জয়রাজ ভট্টাচার্য
শিশুরা হামাগুড়ি দিতে দিতে টলোমলো পায়ে কোনোমতে দাঁড়ায়, তারপর আস্তে আস্তে হাঁটতে শেখে। কোনও আদদামড়া মানুষ এর রিভার্স অ্যা কশন ঘটালে একটা দেখার মতো ব্যাপার ঘটে! কিন্তু প্রায়শই ঘটলে আমাদের হাসি চলে গিয়ে বিরক্তি আসে, রোজ ঘটলে বিরক্তি নয় ক্রুদ্ধ হই, সংকল্প করি পাড়ার ক্লাবের জেনারেল মিটিং ডেকে এর একটা বিহিত করতে হবে। রোজ রোজ এ কী কাণ্ড! পাড়ার বাচ্চাগুলো কী শিখবে!
কয়েকবছর আগেও এটা একটা চেনা দৃশ্যকল্প হতে পারতো পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও পাড়ার ক্ষেত্রে। চিত্রনাট্য লিখলে মোটের ওপর বিশ্বাসযোগ্য হতো। আজ আর হবে না। কারণ দু’-দশজন মানুষ, দু’-একটা ক্লাব, কিছু বখে যাওয়া ছেলেপুলে নয়, আমরা গোটা জাতি হিসাবে হামাগুড়ি দিচ্ছি, ন্যুব্জ হয়ে গেছি, মাজা ভেঙে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। গোটা রাজ্য রিভার্স গিয়ারে চলছে। অনেক লড়াই করে বিয়েতে পণপ্রথা অনেকদূর পর্যন্ত আটকানো গিয়েছিল। যে পণ নিতো, সেও খানিক লজ্জা পেতো। ওসব লুকিয়ে চুরিয়ে ঘটতো। খুব বেশি রকমের প্রতিপত্তি, বড়লোকি দেখাতে, এমনকি স্বীকৃত ঘুষখোরও খানিক দ্বিধা করতো। সামাজিক সম্মানহানির প্রশ্ন ছিলো। সেসব চুলোর দুয়ারে গেছে। অশিক্ষা, কুসংস্কার, জাতি বিদ্বেষ, নারী বিদ্বেষ প্রকাশ্যে উগড়ে দেওয়া, সমবেত ভাবে উদ্যাপন করা, নিজের ব্যক্তিগত বাসনার উদগ্র প্রকাশ এখন নতুন স্বাভাবিক!
রাজনীতির দায়, মানুষকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। কিছু অধিকার অর্জন করা গিয়েছিল, সেই অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ আরও কিছু স্বপ্নের জন্য লড়াই চালায়। কিন্তু কখনও কখনও সময় আসে অরাজনীতির। অরাজনীতি অধিকারের ধারণাকেই ভুলিয়ে দেয়। অরাজনীতি দিয়ে মনে করানো হয় দাস হয়ে থাকা স্বাভাবিক, নারীর দশটার মধ্যে ঘরে ঢুকে পড়া স্বাভাবিক, এলাকার ইস্কুলে স্থানীয় কাউন্সিলরের দাপাদাপি করা স্বাভাবিক, সিন্ডিকেট স্বাভাবিক, মন্ত্রী বিধায়কদের ঘুষ খাওয়া স্বাভাবিক। কন্যাশ্রী হোক, যুবশ্রী হোক, ডিএ হোক, কৃষকের নিজের ফসল ঘরে তোলা হোক, সবকিছুকেই তখন আর অধিকার নয়, কোনও এক প্রভুর দয়া মনে হয়। যেন প্রভু রুষ্ট হলে এইসব আর পাওয়া যাবে না, প্রভু রুষ্ট হলে চন্দননগরের মালেরা অ্যা কটিভ হয়ে যাবে, প্রভুকে সন্তুষ্ট করতে সন্দেশখালিতে পিঠে বানাতে হবে, রুখে দাঁড়ালে আরজি কর বা কামদুনি করে দেওয়া হবে। দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গে সমস্ত কিছু নষ্ট করে প্রভু আর দাসের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্টিত করা হয়েছে। মানুষের ইজ্জত আর ইমানের সাথে সওদা করেছে সরকার।
এর থেকে উদ্ধার পেতে গেলে, কোনও তুকতাক, কোনও মন্ত্রতন্ত্র কোনও উদ্ধারকর্তা মসীহার জন্য অপেক্ষা করলে চলবে না। অনন্ত অপেক্ষা করে চলি আমরা, এটাই চায় সরকার। এর থেকে উদ্ধার পেতে আমাদের ভরসা রাখতে হবে নিজেদের ওপর। শুধু ভরসা রাখলেই হবে না, নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। একক মানুষ নয়, সমষ্টিবদ্ধ মানুষই ইতিহাস বদলায়, ব্যবস্থা বদলায়। অরাজনীতিকে সরিয়ে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনাই এই মুহূর্তের প্রধান কাজ। ন্যুব্জ, নেশায় তলিয়ে যাওয়া, বাইকপটু যুবককে জানাতে হবে কাজ পাওয়া তার অধিকার, এবং কোনও চ্যাংপুঁটি নেতার হয়ে তোলাবাজি করাটা কাজ নয়। জানাতে হবে- দুর্বলকে হেনস্তা করার মধ্যে কোনও বাহাদুরি নেই, লজ্জা আছে। জানাতে হবে— সে নিজে কোনও রাজনৈতিক দলের মাতব্বরের দাস নয়, সেরকমই মেয়েরাও পুরুষের দাস নয়। অনেকগুলো সাধারণ শিক্ষাই নষ্ট হয়ে গেছে, তাই আবার করে লড়তে হবে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, জাতপাতের, ছোঁয়াছুঁয়ির বিরুদ্ধে। সত্য উচ্চারণের সাহস ফিরে পেতে আবার লড়তে হবে। আমাদের বাংলায় বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে ইংরেজ শাসনেই তা খানিক আটকানো গিয়েছিল, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাল্যবিবাহর বিরুদ্ধে লড়াইকে সামাজিক রাজনৈতিক লড়াইতে পরিণত করা যায়। ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা গড়ে ওঠে। কোথাও বাল্যবিবাহ বা পণপ্রথার ঘটনা জানতে পারলে, গণসংঠনগুলো দ্বিধাহীনভাবে হস্তক্ষেপ করতো। এলাকার ক্লাবগুলো পর্যন্ত এক্ষেত্রে তাদের প্রগতিশীল সামাজিক দায়িত্ব পালন করতো। এখন এ ঘটনার কথা জানতে পেরে রাজ্য মহিলা কমিশনের দ্বারস্থ হলে, তার চেয়ারপার্সনের নাম জানা যায়- লীনা গঙ্গোপাধ্যায়। এরচেয়ে বড় তামাশা আর কি হতে পারে! যিনি নাকি নিজে কোনও সামাজিক অন্যায়ের বিহিত করবেন, তিনি এবং তাঁর মালিকানাধীন কোম্পানির বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠছে প্রখ্যাত অভিনেতা লেখক রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ক্ষেত্রে শ্যুটিং চলাকালীন চুড়ান্ত অবহেলা, কোনোরকম সাবধানতা অবলম্বন না করার। রাহুলের মৃত্যুর পর যখন বাংলার প্রতিটা সচেতন মানুষ রাহুলের জন্য জাস্টিস চাইছে, ঠিক সেই মুহূর্তে সাদা চোখেই বোঝা যাচ্ছে এইসব লীনা গঙ্গোপাধ্যায়দের অপরাধপ্রবণ মানসিকতা। আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতেই তাদের সমস্ত চেষ্টা। এইরকম একজন মানুষকে মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন করল কে? যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অঙ্গুলিহেলন ছাড়া পাড়ার লাফিং ক্লাবের সভাপতি পর্যন্ত কে হবে ঠিক হয় না, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই জবাব দিতে হবে কোন যোগ্যতায় লীনা গঙ্গোপাধ্যায় রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন? রাজ্যে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, লীনা গঙ্গোপাধ্যায় যুগপৎ ছোট ঘটনা, তুচ্ছ ঘটনা, বিবৃতি দিয়ে ধর্ষকদের বরাভয় দিয়েছে। খুনি ধর্ষকরা বুঝে গেছে, এই রাজ্য তাদের ফ্রি স্পেস। বুঝে গেছে কড়ার নিয়ে লোভ আর হিংসার মন্দিরা ঠুনুক ঠুনুক বাজালে চুরির বখরা উপরি জুটবে। বামাল ধরা পড়লেও অসুবিধা নেই, ‘আমরা সবাই চোর’ প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাজ্যের সেলিব্রিটিদের বকলস ধরে রাস্তা হাঁটাবে মুখ্যমন্ত্রী। চোরেদের প্রতি সলিডারিটি জানিয়ে পৃথিবীর একমাত্র মিছিল করে, চেয়ার মুছে, পেজ থ্রি সেলিব্রিটি রাতারাতি বিদ্বজ্জন স্ট্যাটাস হাসিল করবে, এ আমাদের বাংলার নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চোরেদের পক্ষে মিছিল করা দল— তৃণমূল আর ধর্ষকদের পক্ষে মিছিল করা দল- বিজেপি’র মধ্যে কম্পিটিশন হচ্ছে, কে কত দ্রুত গতিতে দেশের অধঃপতন নিশ্চিত করতে পারে। এই সঙ্কট থেকে কোনও সুপারম্যান আমাদের উদ্ধার করবে না। নিজেদের বুঝে নিতে হবে লড়াইয়ের ব্যবস্থা, নিজেদের শিখে নিতে হবে ঘুরে দাঁড়াবার তরিকা। জ্যোতি বসু করণ থাপারকে দেওয়া ইন্টারভিউতে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছিলেন— ‘আমাদের প্রতিরোধের চরিত্র কেমন হবে, তা আমাদের ওপর নয়, উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকা শাসক বর্গের ওপর নির্ভর করছে।’ আজ যখন উল্টোদিকের সংগঠিত ক্রিমিনাল ফোর্স প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের ওপর হিংসাত্মক নিপীড়ন নামিয়ে আনছে, তখন মানুষকে সাথে নিয়ে, সেই আক্রমণের মোকাবিলা করতে হবে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে। দরিদ্রতম অংশের, সংখ্যালঘু অংশের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে বাম রাজনৈতিক দলগুলোকেই। আইন এবং আদালতের লড়াইয়ের পাশাপাশি, রাস্তার সংগ্রামকে দিশা দেওয়া এই মুহূর্তের দাবি। প্রতিবাদ থেকে প্রতিরোধ আর সংগ্রাম থেকে সংঘর্ষের দিকে যাওয়াই লাল ঝান্ডার কাছেই প্রত্যাশিত।
এই নির্বাচন, রাজ্যের দরিদ্র মানুষ নাগরিক হিসাবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে কিনা, সেই প্রশ্নকে সামনে রেখেই ঘটতে চলেছে। এই অন্যায্য প্রশ্নের ন্যায্য জবাব দেবে সবহারা মানুষ তার একমাত্র আশ্রয় লালঝাণ্ডাকে আঁকড়ে। যতবার পৃথিবীতে নিপীড়নের মাত্রা তীব্র হয়েছে, ততবার পৃথিবী ভেঙেছে দুটো গোষ্ঠীতে, বাকি সব ভেদাভেদ আলগা হয়ে গেছে। নিপীড়ক আর নিপীড়িত এই দুই গোষ্ঠী মুখোমুখি। নিপীড়করা সংখ্যায় কতিপয়, নিপীড়িতরাই সংখ্যায় ভারী। দলিত বলে, মুসলমান বলে, মজদুর বলে, নারী বলে, ট্রান্সজেন্ডার বলে, সমকামী বলে, গায়ের রং ভিন্ন বলে, জাত ভিন্ন বলে, ট্যাঁকের জোর কম বলে যাদের প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে অপমান করা হচ্ছে, সেই অপমানেই আমরা সমান হয়েছি। সেই অপমানের, ইজ্জত আর ইমান হারানোর প্রতিশোধ নিতে রাজ্যার নির্বাচনে জোট বেঁধেছে মানুষ। বদল আর বদলা দুটো আলাদা শব্দ নয় আর। আনিস, মইদুল, তমন্নার হত্যার বদলা চাই, সেই বদলা সম্ভব বদল ঘটলে। বদলা আর বদল আজ প্রতিশব্দ। দুটো শব্দেরই অর্থ- জাস্টিস। এই নির্বাচন লাল ঝান্ডার অনুকূলে বদল ঘটালেই সেই জাস্টিস, সেই ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব।
Comments :0