পবিত্র সরকার
বাংলা নববর্ষ প্রত্যেকবারই আসে, আর প্রত্যেক বারই বাঙালির জীবনে একটা বিরোধের জায়গায় খোঁচা দেয়। একটা বিরোধ বাঙালি হিন্দুদের নিয়ে। সেটা হলো, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে তারাও অন্য সকলের মতো ঔপনিবেশিকতায় আক্রান্ত আর আপ্লুত হয়েছে ব্রিটিশ শাসনে, এবং অর্থনীতিতে পাশ্চাত্য প্রণালী মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে, পয়লা জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বরের পশ্চিমি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে। তাদের স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত চলে বিলিতি ক্যালেন্ডারে, মাইনে, ছুটিছাটা সব হয় ওই ক্যালেন্ডার অনুসারে। তবে হিন্দু পার্বণের প্রচুর ছুটিও মূলত বাংলা হিন্দু পঞ্জিকার আক্রমণে, সেই ক্যালেন্ডার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। যেমন বিলিতি ক্যালেন্ডার বাংলা পঞ্জিকাকে সসম্ভ্রমে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, উপনয়ন, শুভযাত্রা, একাদশী অমাবস্যার উপবাস ইত্যাদির ওপর প্রশাসন চালানোর জন্যে। এবং নবমীতে লাউ খেতে আছে কি না আর চতুর্দশীতে টোম্যাটো। বিলিতি ক্যালেন্ডার জানে যে কবে পূর্ণিমা বা অমাবস্যা হবে, কিন্তু তাতে কী কী আচার-অনুষ্ঠান করতে হবে সধবা বা বিধবাদের, সে সম্বন্ধে কিছুই জানে না। ফলে বাঙালি হিন্দুদের দু’নৌকোয় পা দিয়ে চলতে হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডারকেও আমরা ছাড়তে পারি না, বাংলা পঞ্জিকাকেও না। যেমন বড়র মধ্যে পুজোর ছুটি, আর ছোটর মধ্যে জন্মাষ্টমী থেকে শিবরাত্রি সবই বাংলা পঞ্জিকা আমাদের জন্যে জমিয়ে রাখে। তাই ১লা জানুয়ারি আমাদের কাছে ‘নিউ ইয়ার’ বলে একটা হুল্লোড়ের দিন, কিন্তু তা আমাদের নববর্ষ হতে পারেনি। নববর্ষ আমাদের এক সাংস্কৃতিক মহোৎসবের দিন।
২
বাঙালি হিন্দু শুধু নয়, বাঙালি মুসলমানের কাছেও তাই। বাংলাদেশ সেটা অনেক বেশি করে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। আমার মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে বলেছে যে, তাদের হাদিসে বছরের প্রথম দিনকে এভাবে বিশেষভাবে পালনের কোনও নির্দেশ নেই। কিন্তু আমরা সকলে জানি যে, বাংলাদেশে এই পয়লা বৈশাখকে প্রচুর ধুমধাম করে, পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার চেয়ে অনেক শক্তিশালী ও বর্ণাঢ্য করে, উদ্যাপন করা হয়ে আসছে বহু বছর ধরে। সকালে ঢাকার রমনার বটতলায় ছায়ানটের বিশ্ববিখ্যাত গানের অনুষ্ঠান, আর বিকেলে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের (মূলত শিল্পকলা অনুষদের নেতৃত্বে ও পরিকল্পনায়) বিশাল উজ্জ্বল ও রূপসমৃদ্ধ মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা, যতদূর জানি, ইউনেস্কোর অস্থায়ী বিশ্ব-ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, তার তুলনা পশ্চিমবঙ্গে এখনও তৈরি হয়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তনে আমাদের একটু সংশয় হয়েছিল সব কিছু আবার পুরানো দিনের মতো চলবে কি না। কিন্তু মুখবই-ওয়াটসঅ্যায়পে দেখছি ঢাকাতে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বত্র, বিপুল উৎসাহে ও পরাক্রমে নববর্ষের উৎসব অনুষ্ঠানের রিহার্সাল চলেছে, কাজেই আমাদের মনে এই সংশয় নেই যে বাঙালির এই ‘ধর্মমুক্ত’ উৎসব আবার দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাভাষী অঞ্চলে নিজের জায়গায় ফিরে এসেছে। এ হলো সেই এক চমৎকার সাংস্কৃতিক সঞ্চার, যার কথা সংস্কৃতির নৃবিজ্ঞানীরা আমাদের শিখিযে থাকেন, যা ভাষা, ধর্ম সব কিছুকে অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলাম থেকে হিন্দুরাও কি কম কিছু নিয়েছে ? চিত্রকলা, স্থাপত্য, সঙ্গীত থেকে শুরু করে গরম মশলাপাতির রান্না, এমনকি সব ভারতীয়ের পরিচিত পাজামা পাঞ্জাবি পোশাক আমাদের দিয়েছে ইসলামের সংস্কৃতি। বাঙালির লুঙ্গি পর্যন্ত, তার নামটা মিয়ানমারি হোক আর যাই হোক। ফলে পঁচিশে বৈশাখের সঙ্গে পয়লা বৈশাখ হয়ে উঠেছে বাঙালির আর-এক প্রধান ধর্মমুক্ত উৎসব।
অবশ্যই আমাদের গ্রামীণ হালখাতা তো এখনও আছে। শহরেও তার সংক্রমণ মুছে যায়নি। বিশেষ করে দিশি অলঙ্কার, পোশাক, মিষ্টি আর মুদির দোকানে এখনও হালখাতার পরব হয়, যদিও, যতদূর মনে হয়, তার সঙ্কোচন ঘটছে। আগে ছাপানো গণেশ-চিহ্নিত চিঠিতে নিমন্ত্রণ আসত, বার্ষিক গ্রাহকেরা সন্ধেবেলায় দোকানে শরবত/নরমপানীয় আর মিষ্টির প্যাকেটে এবং গণেশ, লক্ষ্মীদেবী, ঠাকুর রামকৃষ্ণ-সারদা-বিবেকানন্দ, নেতাজী এমনকি রবীন্দ্রনাথের ছবি দেওয়া বাংলা ক্যালেন্ডারে আপ্যায়িত হতেন, এখনও নিশ্চয় হন। অক্ষয় তৃতীয়ার সঙ্গে ভাগাভাগি করে হলেও। দোকানে আগে আমপাতা আর কদম দিয়ে সাজানো হতো, হিন্দু দোকানে গণেশ পুজো হতো, তাও নিশ্চয়ই হয়, টুনিবালবের ঝালরের সঙ্গে। গ্রামে মায়েরা নদীতে স্নান করে এসে হাতপাখায় সেই নদীর জল ঢেলে আমাদের বাতাস করতেন, আমের পঞ্চপল্লবেরও ছিটে দিতেন, খালি গায়ে সেই জলকণার সুখ স্পর্শ আমাদের মনে আছে। ভুলেও গেছি আরও কত কী হতো। ভালো খাওয়া-দাওয়া, নতুন পোশাক— সে সব ভুলিনি।
কিন্তু সে সব পারিবারিক উদ্যাপনকে আড়াল করে এখন আরও অনেক বেশি বিনোদন ও প্রদর্শনধর্মী সাংস্কৃতিক নববর্ষ এসে ক্রমশ তার জায়গা নিচ্ছে। শহরে সকালবেলায় কোনও ক্লাবের উদ্যোগে এনসিসি-দীক্ষিত ছেলেমেয়েদের শোভাযাত্রা ও কুচকাওয়াজ দেখি, আবার তার সঙ্গে ট্রাকে গানের দলের দলবদ্ধ রবীন্দ্র বা নজরুল সঙ্গীতের সমস্বরও লক্ষ্য করি।
বস্তুতপক্ষে এই সব ব্যাপকতর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই এখন বাংলা নববর্ষের প্রধান স্মারকচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চলে, বাংলাদেশে হয়তো পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি করে। এমনকি বিদেশে—নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের গির্জা প্রাঙ্গণে, এমনকি ম্যাডিসন স্কোয়ারে। বন্ধুবর মহীতোষ তালুকদারের সৌজন্যে তারও তালিমের ছবি আমরা মুখবইয়ে দেখতে পাই। এ রকম নিশ্চয় ঘটে লন্ডনে ও ইংল্যান্ডের নানা প্রান্তে, অস্ট্রেলিয়ায়, হয়তো জাপানেও। তাতে বাংলাদেশের বন্ধুরা নেতৃত্ব দেন। ভারতের অন্যান্য বাঙালি বসতিঘন শহরে—দিল্লি, মুম্বই, হায়দরাবাদ বা ব্যাঙ্গালোরেও।
৩
ইংরেজি নববর্ষে একটা রীতি হলো, মধ্য রাত্রের গির্জার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে, ওরা যাকে বলে Ringing out the old, ringing in the new. মানে পুরানোকে বিদায় জানানো, নতুনকে অভ্যর্থনা করা। একটা পরিবর্তনের জন্য প্রত্যাশা করা। পশ্চিমে শীতের তুষারাচ্ছন্ন তীব্রতার মধ্যেই পুরানো বছর চলে যায়, নতুন বছর আসে। ওদের পৃথিবীতে শীত খানিকটা মৃত্যুর রূপক। বেশ কিছু পরে, এপ্রিলে হয়তো ওদেশে বসন্ত আসে, পৃথিবীতে প্রকৃতিতে নতুন জীবন নিয়ে। পশ্চিম দেশে সে পরিবর্তন দেখার মতো। পাতাঝরা গাছের শীর্ণ কালো ডাল কীভাবে সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই অন্তহীন ঝলমলে সবুজ পাতায় ভরে যায়।
আমাদের নববর্ষ খানিকটা বসন্তের গায়ে-গায়েই চলে আসে। আসে কালবৈশাখির ঝড় নিয়ে, বৃষ্টি নিয়ে, যা গাছপালাকে নবজীবন দেয়।
তাই আমরা এই নববর্ষের কাছে কী চাইব ? অনেক কিছু আছে চাইবার। একটা যুদ্ধহীন পৃথিবী চাইব, অন্তহীনভাবে এই চাওয়া আমাদের চলবে। ঘরের কাছেপিঠে দেশে একটা ভয়বিদ্বেষহীন কুসংস্কারহীন গণতান্ত্রিক দেশ চাইব, একটা দুর্নীতিহীন, বঞ্চনাহীন, মূঢ়তাহীন প্রতিবেশ চাইব। হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টানের আদান-প্রদানের যে সংস্কৃতি এই সব অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছে, এই উপমহাদেশে তাকে অস্বীকার করার বা ভাঙবার চেষ্টা তো এখনও বন্ধ হয়নি। এবারের নববর্ষ সেই চেষ্টার মুখে ছাই নিক্ষেপ করুক।
আমরা জানি, শুধু নিছক চাওয়াতেই বা ঘণ্টা থালা বাসন-বাজানোতেই থেমে গেলে হবে না। এবারের নববর্ষ আমাদের সামনে আরও কিছু করবার সুযোগ এনে সামনে ধরছে। নববর্ষ হোক, বা নির্বাচন হোক। দুটোই ‘ন’ দিয়ে। আর-একটা ‘ন’ দিয়ে আমরা যেন খুব জোরে ‘না’ বলতে পারি ঘৃণা, দুর্নীতি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ধর্ষণ আর যত দুষ্কর্মে প্রশ্রয় আর ব্যাপক অপশাসনের কারবারিদের।
শুধু নিছক চাওয়াতেই বা ঘণ্টা থালা বাসন-বাজানোতেই থেমে গেলে হবে না। এবারের নববর্ষ আমাদের সামনে আরও কিছু করবার সুযোগ এনে সামনে ধরছে। নববর্ষ হোক, বা নির্বাচন হোক। দুটোই ‘ন’ দিয়ে। আর-একটা ‘ন’ দিয়ে আমরা যেন খুব জোরে ‘না’ বলতে পারি ঘৃণা, দুর্নীতি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ধর্ষণ আর যত দুষ্কর্মে প্রশ্রয় আর ব্যাপক অপশাসনের কারবারিদের।
Comments :0