এম এ বেবি
“যেখানে ওরা বই পোড়ায়, সেখানে ওরা শেষ পর্যন্ত মানুষকেও পোড়াবে।”
জার্মান কবি ও নাট্যকার হেনরিখ হাইনের ১৮২৩ সালের নাটক ‘আলমানসর’ থেকে নেওয়া এই বহুল প্রচারিত উদ্ধৃতিটি মধ্য বার্লিনের বেবেলপ্লাৎস স্কোয়ারের বিবলিওথেক স্মারকে খোদাই করা রয়েছে। এটি ১৯৩৩ সালের ১০মে নাৎসিদের সেই বই পোড়ানোর ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন জার্মান স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সদস্যরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা ২৫হাজারেরও বেশি বই পুড়িয়ে নষ্ট করেছিল, যেগুলোকে তারা "জার্মান-বিরোধী" বলে গণ্য করেছিল। নাৎসিদের রাষ্ট্র-সমর্থিত সেন্সরশিপ এবং সাংস্কৃতিক ধ্বংসকার্য অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মার্ক্সবাদী এবং কমিউনিস্ট সাহিত্য। কার্ল মার্ক্সের বইসহ এবং ৪হাজারেরও বেশি অন্যান্য বই সহ হাইনের রচনাগুলিও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল নাৎসিদের সেই ধংসকার্যে।
পশ্চিমবঙ্গে শারদোৎসবের সময় সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বামপন্থী সংগঠনগুলির পরিচালিত বইয়ের স্টলগুলিতে আক্রমণ করার জন্য গুন্ডা ও দুষ্কৃতীদের সাথে বুলডোজার ও সশস্ত্র পুলিশবাহিনীকে পাঠিয়ে, বিজেপি-আরএসএস ১৯৩০-এর দশকে তাদের নাৎসি পূর্বপুরুষদের কুখ্যাত কাণ্ডেরই পুনরাবৃত্তি করেছে। বিজেপি শাসনের অধীনে যাওয়ার পর প্রথম শারদোৎসবে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী ও প্রগতিশীল বইয়ের স্টলগুলিকে উচ্ছেদ প্রচেষ্টা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই আক্রমণগুলি প্রকাশ্যে সমবেতভাবে বইপাঠ, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের চ্যালেঞ্জ করে এমন ধারণা, চিন্তাভাবনা ছুঁড়ে দেওয়ার বাংলার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল ভিত্তিকে আঘাত করে।
আক্রমণের মুখে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
বাম দল এবং অন্যান্য সংগঠন দ্বারা পরিচালিত বইয়ের স্টলগুলি বাংলার উৎসবের মরশুমের কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ১৯৫০-এর দশকের একটি ঐতিহ্য, যখন কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ প্রথম উৎসব উপলক্ষে বইয়ের স্টল স্থাপন করেছিলেন। রাজনৈতিক সাহিত্য, প্রগতিশীল লেখা, ইতিহাস ও সমাজের ওপর বই এবং মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদদের রচনাসংবলিত বইয়ের স্টলগুলি পুজোর সময় উৎসব এবং আনুষঙ্গিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং সমগ্র রাজ্যের মানুষ এই বইয়ের স্টলগুলি ঘুরে দেখার অপেক্ষায় থাকেন। এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকেই বিজেপি এবং আরএসএস রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং গুন্ডামির মাধ্যমে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।
হিন্দুত্ববাদী ব্রিগেডের মূল লক্ষ্য হলো এই স্টলগুলি উৎসবের সময় সাধারণ মানুষের জন্য যে সুযোগ তৈরি করে দেয়—কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক আঁতাত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া জগতের ঠেলে দেওয়া আধিপত্যশীল বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করে এমন ধ্যানধারণার নিয়ে চর্চা, আলাপ-আলোচনা, রাজনৈতিক বিনিময় এবং যোগাযোগের সুযোগ, সেগুলিকে কোনঠাসা করে ধংস করা। এই বইয়ের স্টলগুলি রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক চিন্তা ও ধারণাগুলিকে বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রেণিকক্ষ এবং ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বাইরে সর্বসাধারণের যাতায়াতের জায়গায়, জনপরিসরে নিয়ে যায়। পৌরসভা নিয়মকানুন ও অনুমতির অজুহাতে, রাষ্ট্রীয় ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে বইয়ের স্টলে রাজনৈতিক ভয়ভীতি প্রদর্শন হলো জনপরিসরে স্বাধীন চিন্তা ও ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সমাজের সাংস্কৃতিক জীবনে অংশগ্রহণ করার অধিকারকে দমন করার একটি চেষ্টা। এর উদ্দেশ্য হলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শগত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে এমন স্বাধীন চিন্তাধারাকে স্তব্ধ করা এবং বলপ্রয়োগ করে শাসকদের বয়ান চাপিয়ে দেওয়া।
ফারেনহাইট ৪৫১, যোসেফ গোয়েবলস এবং শুভেন্দু অধিকারী
ফ্রঁসোয়া ত্রুফোর ১৯৬৬ সালের চলচ্চিত্র ‘ফারেনহাইট ৪৫১’, যা রে ব্র্যাডব্যারির একই নামের একটি উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, এমন একটি কর্তৃত্ববাদী সমাজের কল্পনা করে যারা বই ধ্বংস করতে চায়, কারণ তারা বইয়ের উত্থাপিত প্রশ্নগুলিকে ভয় পায়। সেখানে বই নিষিদ্ধ, দমকলকর্মীদের কাজ বই পোড়ানো, মানুষকে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে নিরুৎসাহিত করা হয়, এবং তাদের একটি সংকীর্ণ পরিসরের অনুমোদিত চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং স্বাধীন চিন্তাকে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী হিসাবে দেখতে বাধ্য করা হয়। এই সমাজে বই বিপজ্জনক, কারণ তারা বিশ্বের বিকল্প বিবরণ ধারণ করে এবং পাঠকদের বিদ্যমান ব্যবস্থার বিকল্প কল্পনা করতে সক্ষম করে।
নাৎসিদের বই পোড়ানোর লক্ষ্য ছিল সেইসব কাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে নির্মূল করা যা তাদের শাসনব্যবস্থার উপযোগী বিশ্ববীক্ষার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হতো। বই পোড়ানোর সময় বার্লিন থেকে প্রদত্ত ভাষণে নাৎসি পার্টি ও রাইখ প্রচার মন্ত্রী যোসেফ গোয়েবলস "জার্মান-বিরোধী চেতনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ"-এর প্রশংসা করেন এবং যে লেখকদের বই পোড়ানো হচ্ছিল তাঁদের "বুদ্ধিবৃত্তিক নোংরামি" এবং "ইহুদি অ্যাসফল্ট সাহিত্যিক" বলে অভিহিত করেন। ঘটনাস্থলে নাংসি সমর্থকদের জড়ো করা প্ল্যাকার্ডগুলিতে জার্মান ভাষা ও সাহিত্যকে শুদ্ধ করার এবং ঐতিহ্যবাহী জার্মান মূল্যবোধকে নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বামপন্থী বইয়ের স্টলগুলিতে আক্রমণের ঘৃণ্য ঘটনার পক্ষে সওয়াল করার সময় যে কথাগুলি বলেছিলেন, তা আশ্চর্যজনকভাবে একই রকম শোনায়। তিনি ঘোষণা করেছেন যে কাউকে "দেশবিরোধী বা সনাতন-বিরোধী লেখা" প্রকাশ করতে দেওয়া হবে না এবং বইয়ের স্টল পরিচালনাকারী বামপন্থী স্বেচ্ছাসেবক ও তাঁদের পক্ষে থাকা মানুষজনকে ‘আরশোলা’, ‘ছারপোকা’, ‘দিমাগি নকশাল’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ ইত্যাদির সাথে তুলনা করেছেন, এবং নির্মূল করার কথা বলেছেন। তিনি গত সেপ্টেম্বরে রাজ্য বিধানসভার অধিবেশনেই এই আক্রমণের সুর বেঁধে দিয়েছিলেন, যখন তিনি পুজো কমিটিগুলিকে মণ্ডপের বাইরে সিপিআই(এম)’র বইয়ের স্টল বসতে না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
সংঘ পরিবারের বই ধ্বংস এবং বই বিক্রয়কারী স্টল পরিচালকদের ওপর এই আক্রমণ আসলে চিন্তার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি তাদের শত্রুতামূলক মনোভাবেরই একটি ধারাবাহিকতা। এই প্রসঙ্গে এম এফ হুসেনের প্রদর্শনী এবং সহমত’এর 'হাম সব অযোধ্যা'-র ওপর তাদের আক্রমণের কথা মনে পড়ে। ত্রিপুরায় লেনিনের মূর্তি ভাঙা এবং সম্প্রতি রানিগঞ্জে রাহুল সাংকৃত্যায়নের মূর্তি ভাঙা ও অপসারণ করা একই ছকের অংশ ছিল। শারদোৎসবের সময় যেখানে চোরবাগানে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার অপর্যাপ্ত ব্যবস্থার কারণে শিশুসহ ১৯জন প্রাণ হারিয়েছেন, সেখানে বই ধ্বংস করতে যাদবপুরে বিপুল পুলিশবাহিনী মোতায়েনের ঘটনা বিজেপি সরকারের অগ্রাধিকারকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে।
হুমকির উত্তর হলো আরও বেশি বই
‘ফারেনহাইট ৪৫১’-তে বই সংরক্ষণ করা ছিল একটি প্রতিরোধমূলক প্রক্রিয়া, এমন একটি সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কাজ যা সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর হয়ে আক্রমণ নামিয়েছিল। আজকের বাংলায়, যারা বইয়ের স্টল ধ্বংস করে তাদের জন্য সমুচিত জবাব হলো, বই রক্ষা করা, বইয়ের স্টল পুনর্নির্মাণ করা এবং বইয়ের প্রচার চালু রাখা। আর আমাদের কমরেডরা একাজ করতে সফল হয়েছেন।
যাদবপুর ৮বি স্টলের মতো অনেক জায়গায়, সাহসী জনপ্রতিরোধ রাষ্ট্রযন্ত্রকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। অভূতপূর্ব ও অতুলনীয় আক্রমণ সত্ত্বেও, এ বছর শারদোৎসবে পশ্চিমবঙ্গে গত বছরের তুলনায় আরও ১০০টি বেশি বইয়ের স্টল তৈরি করা হয়েছিল এবং দুষ্কৃতীদের দ্বারা ভেঙে ফেলা প্রায় সবকটি বইয়ের স্টল পরদিনই আবার চালু হয়ে গিয়েছিল। বই বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধির খবর এটিই ইঙ্গিত দেয় যে বাম ও প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেওয়ার বদলে, এই আক্রমণগুলি বইয়ের স্টলের প্রতি পাঠকদের আরও বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, আগ্রহ বৃদ্ধি করেছে।
যদিও এই বইয়ের স্টলগুলি ছিল একটি সাধারণ কাঠামো, কিন্তু তাহলেও এই স্টলগুলিই পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন পথচারীকে একটি বই তুলে নিতে, কোনও বহুলপ্রচারিত বয়ানকে প্রশ্ন করতে, একটি অপরিচিত ইতিহাস জানতে বা খুঁজে পেতে কিংবা এমন একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত হতে সাহায্য করে যা তাঁরা হয়তো অন্যথায় কখনোই পেতেন না। হাজার হাজার মানুষ এইভাবে এই ধরনের স্টলের মাধ্যমে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে পরিচিত হন। এই কারণেই ব্রিটিশরা পরাধীন ভারতে আমাদের বই বাজেয়াপ্ত করেছিল এবং আমাদের বইয়ের দোকান বন্ধ করে দিয়েছিল, এবং এই কারণেই আরএসএস এখনও একই কাজ করার চেষ্টা করছে।
ফ্যাসিবাদী সংঘ ব্রিগেড এবং তাদের বয়ান চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা যে বইগুলি পড়ি, যে ধারণাগুলিকে আমরা ধারণ করি এবং মানুষের ঐক্যকে জয়লাভ করতেই হবে। আমাদের দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ এর ওপরেই নির্ভর করছে।
Comments :0