Ganashakti Editorial

বিদায়ের প্রহর

সম্পাদকীয় বিভাগ

সব ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করেও যখন মাথা ব্যথা সারানো যাচ্ছে না তখন মাথাটা কেটে ধড় থেকে সরিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচনা করেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। সীমাহীন পুলিশি বর্বরতা, এমনকি মহিলা বিক্ষোভকারীদের উপর যৌন হামলা চালিয়েও যখন সরকার বিরোধী বিক্ষোভ প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণ বা দমানো যাচ্ছে না, উলটে প্রতিবাদী জনতার জেদ আরও বেড়ে যাচ্ছে তখন রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলের আশপাশ থেকে বিক্ষোভ স্থলটাকেই উপড়ে ফেলা (নিষিদ্ধ করা) যায় তাহলে আর বিক্ষোভের আঁচ টের পাওয়া যাবে না। অমিত শাহ’র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অনেক ভেবে-চিন্তে আবিষ্কার করেছে সংসদ ভবন সহ প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে মাত্র দেড়-দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভ স্থল হিসাবে নিষিদ্ধ করা হয় তাহলে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের তেজ কমে যাবে। বদলে অনেকটা দূরে কোথাও যদি প্রতিবাদের সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে সেটা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরের বিক্ষোভকে শাসকরা উপেক্ষা করতে পারবেন। মানুষের মধ্যেও সেটা বিশেষ দাগ কাটবে না। অতএব মোদী-শাহদের ক্ষমতা হারানোর ভয় কিছুটা কমবে।
মোদী-শাহরা সম্ভবত মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। ওরা বোধ হয় জানেন না অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, পদে পদে ব্যর্থতা-অপদার্থতার বিরুদ্ধে মানুষের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে নানা ফর্মে, নানা অভিমুখে। এই ক্ষোভ দ্রুত প্রতিবাদ আন্দোলনে রূপান্তরিত হচ্ছে। শাসকের প্রতি মানুষের সন্দেহ যদি বাড়ে, শাসকের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস, অনাস্থা বাড়ে তাহলে সেই শাসকের অপসারণই হয়ে ওঠে মানুষের অগ্রাধিকার। দিল্লি সহ দেশজুড়ে যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঝড় উঠেছে সেটা তারই বহিঃপ্রকাশ। মানুষ আর মিষ্টি-মধুর ভাষণ শুনতে রাজি নন। তারা কাজ চান। কাজ না করতে পারলে সরতে হবে। আর যদি ব্যর্থতা-অপদার্থতা ঢাকতে অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক, দমনমূলক পথে যায় তবে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে। বস্তুত সম্প্রতি সেই ঝড়েরই ঘনঘটা চলছে।
গত ২০ জুলাই থেকে মাসাধিককালে অনশন-অবস্থান-বিক্ষোভ-প্রতিবাদের ধাক্কায় শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ অনিবার্য হয়ে যায়। গত শনিবার ও রবিবার যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে প্রায় ৪০ হাজার পুলিশ, আধা সেনা নামিয়ে নাকাল হয়েছে সরকার। এক দিকে সিজে‍‌পি, অন্যদিকে বাম ছাত্র-যুবরা, আর এক দিকে বিরোধী দলসমূহের দফায় দফায় প্রতিবাদ মিছিলে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র। বহুস্তরীয় ব্যারিকেড দিয়ে দু‍‌র্ভেদ্য দুর্গ বানা‍‌লেও ভেঙে পড়েছে তাসের ঘরের মতো। মোদীরা বুঝে গেছেন জাগ্রত জনতার হাত থেকে রেহাই ‍‌মিলবে না। অতএব কেড়ে নিতে হবে যাবতীয় গণতান্ত্রিক অধিকার। প্রতিবাদ-বিরোধিতার অধিকার। যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ করার অধিকার কাড়া হয়েছে স্বৈরাচারী কায়দায়।
গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত প্রতিবাদের বিরোধিতার অধিকার। বিশ্বের যে কোনও গণতান্ত্রিক দেশে শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রতিবাদের অবারিত অধিকার দেওয়া হয়। যন্তর মন্তর তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মোদীরা সম্প্রতি পদে পদে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তারা বেজায় ভীত, সন্ত্রস্ত। ক্ষমতা হারানোর ভয় তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। টিকে থাকার জন্য স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী পথে পা বাড়িয়েছেন। মানুষের সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের রাষ্ট্রের ক্রীতদাসে পরিণত করতে চাইছেন। বিক্ষোভ স্থল হিসাবে যন্তর মন্তর নিষিদ্ধ করে প্রমাণ করেছেন এবার বিদায়ের প্রহর গোনা শুরু।

Comments :0

Login to leave a comment