Editorial

১২ বছরে প্রথম

সম্পাদকীয় বিভাগ

নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেছে। চরম হতাশা এবং অনিশ্চয়তায় অন্তত ২২ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়া পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা গ্রহণ হয়েছে। মোদী সরকারের পক্ষ থেকে কারও মুখে কোন অনুতাপ, অনুশোচনা লক্ষ্য করা যায়নি। শিক্ষাক্ষেত্রে এত বড় বিপর্যয়, এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর বিপন্নতা অনুধাবন করে ন্যূনতম দায় গ্রহণেও এগিয়ে আসেনি কেউ। প্রধানমন্ত্রী তো বহু দূরের কথা, শিক্ষা মন্ত্রীও প্রয়োজন বোধ করেননি লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে তাদের আশ্বস্ত করার। শাসন ক্ষমতার চূড়ায় বসে তাদের দম্ভ এতটাই প্রকট হয়েছে যে দেশের আগামী প্রজন্মের এই দুঃসময়ে তাঁদের হৃদয় এতটুকুও দোলা দেয়নি। হয়তো নিজেদের পরিবারের ছেলেমেয়েরা এসব সমস্যার ত্রিসীমানায় থাকে না বলেই তাদের বিশেষ মাথাব্যথা হয় না। কেন্দ্রীয় নেতা মন্ত্রীদের বেশিরভাগের পরিবারের ছেলেমেয়েরাই বিদেশে পড়াশুনা করে। তাই দেশে প্রশ্ন ফাঁস হলে বা শিক্ষা ব্যবস্থা তলিয়ে গেলেও তাদের কিছু আসে যায় না।
কিন্তু যাদের সত্যি সত্যিই অনেক কিছু যায় আসে সেই ছাত্র-যুব সমাজ তো বসে থাকতে পারে না। তারা ককরোজ জনতা পার্টির আহ্বানে ধাপে ধাপে প্রতিবাদে শামিল হতে থাকে। এক মাস আগে দিল্লির যন্ত্রর মন্তরে শুরু হয় অনির্দিষ্টকালের অবস্থান বিক্ষোভ। কয়েকদিন পর তাতে যোগ দেন সোনাম ওয়াঙচুক। ছাত্র-যুবদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ধরনা মঞ্চেই তিনি শুরু করেন আমরণ অনশন। তাঁর সাথে যোগ দেয় অন্য ছাত্রছাত্রীরাও। যত দিন গেছে জনসমাগম এবং সমর্থন-সংহতি বেড়েছে। মোদী সরকার টানা উপেক্ষা করে গেছে। এরই মধ্যে ডাক দেওয়া হয় সংসদের বাদল অধিবেশনের প্রথম দিন সংসদ অভিযানের। তার আগেই আচমকা অমিত শাহ’র পুলিশ অতি সক্রিয় হয়ে অনশনরত ওয়াঙচুককে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে কার্যত বন্দি করে রাখে। এই ঘটনা আগুনে ঘি ঢালার মতো পরিস্থিতি‍‌ তৈরি করে। গোটা দেশে শুধু ছাত্র-যুব নয়, সমস্ত অংশের মানুষের মধ্যেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যন্তর মন্তরে ভিড় অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। সংসদ অভিযান যে জনজোয়ারে ভাসতে পারে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত এই জনস্রোত। তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো যারা কোনোদিন এমন প্রতিবাদ-বিক্ষোভে অংশ নেয়নি তারাই বেশি বেশি করে ভিড় জমাচ্ছে যন্তর মন্তরে।
সরকার মোটামুটি আন্দাজ করেছে অভিযান সব হিসাব ছাড়িয়ে যাবে। তাই তাকে বরবাদ করার জন্য যা যা করণীয় সব ব্যবস্থা করেছে। নৃশংসতা-বর্বরতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রক্তে লাল করেছে দিল্লির রাজপথ। নিষ্পাপ ছাত্রছাত্রীদের মেরেছে দাগী অপরাধী, গুন্ডা-সমাজবিরোধী ও সন্ত্রাসবাদীদের মতো। কিন্তু দমাতে পারনি। মার খেয়ে রক্ত ঝরিয়ে, লুটিয়ে পড়ে‍‌ও তারা রাস্তা ছা‍ড়েনি। লড়াই করে গেছে শেষ পর্যন্ত।
এতদিন এই প্রসঙ্গে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি দেশের অজৈবিক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। কোন গ্রহে তিনি বিরাজ করছিলেন তিনি বলতে পারবেন না। রাজধানীর রাজপথে দেশের নব যৌবনের জোয়ারকে স্তব্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে আচমকা কোন মহাবিশ্ব থেকে আবির্ভাব হয়ে মোদী প্রথম উপলব্ধি করলেন প্রশ্ন ফাঁস ঘোরতর পাপ। অপরাধীদের সাজা হওয়া দরকার। এই না হলে ৫৬ ইঞ্চির বিশ্ব গুরু।
হিসেব করে দেখা গেছে ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১৫২টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। তাতে অন্তত ১০ কোটি ছাত্র উদ্বেগ, অনিশ্চিয়তা ও হতাশার শিক্ষার হয়েছেন। লক্ষ্যণীয় এই প্রশ্ন ফাঁসের বেশিরভাগটাই হয়েছে উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশে, অর্থাৎ মোদীর ডাবল ইঞ্জিনের রাজ্যে। গত ১২ বছরে এত কিছু ঘটে যাবার পরও মোদীকে কোনোদিন একটি শব্দও উচ্চারণ করতে দেখা যায়নি। আজ তিনি প্রথম উপলব্ধি করলেন এটা নাকি ঘোর পাপ। এটা কি ইচ্ছাকৃত নীরবতা নাকি নির্বোধের অহঙ্কার অথবা ক্ষমতার ঔদ্ধত্য।

Comments :0

Login to leave a comment