংকট উত্তরবঙ্গের চা শিল্পে, কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কায় লক্ষাধিক ক্ষুদ্র চা চাষী ও শ্রমিক

রাজ্য জেলা

উত্তরবঙ্গের চা শিল্পে নজিরবিহীন সংকট ঘনিয়ে এসেছে। ম্যাক্সিমাম রেসিডিউ লিমিট (এমআরএল) পরীক্ষার শংসাপত্র ছাড়া কাঁচা চা পাতা না কেনার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে চা বলয়ে কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পিক সিজনের মাঝেই উত্তরবঙ্গের বটলিফ ফ্যাক্টরিগুলির একতরফা সিদ্ধান্তে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র চা চাষি, কয়েক লক্ষ চা শ্রমিক, বটলিফ ফ্যাক্টরির শ্রমিক-কর্মচারী এবং এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কাঁচা চা পাতা বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন উৎপাদিত পাতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চা শিল্প নির্ভর অর্থনীতিতেও তার মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
২৪ জুলাই শুক্রবার উত্তরবঙ্গের বটলিফ ফ্যাক্টরি অ্যাসোসিয়েশন এবং নর্থ বেঙ্গল টি প্রডিউসার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে ঘোষণা করে, এমআরএল পরীক্ষার শংসাপত্র ছাড়া কোনও কাঁচা চা পাতা কেনা হবে না। সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর থেকেই উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ চা বলয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। চাষিদের অভিযোগ, খাদ্য নিরাপত্তার নামে এমন একটি শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পরিকাঠামো এখনও তৈরি হয়নি।
বর্তমানে উত্তরবঙ্গে এমআরএল পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। টি বোর্ডের কিউসিএল ল্যাব অথবা কলকাতার এনএবিএল স্বীকৃত পরীক্ষাগারেই পরীক্ষা করাতে হয়। একটি নমুনা পরীক্ষার জন্য সাড়ে আট হাজার টাকারও বেশি খরচের পাশাপাশি জিএসটি দিতে হয়। রিপোর্ট হাতে পেতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। ফলে প্রতিদিন কাঁচা পাতা বিক্রি করা ক্ষুদ্র চা চাষিদের পক্ষে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা কার্যত অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্ষুদ্র চা চাষি পরেশ রায় বলেন, ‘‘আমাদের মতো ছোট চাষিদের পক্ষে প্রতিবার এত টাকা খরচ করে এমআরএল পরীক্ষা করানো সম্ভব নয়। ১০০ কেজি কাঁচা পাতার দাম থেকেই যেখানে খুব সামান্য আয় হয়, সেখানে সাড়ে আট হাজার টাকা খরচ করে শংসাপত্র জোগাড় করা বাস্তবসম্মত নয়। পাতা বিক্রি না হলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার অবিলম্বে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করুক।’’
চা-বাগান মজদুর ইউনিয়নের নেতা অমূল্য রায় বলেন, ‘‘কোনও আলোচনা ছাড়াই পিক সিজনের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে শুধু ক্ষুদ্র চা চাষিরাই নন, চা বাগানের শ্রমিক, বটলিফ ফ্যাক্টরির শ্রমিক-কর্মচারী এবং চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত মানুষ গভীর সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন ব্যাহত হলে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে শ্রমিকদের জীবিকায়।’’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, বড় চা বাগানগুলিতে কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে একই ধরনের কড়াকড়ি কেন নেই, তার উত্তর মিলছে না। পাশাপাশি আসাম থেকে নিম্নমানের চা এনে পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবি জানান। নিরাপদ চা উৎপাদনের স্বার্থে মনোক্রোটোফস-সহ ক্ষতিকর কীটনাশকের বিক্রি অবিলম্বে নিষিদ্ধ করার দাবিতে রাজ্যের কৃষি দপ্তরের প্রধান সচিবের কাছেও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ইউনিয়নের অভিযোগ, গত ২৪ জুলাই শিলিগুড়িতে বটলিফ ফ্যাক্টরির প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র চা চাষি সংগঠনগুলির বৈঠকে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই একতরফাভাবে এমআরএল শংসাপত্র বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা করা হয়। এর ফলে আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে বলেও দাবি সংগঠনের। চা-বাগান মজদুর ইউনিয়নের মতে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে উত্তরবঙ্গের চা শিল্প ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে। ক্ষুদ্র চা চাষিদের বড় অংশ উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবেন। বটলিফ ফ্যাক্টরি গুলির উৎপাদন কমে যাবে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের উপর। বহু শ্রমিক কাজ হারিয়ে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে পাড়ি দিতে বাধ্য হতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠন।
এই পরিস্থিতিতে ইউনিয়নের ধারাবাহিক আন্দোলনের চাপে আগামী ৩১ জুলাই নবান্নে সংকট নিরসনে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে ক্ষুদ্র চা চাষিদের স্বার্থ রক্ষা, এমআরএল পরীক্ষার প্রয়োজনীয় সরকারি পরিকাঠামো গড়ে তোলা, পরীক্ষার ব্যয়ভার কমানো, কাঁচা পাতা কেনাবেচা স্বাভাবিক রাখা এবং চা শিল্পে কর্মসংস্থান সুরক্ষিত করতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানানো হবে। সংগঠনের স্পষ্ট বক্তব্য,দ্রুত সমাধান না হলে উত্তরবঙ্গ জুড়ে বৃহত্তর গণআন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন ক্ষুদ্র চা চাষি,শ্রমিক এবং চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত মানুষ।

Comments :0

Login to leave a comment