Smart Meter

১২ হাজার টাকা বিল স্মার্ট মিটারে, লড়াই করে আটকেছে বামপন্থীরাই

রাজ্য

ছবি সংগ্রহ থেকে।

শুভ্রজ্যোতি মজুমদার: চন্দননগর,

 তখনও মেসির কলকাতায় আসার খবর প্রকাশ্যে আসেনি। রাজ্যের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ফুটবলের জাদুকরের সঙ্গে সেঁটে থেকে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনকে কালিমালিপ্ত করায় জড়িয়েও পড়েননি। 
ক্রীড়া ও যুবকল্যাণের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রীসভার বিদ্যুৎ দপ্তরের দায়িত্বে অরূপ বিশ্বাস।
কিন্তু বিদ্যুৎ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস গত ২০২৫ সালের ১১ রাজ্য বিধানসভায় একটি বিবৃতি পড়েছিলেন। কী বলেছিলেন তিনি?
‘‘আমরা সবার জন্য বলছি, এখন থেকে স্মার্ট মিটারকে সাধারণ মিটার হিসাবে ব্যবহার করা হবে। আগে গ্রাহকরা যেভাবে তিন মাসে বিদ্যুৎ বিল দিতেন, এখন সেভাবেই তিন মাসে বিল দেবেন। আর কাউকে আগাম টাকা (প্রি-পেমেন্ট) দিতে হবে না। এবার থেকে পোস্ট পেইড পেমেন্টই হবে। এখন যে মিটার আছে তা তিন মাস পর থেকে সাধারণ মিটার হবে।’’ ঘোষণা ছিল অরূপ বিশ্বাসের। মজার ঘটনা হলো এটাই, সেবার বিধানসভার চলতি অধিবেশনে একবারের জন্য শাসকদল তৃণমূল ও বিরোধী দল বিজেপি’র কোনও বিধায়ককে স্মার্ট মিটারের বিরোধিতা করে এক লাইনও বলতে শোনা যায়নি। বিধানসভায় ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’, ‘জিরো আওয়ার’, ‘উল্লেখ পর্ব’ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকারের তড়িৎ গতিতে রাজ্যজুড়ে স্মার্ট মিটার বসানো নিয়ে ছিটেফোঁটা প্রশ্ন আসেনি অধিবেশনে। অথচ বিধানসভার গত সেই অধিবেশনেই রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রীকে বক্তব্য পেশ করে জানাতে হল, স্মার্ট মিটার বসানোর কর্মসূচিকে আপাতত গুটিয়ে নিচ্ছে রাজ্য সরকার!
২০২১ সালে রাজ্যের সপ্তদশ বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম) সহ বামফ্রন্টের আসন প্রাপ্তি ছিল শূন্য। ফলে গত বিধানসভায় কার্যত কোন কন্ঠস্বর ছিল না বামপন্থীদের। বিধানসভা ব্যস্ত থাকত কে বেশি ‘সনাতনী’ তার প্রতিযোগিতায়। কপালে গেরুয়া তিলক কেটে আসত বিরোধী দল বিজেপি, পাল্টা মুখ্যমন্ত্রীও ব্যস্ত ছিলেন তাঁর ধর্মীয় পরিচয় জানাতে। বিধানসভায় শূন্য প্রাপ্ত বামপন্থীদের অনুপস্থিতিতে রাজ্য সরকার বাধ্য হয়েছিল স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ স্থগিত রাখতে। কেন?
মোদী সরকারের ফরমান মেনে সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সর্বনাশ করে চুপিসারে মমতা ব্যানার্জির সরকার স্মার্ট মিটার বসানোর চেষ্টায় ছিল। আর তখনই রাস্তায় নেমে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলে বামপন্থীরা। গত বছর এপ্রিল মাস থেকেই রাজ্যে প্রায় আড়াই লক্ষের ওপর প্রিপেড স্মার্ট মিটার ইতিমধ্যে বসিয়ে দিয়েছিল। তার মধ্যে প্রায় ৬০ হাজারের ওপর ছিল সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহক। মিটার পরিবর্তন করার নাম করে বাড়ি, বাড়ি এসে শুরুতে বসানো হয়ে যায় প্রিপেড স্মার্ট মিটার। স্মার্ট মিটার বসিয়ে দেওয়ার পর বিদ্যুৎ বিল দিতে গিয়ে গত এক-দু মাসে জেরবার হয়ে গেছেন সাধারণ গ্রাহকরা। পুরানো মিটারে বিদ্যুৎ পুড়িয়ে যে বিল আসত, তার থেকে কয়েক গুণ বেশি বিল আসতে শুরু করে। জেরবার মানুষ দলে, দলে বিদ্যুৎ দপ্তরের সিসিসি (কাস্টমার কেয়ার সেন্টার)-তে গিয়ে প্রিপেড স্মার্ট মিটার ফিরিয়ে নেওয়ার আবদেন করতে থাকে। বর্ধমান শহরে এক প্রকার বাধ্য হয়েই প্রিপেড স্মার্ট মিটার থেকে পুরানো মিটারে ফিরে আসতে বাধ্য হয় প্রশাসন। 
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বামপন্থীদের উদ্যোগে শুরু হয়ে যায় স্মার্ট মিটার বিরোধী আন্দোলন। বনগাঁ, বারাসত, পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন এলাকা থেকে শুরু করে হুগলীর চন্দননগরে শুরু হয়ে গিয়েছিল স্মার্ট মিটারের বিরুদ্ধে বিরোধী তুমুল প্রতিরোধ। 
চন্দননগর জুড়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের ৪টে অফিসের সামনে বিক্ষোভ দেখান মানুষ। অনুমতি ছাড়া বাড়িতে স্মার্ট মিটার লাগানো যাবে না, এই মর্মে ফর্ম ফিল আপ করে জমা দেন গ্রাহকেরা। চন্দননগরে রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের ১৮ হাজার গ্রাহকের মধ্যে ১০ হাজার গ্রাহক স্মার্ট মিটার অনুমতি ছাড়া লাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। দীর্ঘ আন্দোলনের সুফল হলো স্মার্ট মিটার চালু করার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ। প্রিপেইড বিদ্যুৎ কানেকশনের বদলে পুরানো পদ্ধতি তে বিল দেওয়া ও রিডিং এর ব্যবস্থা চালু করা হয়। স্মার্ট মিটার আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল প্রথম স্বার্থ গ্রাহকদের ওপর বিপুল টাকার বিল চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে ও দ্বিতীয় স্বার্থ ছিলো কর্মীদের কাজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু আন্দোলনে তো জয় হল কিন্তু কেমন আছেন গ্রাহকরা?  

চন্দননগরের বাসিন্দা রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের গ্রাহক শোভনলাল সেনগুপ্ত জানান, ‘‘স্মার্ট মিটার বসিয়ে গিয়েছিল আমাদের অনুমতি না নিয়ে। পরে জানলাম স্মার্ট মিটার বসানোর বরাত সরকার একটা বেসরকারি সংস্থা কে দিয়েছে। স্মার্ট মিটার বসাতে ৮০০০ টাকা মতো খরচ আমাদের গ্রাহকদের ঘাড়েই ছাপবে। আর এটার মেয়াদ ও বেশিদিন নয়। মানে গ্রাহকদের কাঁধে বোঝা চাপিয়ে কামানোর একটা ধান্দা ছিল আমরা তার প্রতিবাদ জানাই। আমি চার নং ফরম ফিল আপ করে স্মার্ট মিটার বাতিল করার প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। ফলে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিল বিদ্যুৎ পর্ষদ। পুরানো পদ্ধতিতে বিল পাঠিয়ে দেয় বিদ্যুৎ পর্ষদ। কিন্তু এখনও স্মার্ট মিটার খোলেনি।’’ 
চন্দননগরের আরেক বাসিন্দা হীরালাল সিংহ জানান, ‘‘স্মার্ট মিটার তো খোলেনি চিন্তা হয় আবার না চালু করে দেয়। আমাদের এখানে অনেকের ১২-১৩ হাজার টাকার বিল এসেছিল চন্দননগর জুড়ে স্মার্ট মিটারের বিরুদ্ধে ফরম ফিল আপ হয়েছিল বড় অংশের গ্রাহক স্মার্ট মিটার বাতিল করার দাবি তুলেছিলেন।’’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রাহক জানান, ‘‘স্মার্ট মিটার লাগানোর পর ১২ হাজার টাকার বিল দিয়েছিল। এখন অবশ্য সমস্যা নেই। তবে ভয় হয়। এখনও তো স্মার্ট মিটার লাগানো আছে।’’ 
রাজ্যের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভয়ের আশঙ্কা অমূলক নয়। জন আন্দোলনের চাপে রাজ্য সরকার স্মার্ট মিটার বসানোর নীতি স্রেফ স্থগিত রেখেছে। বিধানসভা ভোটের আগে আরজিকর নিয়ে তোলপাড় আন্দোলনের জেরে স্মার্ট মিটার নিয়ে নতুন বিপদের মুখোমুখি হতে চায়নি মমতা ব্যানার্জির সরকার। তাই ক্ষমতায়, তৃণমূল কিংবা বিজেপি যারাই আসুক স্মার্ট চালু করবেই। এই বিপদকে আটকাতে পারে একমাত্র বামপন্থীরাই। 
...................................................

Comments :0

Login to leave a comment