প্রতিবারের মতো এবারও শারদোৎসবে বইয়ের স্টলে শুধু মার্কস এঙ্গেলসের বই নয়, ভারতের ও বাংলার মনীষীদের লেখা এবং এদেশের সমাজ সভ্যতা সংক্রান্ত বই নিয়েই বসবেন সিপিআই(এম) কর্মীরা। তাঁদের প্রগতিশীল বইয়ের স্টলকে বিজেপি নেতারা যেভাবে ‘বিদেশী সংস্কৃতি’ বলে আক্রমণের নিশানা করেছে, তাকে কুশিক্ষার প্রকাশ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বামপন্থীরা।
শারদোৎসবের বইয়ের স্টলগুলিতে যে প্রকাশনা সংস্থার বহু বই বিক্রি হয় সেই ন্যাশনাল বুক এজেন্সির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তালিকায় বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র সহ অনেকেরই বই থাকছে। এইবছর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম সার্ধবশতবর্ষকে সামনে রেখে এনবিএ প্রকাশ করতে চলেছে তাঁর রচিত ছোটগল্প সংকলন এবং কিশোর গল্পসংকলন। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের পুণর্মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশিত হবে।
স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী দুর্গাপুজো না লিখলে, শারদোৎসব লেখা থাকলে বুকস্টল করতে না দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, বিজেপি’র নেতা মন্ত্রীরা আরেক ধাপ এগিয়ে স্টল ভাঙচুরের হুমকি দিয়েছেন। সিপিআই(এম)’র বুক স্টলে বিবেকানন্দ সহ ‘হিন্দু’ মনীষীদের বই কেন থাকে না তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম তাঁদের অজ্ঞতাকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, যারা বই পড়া দূরের কথা, হাতে নিয়েও দেখে না তারা জানবে কী করে আমাদের বুকস্টলে কী কী বই বিক্রি হয়? বিবেকানন্দ সহ দেশ-বিদেশের বহু মনীষীর লেখা এবং তাঁদের সম্পর্কিত বই স্টলে বরাবরই বিক্রি হয়। কিন্তু কার বইয়ের স্টলে কোন বই থাকবে সেটা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার বিজেপি’কে কে দিল?
এবারের শারদোৎসবের আগে ‘গোরা’ উপন্যাসের পুনঃমুদ্রণ করছে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড। সঙ্গে ‘মার্কসবাদীদের দৃষ্টিতে স্বামী বিবেবকানন্দ’, ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ সম্পাদিত আদি শঙ্করাচার্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ সহ ভারতীয় ষড়দর্শন সংক্রান্ত একাধিক বই চলতি বছরের শারোদৎসবে এনবিএ’র উদ্যোগে পুনঃমুদ্রিত হতে চলেছে। রাজ্যজুড়ে পাঁচশোর বেশি বই বিপণি স্টলে ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং নয়া-ফ্যাসিবাদী শক্তির মোকাবিলায় প্রগতিশীল ভাবনার বই বিক্রি হবে। এর জন্য কমবেশি ২০ থেকে ২২ টি বই নতুন করে মুদ্রিত হচ্ছে। ‘বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাকে মাথায় রেখে যে যে বই আজকের বাংলার পাঠকদের পড়া প্রয়োজন, যে ধরনের বই বাংলার পাঠকের পড়াশোনার অভ্যাসের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের সমাজ ও ইতিহাসকে দেখার চোখ তৈরি করে সেই ধরনের বই এবারের শারদোৎসবের বুক স্টলেও দেখা যাবে।’ জানিয়েছে এনবিএ’র কর্তৃপক্ষ।
তাঁরা বলেছেন, যারা বলছেন যে ভারতীয় মনীষীদের সম্পর্কিত বই থাকে না, তাঁরা আমাদের প্রকাশিত বই কখনো হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেননি। আজ নয় প্রায় ১০-১২ বছর আগে এনবিএ কর্তৃক প্রকাশিত বই, ‘মার্কসবাদীদের দৃষ্টিতে স্বামী বিবেকানন্দ’। আজও প্রতি বছর বইয়ের স্টলগুলি থেকে পাঠকরা তা সংগ্রহ করেন। ভারতীয় ষড়দর্শন নিয়ে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বই, সুকুমারী ভট্টাচার্যর বই, বাল্মীকির রামায়ণ ফিরে দেখা, ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ সম্পাদিত ‘আদি শঙ্করাচার্য ও অন্যান্য’র মতো বইও এনবিএ প্রকাশ করেছে। এইবছর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম সার্ধবশতবর্ষকে সামনে রেখে এনবিএ প্রকাশ করতে তাঁর রচিত ছোটগল্প সংকলন এবং কিশোর গল্পসংকলন। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য কাউন্ট অব মন্টেক্রিস্টো, আঙ্কল টমস্ কেবিন বা অলিভার টুইস্ট’র মতো আন্তর্জার্তিক সাহিত্যের বাংলা অনুবাদও প্রকাশিত হতে চলেছে।
এই প্রসঙ্গে সিপিআই(এম)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘বামফ্রন্ট সরকারের সময় থেকেই আমাদের স্টলের বাইরে প্রগতিশীল বই বিক্রয় কেন্দ্র লেখা হয়ে আসছে। পুজোর সময় বহু সংস্থা নিজেদের স্টল দেয় এবং সেই সমস্ত স্টলের বাইরে সংস্থার কর্মকর্তারা নিজেদের মতো করেই স্টলের শিরোনাম লেখেন। আরএসএস’এর সংস্থাগুলিও সেইভাবেই স্টল দেয়। এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সমস্যা কেন হচ্ছে সেটাই তো আশ্চর্যের। ওদের সমস্যা আসলে মুক্তচিন্তার প্রসারে। বইকে ওরা ভয় পায়। ভারতীয় দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাসকে প্রকৃত অর্থে মানুষের কাছে যাতে পৌঁছাতে না পারে সেইজন্যেই ওদের মরিয়া চেষ্টা।’’
তিনি আরও বলেন, ‘মার্কসীয় সাহিত্য’র পাশাপাশি স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস সংক্রান্ত বই থেকে আরম্ভ করে দেশ–বিদেশের সাহিত্য, শিশু-কিশোরদের উপযোগী বই, রবীন্দ্রনাথ, অক্ষয় দত্তের বইও বিক্রি হয় আমাদের বুকস্টলে। আসলে শারদ শুনলে মুখ্যমন্ত্রীর নারদ বা সারদা মনে পড়ে যায়। সেই জন্যই হয়ত এত রাগ!
NBA is reprinting various books
শারদোৎসবে মুক্তচিন্তার প্রসারে বিভিন্ন বইয়ের পুণর্মুদ্রণ করছে এনবিএ
×
Comments :0