নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ থেকে শুরু করে এসআইআর, নির্বাচন পরিচালনা পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে বিরোধী দলসমূহের পক্ষ থেকে বারবার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের মনেও উদয় হয়েছে অবিশ্বাস আর সন্দেহ। কিন্তু কোনও জায়গা থেকেই এর কোনও গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য কোনও জবাব মেলেনি। বিশেষ করে জটিল থেকে জটিলতর প্রক্রিয়ায় এবং খেয়ালখুশি মতো ক্রমাগত পদ্ধতি বদল করে যে এসআইআর হচ্ছে তার বিধিবদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্নের অন্ত নেই। হাজার জটিলতা ও গোপন ছাঁকনি ব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে শুধু ১৩ কোটি ভারতীয়র নাম ছেঁটে ফেলা হয়নি, নাম তোলার জন্য প্রত্যেক নাগরিককে চূড়ান্ত হয়রানি করা হয়েছে। ভোটাধিকার রক্ষার জন্য গুচ্ছ গুচ্ছ নথি জোগাড় করতে কালঘাম ছুটেছে সাধারণ মানুষের। তাপরও ১৩ কোটি মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পাননি। একে আর যাই হোক উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যায় না।
নির্বাচন কমিশনের কাজের ধরনধারণ, অতি কেন্দ্রীকৃত অস্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় ভোটাধিকার দেবার চেয়ে ভোটাধিকার ছাঁটাইয়ে বেশি অগ্রাধিকার। আর এই জায়গাটাই সন্দেহের কেন্দ্র বিন্দুতে। সব বিরোধী দলই কার্যত একমত কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে গোপন বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। লক্ষ্য সর্বজনীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করা বা নির্বাচনে প্রকৃত জনমতের প্রকাশ নয় বরং শাসক দল বিজেপি-কে নির্বাচনে সুবিধা করে দেওয়া যাতে তাদের নির্বাচনে নিশ্চিত জয় হতে পারে। বস্তুত বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এ কাজ চলছে তুঘলকি কায়দায়। প্রচলিত প্রথা-পদ্ধতি বাতিল করে সংবিধান অস্বীকার করে, অবৈধ ও বেআইনি পথ অবলম্বন করা হয়েছে। এই গোটা ষড়যন্ত্রটাই ফাঁস করে দিয়েছে একটি জাতীয় দৈনিক।
এখন জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে এতদিন বিরোধীরা যে সব অভিযোগ করেছে, ব্যক্তিগতভাবে অনেকে যে প্রশ্ন তুলেছেন তা অসত্য ছিল না। দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি যেখান থেকে শুরু হয় সেই নির্বাচন কমিশনই পরিচালিত হচ্ছে চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক পথে স্বৈরাচারী কায়দায়। দুই কমিশনারকে উপেক্ষা করে তাঁদের অন্ধকারে রেখে একা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার স্বেচ্ছাচারী পথে কমিশন চালাচ্ছেন নিজের মরজিমাফিক। প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর অগোচরে বা সবুজ সংকেত ছাড়া এমন দুঃসাহস কেউ দেখাতে পারে না। আসলে ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্ত লোককে কমিশনে নিযুক্ত করার জন্যই আইন বদলে নিয়োগ কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে মোদীর অনুগত অন্য মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে যাতে উদ্দেশ্য নিয়েই জ্ঞানেশ কুমার দায়িত্ব পালন করছেন। একাজে অন্য দুই কমিশনার আপত্তি তোলায় তাদের এড়িয়ে নিজেই অবৈধ ও বেআইনি পথে সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই এমন ব্যক্তির পদে থাকার নৈতিক ও আইনি অধিকার নেই। তাঁর অপসারণেই সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা পাবে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরানোর জন্য, মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য মোদীকৃত আইন বদলে পুরানো ব্যবস্থা ফেরাতে হবে। প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ কমিশনের অংশ করতে হবে। তা না হলে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র প্রহসনে পরিণত হবে। বিশ্বের দরবারে হবে বিদ্রূপ আর হাসির খোরাক। মোদীদের ক্ষমতার লালসা পূরণের স্বার্থে দেশের এমন সর্বনাশ কোনোমতেই হতে দেওয়া যাবে না।
Editorial
হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে
×
Comments :0