ভারতের বহুদলীয় নির্বাচনী গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করছে বিজেপি। শুধু স্বাধীন, নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে নির্বাচন কমিশনের স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষুণ্ণ করে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে তাকে পরিচালিত করাই নয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পেশিবল, অর্থবলকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করাতেও মাত্রা ছাড়িয়েছে এই দল। বিশেষ করে একাংশের সংবাদ মাধ্যমকে নিজেদের স্বার্থে প্রচার করতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছে বিজেপি। এমনকি, নির্বাচনী প্রচারে সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বা বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে টাকা দিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার ঘটনাও প্রকাশ্যে এসেছে।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন, ২০২৬-এর নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জমা দেওয়া হিসাব নির্বাচন কমিশন তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা খরচের হিসাবে দেখা যাচ্ছে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মোট প্রায় ২৮৬ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকা খরচ করেছে। এর মধ্যে বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, ইউ টিউবার ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই তালিকায় রয়েছে সায়ক চক্রবর্তীকে ২.৫ লক্ষ টাকা, শমীক অধিকারীকে ১৩ লক্ষ টাকা এবং আরজে প্রিয়াঙ্কা ঘোষকে ১৫লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন মিডিয়া পোর্টাল ও পেজগুলোর নাম এই খরচের তালিকায় রয়েছে।
অভিযোগ, বিজেপি সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের ব্যবহার করে রাজ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় মেরুকরণ এবং বিশেষ রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করার চেষ্টা করেছে। কিভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের কাজে এই প্রচার করা হয়েছে, তার একটি উদাহরণ ‘অলি পাব’র ঘটনা উল্লেখ করলেই স্পষ্ট হবে। ঘটনার সূত্রপাত ৩০ জানুয়ারি। ইউ টিউবার সায়ক চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, তিনি পাঁঠার স্টেক অর্ডার করলেও তাঁর একটি প্লেটে গোরুর মাংসের স্টেক পরিবেশন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সমাজমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে ৩১ জানুয়ারি ওই রেস্টুরেন্টের ওয়েটার নাসিমুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই মামলায় নাসিমুদ্দিন এখনও আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। অভিযোগকারী একসময় মামলা প্রত্যাহারের কথা বললেও তা হয়নি। তবে বিজেপি’র নির্বাচনী প্রচারে সায়ককে আড়াই লক্ষ টাকা দেওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সায়ক অবশ্য সমাজ মাধ্যমে লিখেছেন, অলিপাবের ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছিল, তা সকলেই জানেন। এখন দেখা যাচ্ছে, তাঁকে এজন্য বিজেপি’র পক্ষ থেকে টাকাও দেওয়া হয়েছিল।
অর্থপ্রাপক সংস্থা বা ব্যক্তির প্রচার খতিয়ে দেখলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই এইরকম উদাহরণ পাওয়া যাবে। যদিও, বিজেপি’র পক্ষ থেকে এই অভিযোগ খণ্ডন করে বলা হয়েছে যে দল নির্বাচনী বিধি ও নিয়ম মেনেই সমস্ত খরচ পরিচালনা করেছে এবং আইনসম্মতভাবে হিসাব দাখিল করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসাবে খরচের আনুষ্ঠানিক হিসাব নির্বাচন কমিশনের কাছে পেশ করে আইনগত দায় সেরেছে, কিন্তু মূল আইনি ও নৈতিক প্রশ্নটি উঠেছে ইনফ্লুয়েন্সারদের ভূমিকা নিয়ে। প্রশ্ন হলো, একজন সোশাল ইনফ্লুয়েন্সার কি রাজনৈতিক দলের থেকে টাকা নিয়ে প্রচার করতে পারেন? প্রচার করার পেশাগত অধিকার তাঁদের থাকলেও, তাঁরা যখন কনটেন্টটি প্রচার করছিলেন, তখন কি দর্শকদের কাছে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে এটি একটি অর্থ প্রদত্ত বা স্পনসর্ড প্রচার? ঘটনা হলো, অধিকাংশ ইনফ্লুয়েন্সারই এই আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ করেননি; বরং বিষয়টিকে নিজেদের ‘স্বতঃস্ফূর্ত ও নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ’ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। এখানেই তাঁরা সুস্পষ্টভাবে ভারতীয় নির্বাচনী বিধিমালা এবং ডিজিটাল প্রচারের মৌলিক আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছেন।
Influencers in Social Media
সোশাল মিডিয়ায় প্রভাবীদের ভূমিকা
×
Comments :0