জলের স্রোতে সবং’র ১৩টি গ্রামপঞ্চায়েত এলাকাই জলের তলায়। এই প্লাবনে এক শিশু সহ এক প্রৌঢ়ের মৃত্যু হয়ছে। সবং থানার ৬ নম্বর চাউলকুড়ি অঞ্চলের খড়িকা এলাকায় রাস্তাঘাট জলের তলায়। সেই স্থানে এক ৩ বছরের শিশু অজান্তে ঘর থেকে জলে নেমে পড়লে স্রোতে পাশের পুকুরে ভেষে গিয়ে ডুবে যায়। মৃত শিশুর নাম অর্ঘ্যদীপ মান্না। অন্যদিকে, একই দিনে সবংয়ের নওগাঁ ২ নম্বর অঞ্চলের সানসাহড়া গ্রামে বন্যার জলে ফুটজাল নিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে তলিয়ে মৃত্যু হয় ৫৭ বছরের তপন কুমার জানার।
রাত জেগে বাঁধের ফাটল, ধ্বস স্থানে মাটির বস্তা ফেলে, বাঁশ দিয়ে মেরামত করেও রক্ষা করা গেলো না। কেলেঘাই, কপালেশ্বরী, বাগুই, চাঁদিয়া নদী গুলির পাড় উপছে পড়ছে। কোথায় নদী বাঁধের উপর ৩ ফুট কোথাও ৪ ফুট উচ্চতায় মাটি ভর্তি বস্তা বাঁশের ঠেক দিয়ে। তাও সামাল দিতে পারেনি ভয়ঙ্কর জলের স্রোতের কারণে। চরম বিপদ সীমার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলছে জলের স্রোত। তার মধ্যেই ফের নিম্ন চাপের বৃষ্টি। সেই সঙ্গে ঝাড়খণ্ডের সুবর্ণরেখা নদীর বাঁধ থেকে ৫১ হাজার কিউসেক জল ছাড়ার ফলে কেলেঘাই, বাগুই, কপালেশ্বরীর গর্জনে তটস্থ সবং, নারায়নগড়, কেশিয়াড়ী, দাঁতন, মোহনপুর ও পিংলা। সবং এর রাস্তাঘাট, সড়ক রাস্তার উপর কোমর সমান জল। নদী বাঁধ ভাঙনের মুখে বহু এলাকায়। বৃষ্টির মধ্যেই ভাঙন আটকাতে মরিয়া চেষ্টা গ্রামের মানুষের। আতঙ্ক বাঁধ ভাঙলে আগামী ছয় মাস জলের তলায় থাকবে গ্রামের পর গ্রাম। ইতি মধ্যে সবং এর বহু মোজায় ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। ঘরের মধ্য দিয়ে জলের স্রোত বয়ে যাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছে নদী বাঁধের উপর ত্রিপল লাগিয়ে। নেই রান্নার জায়গা , রয়েছে জ্বালানির সংকট। গত তিন দিন ধরে বহু মৌজা জলের তলায় থাকায় পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বিদ্যুতহীন বহু মৌজা। কপালেশ্বরী কেলেঘাই বাগুই তিন নদীর জলের স্রোতে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণের ৬টি ব্লক জলের তলায়। কেলেঘাই, কপালেশ্বরী, বাগুই তিন নদীর মিলন স্থল সবং এর নাঙলকাটাতে কেলেঘাই নদীর চর দখল করে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য ভেড়ী ও ৬০-৭০ টি ইট ভাটা। কেলেঘাই নদীর চওড়া যেখানে ১৪০০ মিটার থাকার কথা সেখানে ৩০০-৪০০ মিটারে ঠেকেছে। ফলে জলের স্রোতে পশ্চিম মেদিনীপুর ও পূর্ব মেদিনীপুর দুই জেলার ৯ টি ব্লক কে প্লাবিত করেছে। এই তিন নদীর মিলন স্থল নাঙলকাটাতে রূপনারায়নের সাথে মিশেছে। রূপনারায়নের এই মিলন স্থলে রাবার ড্যাম্প নির্মাণের জন্য ২০১০ সালে ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের মানস ভূঁইয়া ও বর্তমান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দ্বন্দ্বে সেই কাজ আর হয়নি। পাশাপাশি কেলেঘাই, কপালেশ্বরী ও বাগুই তিন নদীর সংস্কারের জন্য ৬৫০ কোটি ৩৯ লক্ষ বরাদ্দ সহ কাজ শুরু হয়। কিন্তু সেই কাজ মাঝ পথে বন্ধ হয়ে যায় সেই একুই দ্বন্দ্বের কারণে। আর তখন থেকেই কেলেঘাই নদীর চর দখল করে ভগবানপুরের খুন হয়ে যাওয়া তৃণমূল নেতা নান্টু প্রধান ও সবং’র তৃণনেতা নান্টু প্রধানের ভাগ্নের নেতৃত্বে কেলেঘাই চর দখল করে ভেড়ি ও ইট ভাটার বিস্তার ঘটে। সেই কারণে আজ এই বিপত্তি বলেছেন স্থানীয় মানুষজন।
সবং, নারায়নগড়, কেশিয়াড়ি, দাঁতন, মোহনপুর ও পিংলা ৬ টি ব্লকের দুই হাজার অধিক মৌজা জলের তলায়। মাথার উপর বৃষ্টি, আর মাটির উপর জলের স্রোত, একের পর এক মৌজা জলের তলায়। পানীয় জলের নলকূপ সহ মিনি ডিপ টিউবওয়েল সবই জলের তলায়। তীব্র পানীয় জলের সংকট। ত্রাণের ব্যাবস্থা নেই। পানীয় জলের সংগ্রহে তীব্র জলের স্রোত ঠেলে মহিলা পুরুষ মানুষ পাড়ি দিচ্ছে উঁচু স্থানে।
২০২১ সালের বন্যার ভয়াবহতা পটাশপুরবাসীর মন থেকে যায়নি। সেবার পটাশপুর ১ ব্লকের তালছিটকিনিতে কেলেঘাইর বাঁধ ভেঙে বন্যা কবলিত হয়েছিল পটাশপুর, ভগবানপুর সহ চন্ডীপুরের বিস্তীর্ণ অংশ। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এবার এখনও পর্যন্ত কেলেঘাইর বাঁধ না ভাঙলেও ফের রবিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত যেভাবে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে, তাতে শুধু নদীতীরবর্তী মানুষ নয়, গোটা এলাকার মানুষই রয়েছেন চিন্তায়। জলের চাপ তীব্র হওয়ায় যে কোন মুহূর্তে বাঁধভাঙার আশঙ্কা রয়েছে। আমগাছিয়া থেকে তালাডিহা পর্যন্ত ধসপ্রবণ এলাকার নদীবাঁধ দিনরাত পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয় মানুষ।
সোমবারও কেলেঘাই, বাগুই বিপদসীমার উপর দিয়ে বয়ে গেছে। নতুন করে পটাশপুর ১ ব্লকের ব্রজলালপুর, বড়হাট ও পটাশপুর ২ ব্লকের শ্রীরামপুর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশ প্লাবিত হয়েছে বাগুইর জলে। পটাশপুর খাল, সিংদা খাল, শ্রীরামপুর খাল উপচে জল ঢুকছে হুহু করে। পটাশপুর ২ ব্লকের বারচৌকা বেসিনের জলে প্লাবিত হয়েছে বনমালীচক, চন্দনখালি ধুসুরদা, কাশিমপুর সহ প্রায় ১৫ টি গ্রাম। ঘর ছেড়ে খালপাড়ে কিংবা অন্য উঁচু জায়গায় ত্রিপল টাঙিয়ে অস্থায়ী ছাউনি বানিয়ে থাকতে দেখা গেছে দুর্গত এলাকার লোকজনকে । পটাশপুর ১ ব্লক প্রশাসন সূত্রে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিলি হয়েছে বলে জানানো হলেও গোকুলপুর অঞ্চলের অমরপুর গ্রামে ত্রাণ না দেওয়ার অভিযোগ মিলেছে। নৈপুর অঞ্চলের মানুষেরও একই অভিযোগ ।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টির কারণে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে এগরা ২ ব্লকের দুবদা বেসিন। অবিরাম বৃষ্টির জন্য কুদি - নেগুয়া ক্যানেল চম্পা খালের জল উপচে এই প্লাবন দেখা দিয়েছে। এর ফলে দুবদা সহ একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত । চাষের জমি, রাস্তাঘাট জলের তলায়। একই অবস্থা বিবেকানন্দ অঞ্চলের। এগরা ১ ব্লকের ছত্রী, পাঁচরোল, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ও সাহাড়া অঞ্চলের রাস্তাঘাট, চাষের জমির উপর কোমর সমান জল। ঝাড়গ্রামের গালুডি জলাধার থেকে জল ছাড়ায় সুবর্নরেখার জল বেড়ে প্লাবিত হয়েছে সাহাড়া অঞ্চলের পাঁচটি গ্রাম।
Sabang Flood
জলমগ্ন দুই মেদিনীপুর, সবং-এ জোড়া মৃত্যু
Waterlogged , Sabang , West Midnapore, two-deaths
×
Comments :0