বই | পরিবেশ সঙ্কটের সমাজতাত্ত্বিক ভাষ্য
অর্ণব রায়
মুক্তধারা | ৪র্থ বর্ষ | ২ জুন ২০২৬
‘‘পরিবেশীয় সমাজতত্ত্ব’’ বইটিতে লেখক কৌশিক চট্টোপাধ্যায় শুরুতেই জানিয়েছেন, মূলত: সমাজতত্ত্বীয় শাখার দৃষ্টিতে পরিবেশ ও মানব বাস্তুবিদ্যার সমস্যাকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।যদিও পরিবেশ চর্চা এবং পরিবেশ আন্দোলনে যে সব বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে উঠে আসছে, তার থেকে বিশেষ আলাদা কোনও কথা নেই, তবে লেখক বর্তমানের বিভিন্ন পরিবেশ সমস্যাকে ও সমাজের সঙ্গে আন্তঃক্রিয়াকে সংক্ষেপে উপস্থাপিত করার প্রয়াস নিয়েছেন। পরিবেশ নিয়ে সমাজের কিছু অংশে উদ্বেগ অতীতেও ছিল। সূদূর অতীত থেকে সহজতর ও উন্নততর ভাবে বাঁচার ও স্থিতির তাগিদে মানুষ প্রকৃতিতে হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু বুঝতে চায়নি, সেও প্রকৃতির অংশ। পরিণামে এলাকাগত দূষণ ও স্থানীয় প্রকৃতির অস্তিত্ব বিরোধী সমস্যা তৈরর হয়েছে। গোষ্ঠী সমাজে কিছু নিয়ন্ত্রণ ছিল, বিগত কয়েক শতাব্দীতে সেসবের মোকাবিলায় রাষ্ট্র কিছু আইন, নিষেধ বলবৎ করেছে।
কিন্তু আজকের নিও- লিবারেল পুঁজির বিশ্বভ্রমণকালে আসল সমস্যা তা নয়। তা হলো,পুঁজির বল্গাহীন প্রকৃতি লুণ্ঠন এবং প্রকৃতির জৈব ও অজৈব সম্পদের দ্রুত ক্ষয়। ১৯৯২ তে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে পরিবেশ নিয়ে প্রথম ‘‘বসুন্ধরা সম্মেলনে’’ ফিদেল কাস্ত্রো ‘‘টুমরো ইজ টু লেট’’ শীর্ষক অনন্য বিশ্লেষণাত্মক বক্তব্যটিতে সতর্ক করেছিলেন, আজকের এমন নিও- লিবারেল আগ্রাসী বাজার সর্বস্বতা বহু দেশকে অনতিক্রম্য ঋণফাঁদে ফেলবে, সভ্যতার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তিনি রূপকার্থে বলেছিলেন, যেন বিশ্বায়ন নামের এক জাহাজ চলেছে, যার ডেকের ওপর কয়েকজনের জন্য চরম বিলাস ব্যবস্থা , খোলে ন্যূনতম উপাদানের অভাবগ্রস্ত গাদাগাদি করে থাকা অজস্র মানুষ -এমন তীব্র বৈষম্যপূর্ণ ও ভারসাম্যহীনের ভবিতব্য হিমশৈলের সঙ্গে ধাক্কায় পুরো ধ্বংস । মাত্র সাড়ে তিন দশক পরে , অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই পৃথিবী গ্রহের আয়ু আর কতদিন! কথা উঠেছে, আগে পাঁচবার প্রাকৃতিক কারণে গণবিলুপ্তি পেরিয়ে এবার কী তবে মানবসৃষ্ট কারণে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি আসন্ন !
বইটিতে 'পুঁজি, মুনাফা ও পরিবেশগত ঝুঁকি' উপশিরোনামে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় উল্লিখিত হয়েছে, মানুষের শ্রমে প্রাকৃতিক বস্তু যখন সম্পদ হয়ে ওঠে তখন তা শোষণের সামাজিক সম্পর্ককে গোপন করে। সমুদ্র সৈকত, জলাভূমি কৃষিজমি ক্রয় বিক্রয় হয়, কিন্তু তাতে প্রকৃতির উপস্থিতি আমরা খেয়াল করি না। আমাদের মনে পড়ে রক্তকরবী নাটকে রবীন্দ্রনাথ কী নিপুণভাবে বিধৃত করেছিলেন, খনিজ হীরের সম্পদে বলীয়ান শাসকের অত্যাচার এবং খনি শ্রমিকদের ওপর নির্মম শোষণের কথা। নিজ দেশের পরিবেশগত ঝুঁকিতে 'তাপ্পি' মারতে শিল্পে অগ্রসর ধনী দেশগুলি যত অর্থ বরাদ্দ করে উন্নয়নশীল দেশে তার তুলনায় সামান্য অর্থই বরাদ্দ হয়। । দেশে দেশে বিপুল গরীব লোকদের ভোগ অনেক কম, কিন্তু পরিবেশ সঙ্কটে তাদের ভোগান্তি অনেক বেশি। বায়ুদূষণ, জলদূষণ, সবুজ ধ্বংস, অরণ্য নিধন, প্রজাতি বিলুপ্তি, বর্জ্য ডাম্পিং, হিমবাহ গলন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রভৃতি উত্তোরোত্তর বেড়ে চলেছে। বিগত তিন দশকে পরের পর মারী, অতিমারী ঘটেছে। কার্বন পদচিহ্ন কমানোর জন্য ধনী দেশগুলি তাদের প্রধান দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে, ‘‘কনফারেন্স অব পার্টিজ’’ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক প্যানেল বিপদের কথা জানালেও পৃথিবীর জ্বর কমানোর লক্ষ্যে এগনো যাচ্ছে না। পৃথিবীতে জনপ্রতি সর্বাধিক কার্বন নির্গমনকারী দেশ আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি পুনর্নির্বাচিত হয়ে এসে বরং উল্টো পথে গিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্যারিস কনভেনশনের চুক্তি থেকে আমেরিকাকে কয়েক দিন আগে বার করে এনেছেন।
লেখক পরিবেশ নিয়ে বাস্তববাদী- নির্মাণবাদী বিতর্কের কথা এনেছেন। ‘ইকোসোসিওলজি’ তে এই দুই ধারার সংমিশ্রণের কথা বলা হয়, পরিবেশগত সচেতনতার সঙ্গে আর্থ-সামাজিক অবস্থানের সম্পর্ক আছে, কিন্তু পরিবেশগত সঙ্কটের নিজস্ব বাস্তবতাকে অনুধাবন করা আজ অনেক জরুরি। 'ইকোফেমিনিজম' নিয়ে আলোচনাটিতে অনেকগুলি বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরা হয়েছে। পরিবেশের ওপর আজ উদ্ধত ফিনান্স পুঁজি ও তার বিকাশ মডেলের যে নিপীড়ন তার সঙ্গে নারীত্বের ওপর প্রাচীন যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উদ্ধত পুরুষবাদের নির্যাতনের সাদৃশ্য রয়েছে, তা নারীবাদের ধারণা সঙ্গে যারা অনেকাংশে সহমত নন, তারাও স্বীকার করেন বৈকি। সাধারণভাবে উদ্বাস্তু নিয়ে আলোচনা রয়েছে, জলবায়ু উদ্বাস্তু নিয়ে এখানে আরও বিস্তৃত আলোচনা করলে ভালো হতো। উন্নয়নের লোভে শ্রমিকশ্রেনীকে বিভিন্ন পরিবেশ-বিরোধী উদ্যোগে জড়িয়ে নেওয়ার কথা গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হয়েছে। তবে, জলবায়ু পরিবর্তনকে জোর করে অস্বীকার করার জন্য বহু বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে , বই লেখা হচ্ছে - একে তথ্যের ভিত্তিতে চ্যালেঞ্জ করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
প্রযুক্তি ও পরিবেশ উপশিরোনামে আলোচনাটিতে আরও গভীরতা দরকার ছিল। প্রযুক্তি মানুষের বাহন যার সাহায্যে মানুষ প্রাচীনতম হাতিয়ার তৈরি থেকে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ন্যানোটেকনলজি , জৈবপ্রযুক্তি বিশেষত জেনেটিক্স, ক্লোনিং, মহাকাশ ইত্যাদিতে চমকপ্রদ কাজ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির নির্বাচন ও ব্যবহার সমাজ ও ক্ষমতা নির্ভর। এই সময়ের পরিবেশ সঙ্কট থেকে বেরোতে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ভূমিকা কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু তার জন্য কর্পোরেট মুনাফা কেন্দ্রিকতা থেকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান কে বার হতে হবে আগে। দুনিয়ার পুঁজিবাদীদের নেতা , নিজেও প্রযুক্তিবিদ, বিল গেটস ২০২১ একটি মোটা বইতে পরিবেশ সঙ্কটের প্রাযুক্তিক সমাধানে অনেক কথা লিখেছেন, কিন্তু সবই সম্ভাব্যতার হিসাবে। বিদ্যমান বিকারগ্রস্ত পুঁজিবাদকে রেখে এই তীব্র সংকটের সমাধান যে সম্ভব নয় তা তিনি উচ্চারণও করেননি। কর্পোরেট মুনাফার জন্য প্রযুক্তি উন্নয়নে যে বিনিয়োগ হয় তার চেয়ে অনেক কম বিনিয়োগ হয় পরিবেশের জন্য প্রযুক্তি গবেষণায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় — এই বাস্তবতাও তিনি আড়াল করেছেন।
মার্কস, গান্ধী সহ কয়েকজনের পরিবেশ ভাবনার কথা বইতে বলা হয়েছে। মানুষ ও পরিবেশের "বিপাকীয় ফাটল" চিহ্নিত করেছিলেন মার্কস সেই মধ্য ঊনবিংশ শতকেই। পুঁজিবাদ কিভাবে মানুষকে প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে, মানুষের শ্রমকে কিভাবে প্রকৃতির পরিকল্পনাহীন শোষণে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রকৃতিকে ‘‘বিজয়গর্ব’’ আত্মঘাতী, প্রকৃতি ‘‘প্রতিশোধ’’ নিয়ে আসবে -- তা মার্কস, এঙ্গেলস, দু’জনেই বহু জায়গায় সতর্ক করেছেন। বস্তুত, আগামী প্রজন্মের কথা ভেবে পরিবেশের ব্যবহারের কথা তাঁরা তখনই বলেছিলেন, ঋণ স্বীকার না করে তাকেই এখন "সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট" ধারণা হিসাবে বলা হয়। ‘ইকোলজি’র আজকের সঙ্কট প্রকৃতি ও মানবসমাজের সম্পর্কের যে দ্বান্দ্বিক উপলদ্ধি আজ ঘটাচ্ছে, মার্কস ও এঙ্গেলস সেই উপলদ্ধি দিয়েই শুরু করেছিলেন প্রকৃতিকে দেখতে। বিগত কয়েক দশক ধরে মার্কসবাদীরা শ্রেনী শোষণ ও সংগ্রামের প্রতি গুরুত্ব রেখেই তীব্র পরিবেশীয় সঙ্ককটের দ্বন্দ্বগুলির প্রতি নিয়মিত দৃষ্টি আকর্ষণ ও সাধ্যমত লড়াই করছেন। তাতে উল্লেখযোগ্য এক নাম - মার্কিন অর্থনীতিবিদ তথা সমাজতাত্ত্বিক জন বেলামী ফস্টার- এই অংশে তাঁর কথাও কিছু আছে।
বইয়ের ভাষা, বিশেষত বিভিন্ন তাত্ত্বিক আলোচনার পৃষ্ঠাগুলিতে, আরও সাবলীল হওয়ার দরকার ছিল। বহু বিষয় লেখক ছুঁয়ে গেছেন , তা একদিকে প্রশংসনীয় , অন্যদিকে আজকের জরুরি পরিবেশ সংকটের ‘ফোকাস’ বুঝতে সাধারণ পাঠকদের একটু অসুবিধা হতেও পারে। পরিবেশগত সমাজতত্ত্ব একটি উপশাখা হিসাবে নতুনই বলা যায়, বিগত শতকের সত্তর দশক থেকে এর যাত্রা মোটামুটি শুরু। বাংলা ভাষায় এই বিষয়ের ওপর বই চোখে পড়েনা। বই লেখার এমন একটি বিষয় নির্বাচন করার জন্য লেখকের সাধুবাদ প্রাপ্য।
পরিবেশীয় সমাজতত্ত্ব
কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। নবজাতক। এ-৬৪, কলেজ স্ট্রিট মার্কেট, কলকাতা— ৭০০ ০০৭। ৫৫০ টাকা।
Comments :0