Shyamaprasad Mukherjee

শ্যামাপ্রসাদকে ঘিরে সরকারি উদ্যোগ, ইতিহাসের পুনর্লিখনের আশঙ্কা

রাজ্য

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ১২৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বর্ষব্যাপী কর্মসূচিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের অবকাশ তৈরি হয়েছে। এদিন নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠিত রাজ্যস্তরের কমিটির প্রথম বৈঠকে কলকাতার ইকো পার্কে ১২৫ ফুটের মূর্তি নির্মাণ, হুগলির জিরাটে পৈত্রিক ভিটায় গ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালা তৈরি, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাংলা ও ইংরেজিতে বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগকে কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করার কর্মসূচি হিসেবে দেখলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্য আড়াল থেকে যেতে পারে। বিশেষত বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইতিহাস, জাতীয়তাবাদ এবং বাংলার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে সামনে রেখে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বামপন্থীরা।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন ইকো পার্কে ১২৫ ফুট উচ্চতার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মূর্তি নির্মাণের সিদ্ধান্তকে বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ভূমিপুজো ও স্থান নির্বাচন হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। মূর্তির পাশাপাশি মিউজিয়াম এবং অন্যান্য পরিকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
হিডকোর পক্ষ থেকে প্রকল্পের নকশা ও পরিকল্পনা বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিটির অনুমোদনের পর দ্রুত কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে এই বিপুল সরকারি ব্যয়ের প্রকল্পে জনস্বার্থের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সরকারি পরিষেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো ক্ষেত্র যখন রাজ্যের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে সামনে রয়েছে, তখন একটি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে বিশাল মূর্তি নির্মাণে সরকারি অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

হুগলির জিরাটে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির পৈত্রিক ভিটায় ৩০ ডেসিমেল জমি কেনার কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার। সেখানে স্যার আশুতোষ মুখার্জির নামে থাকা গ্রন্থাগার পুনর্নির্মাণ এবং একটি সংগ্রহশালা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির পশ্চিমবঙ্গ, শিক্ষা ও শিল্পক্ষেত্রে ভূমিকা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই পর্যায়ক্রমে এই বিষয়গুলি পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার জন্য শিক্ষা দফতরকে প্রস্তাব তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রশ্নটি হলো শিক্ষার পাঠ্যক্রম কি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে, নাকি ইতিহাসের বিভিন্ন মত, বিতর্ক ও পরস্পরবিরোধী মূল্যায়ন শিক্ষার্থীদের সামনে সমানভাবে তুলে ধরা হবে?
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে যেমন আলোচনা রয়েছে, তেমনই তার সমসাময়িক রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন, বঙ্গভঙ্গের সময়কার অবস্থান এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়েও ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। সেই বিতর্ক বাদ দিয়ে একমাত্রিক মূল্যায়ন পাঠ্যক্রমে ঢুকে পড়লে ইতিহাসচর্চার বদলে রাজনৈতিক প্রচারের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণশিক্ষা ও গ্রন্থাগার দপ্তরকে নোডাল দপ্তর করে বাংলা ও ইংরেজিতে একটি পূর্ণাঙ্গ পুস্তিকা প্রকাশের জন্য পৃথক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রচিন্তা এবং ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’-এর ভাবনার সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করানো এই কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।

কিন্তু বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্লেষণে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি আরও বৃহত্তর সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখার কথা বলা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কংগ্রেস, বামপন্থী আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন, বিপ্লবী আন্দোলন এবং বিভিন্ন সামাজিক শক্তির ভূমিকা রয়েছে। ফলে একজন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে জাতীয় ইতিহাসের পুনর্গঠন করলে সেই বহুমাত্রিক ইতিহাস আড়ালে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Comments :0

Login to leave a comment