রণদীপ মিত্র
মেঝেতে পাতা পাতলা একটা কাঁথা। তার উপর এলিয়ে থাকা শরীরটা যেন হার মেনেছে কাঁথার পুরুত্বের কাছে। মুছেছে পেট-পিঠের ফারাক । চামড়ার ভাজে স্পষ্ট হওয়া পাঁজরের হাড় অনবরত ওঠা নামা করছে হাঁপানির গ্রাসে। মাথায় টিনের ছাউনির ভাঁপ সেই হাঁপানি যেন আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বছর সত্তরের ইমানি মোমিনের, আধখানা লুঙ্গিতে ঢাকা শীর্ণ শরীরের পাশে স্ত্রী ফুলমনি মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছেন স্বামীকে সুস্থ করার বৃথা লক্ষ্যে!
চারিপাশে পাথরের ক্রাশারের ধূলোর দাপটে বিবর্ণ এক গ্রাম পলাশবুনী। অঞ্চল ভাঁড়কাটা। পাঁচামী পাথর বলয়ের পরিচিত জনপদ। সেখানেই মাটির দেওয়ালের উপর জং ধরা টিনের ছাউনির তলায় দিনগুজরান এই দম্পতির। পাথরের চূর্ণ ইমানি মোমিনের ফুসফুসকে করেছে বিচূর্ণ। সিলিকোসিসের থাবার আগেই হয়েছিলেন অক্ষম। ‘হার্ট অ্যাটাক’-এ আজ তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্থও। রোগের সঙ্গে অনটন— জোড়া ফলায় বিদ্ধ রুজিহীন এই পরিবার। অথচ মোমিনের ফুসফুসে অনিরাময়যোগ্য সিলিকোসিসের হানা নিশ্চিত হয়েছিল বছর খানেক আগেই। আজও মেলেনি ক্ষতিপূরনের দু-লক্ষ টাকা। অনটনের থাবায় জেরবার দম্পতি। প্রমান মেলে দম্পতির আঙিনায় পা দিলেই। ফুলমনি মোতিনের কথায়, ‘‘স্বামী আর উঠতেই পারে না। কিছু সাহায্য মিললে বেঁচে যেতাম।’’ আকুতি শুধু ফুলমনির নয়, আছে অসংখ্যের।
পাঁচামী জুড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সিলিকোসিস। শুধু পাঁচামীই নয় একই ব্লক অর্থাৎ মহম্মদ বাজারের প্যাটেলনগরের খড়ি খাদান এলাকা থেকেও ধারাবাহিকভাবে মিলছে সিলিকোসিসের খোঁজ। সদ্য হওয়া সিলিকোসিস নিশ্চিতকরণ বোর্ড আরো ৩৭ জনকে সিলিকোসিস আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করেছে। স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত তিন মাসে পাঁচামীর হরিণশিঙা, ভাঁড়কাটা এবং প্যাটেলনগরে হওয়া স্বাস্থ্য শিবির থেকে মোট ৭৫ জন সন্দেহভাজন রোগীর চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে চলতি সপ্তাতে। সেখানেই সিলিকোসিস বোর্ড আরও ৩৭ জনকে নিশ্চিত সিলিকোসিস আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করেছে। ফলে বীরভূম স্বাস্থ্য জেলায় মোট সিলিকোসিস আক্রান্তের সংখ্যা হয়েছে ১৮৩। ইতিমধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মানছেন, সংখ্যাটা এখনও নগন্য। পর্যবেক্ষন আরও নিবিড় হলে আক্রান্ত মিলবে ঢের বেশি।
পাঁচামী ঘিরে এখন সরকারের ‘কয়লা খনি’ নিয়ে প্রচারের ঢক্কানিনাদের দাপটে ব্রাত্য হয়েছে সিলিকোসিস। প্রমান, আক্রান্তদের সিংহভাগের ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চনা। আক্রান্তের মাত্র সিঁকিভাগের মিলেছে ক্ষতিপূরণ অর্থাৎ মোট ১৮৩ জন আক্রান্তের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ৪৮ জন। তাও আবার বহু হ্যাপা করে। ক্ষতিপূরণের দাবিতে হাঁপানি, কাশি, কাজের ক্ষমতা হারানো রোগীদের পর্যন্ত নামতে হয়েছে পথে। গ্রামে জোট বাঁধা এবং সেই জোট নিয়ে জেলাশাসকের দপ্তরে বিক্ষোভ দেখানোর পর মিলেছে ক্ষতিপূরণ। তাও হাতেগোনা কয়েকজনের। বাকিদের কবে মিলবে নিশ্চিত নন কেউই। জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘‘সিলিকোসিস আক্রান্তরা সকলেই এককালীন দু-লক্ষ টাকা ক্ষতিপুরনের দাবিদার।’’ কিন্তু আশ্চর্যের বীরভূম স্বাস্থ্য জেলার অধীন আক্রান্তদের সনাক্তকরনের দেড় বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও রোগীরা পাননি সেই ক্ষতিপূরণ। সিলিকোসিস কর্মসূচীতে যুক্ত এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘‘কেন ক্ষতিপূরনে দেরি জানা নেই। তবে অনেক কিছু কানে আসছে। দপ্তরের অধীনে ঘুঘুর বাসা বাঁধে নি তো? কমিশন কারবার চালু হয় নি তো ?’’ আধিকারিকের তীর্যক মন্তব্য ইঙ্গিত করেছে অনেক কিছুরই। সিলিকোসিস নিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সিএসআরএ’র কো-অর্ডিনেটর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি জানিয়েছেন, ‘‘আক্রান্তরা সকলেই হতদরিদ্র। এঁরা ক্ষতিপূরণ পেলেই ভাল।’’ সেই ক্ষতিপূরণের দিকেই তো তাকিয়ে রয়েছেন মারণ রোগে বিধ্বস্ত মিনু থেকে ফুলমনি, নিমাই বাগদি থেকে হজ মহম্মদ।
Comments :0