রামশঙ্কর চক্রবর্ত্তী: তমলুক
হলদিয়া পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পাঞ্চল। বামফ্রন্টের সরকার হলদিয়াকে দেশের সবথেকে উন্নত শিল্পাঞ্চলে পরিনত করার যাবতীয় পরিকল্পনা করে পরিকাঠামো গড়ে তুলেছিল। বন্দর, পেট্রোরসায়ন, আয়রন সহ সহকারী শতাধিক কারখানা তাদের ব্যবসায়িক পরিধি বিস্তারে সরকারি সহায়তা পাওয়ার ফলে ত্বরান্বিত হয় শিল্পাঞ্চলের গতি। কিন্তু তৃনমূল ক্ষমতায় আসার পর অবস্থান কোথায় হলদিয়ার?
ন্যায্য মজুরি, সময়মতো সিওডি, স্থায়ীকরন, সামাজিক সুরক্ষা সহ একাধিক অধিকার খর্ব হয়েছে শ্রমিকদের, কারখানাগুলিতে দেদার তোলাবাজির বলে বন্ধ হয়েছে ৫০টির বেশী কারখানা, বন্দরের নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় গুরুত্ব হারাচ্ছে হলদিয়া বন্দর, সেইসঙ্গে অবশিষ্ট থাকা কারখানাগুলির কর্তৃপক্ষের সাথে তৃণমূলী যোগসাজসে শ্রমিকদের জোর করে অবসর গ্রহণে বাধ্য করানো হচ্ছে। আর একাজে কারখানা কর্তৃপক্ষ সুবিধা পেয়েছে শ্রমকোডের। ফলে এখানে জোট বেঁধেছে তৃনমূল ও বিজেপির শ্রমিক সংগঠন। এদের কাছে গুরুত্ব নেই কোনও শ্রমিকের। হলদিয়াজুড়ে এখন ডেইলি সাপ্লাই ওয়ার্কার নিয়োগ করে কাজ চলছে। স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা একেবারেই কম। ফলে কয়েকমাসের চুক্তিভিত্তিক ডেইলি সাপ্লাই ওয়ার্কার নিয়োগ করলে অনেক কম মজুরিতে যেমন শ্রমিক মেলে পাশাপাশি সুযোগ সুবিধার দাবি শ্রমিকরা করতে পারেনা। বরং শ্রমিক নিয়োগ করা হয় টাকা নিয়ে। এটা করে তৃনমূল ও বিজেপি।
হলদিয়ার মানুষজনের ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। এখানকার মানুষজন মনে করেন একটা তৈরি শিল্পাঞ্চল শুধুমাত্র সরকারি উদাসীনতা আর তোলাবাজির কারনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আর এই ক্ষোভ তৃনমূল সত্যিই উপলব্ধি করেছে। এজন্য হলদিয়া পৌরসভার নির্বাচন হয়নি দীর্ঘ কয়েকবছর।
এবার আসা যাক কারখানার নির্বাচনের প্রসঙ্গে। যেহেতু হলদিয়ার মানুষজনের ক্ষোভ রয়েছে সেক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে তৃনমূল গুরুত্ব দিয়েছে সর্বাধিক। প্রথমত স্থানীয় বাসিন্দাদের কাজ দেওয়া হচ্ছেনা। দ্বিতীয়ত ছাঁটাই এর ভয় দেখিয়ে রাখা। এতে নির্বাচনের দাবির পাশাপাশি নিজেদের পেশাগত বিভিন্ন অধিকারের দাবি জানাবেনা শ্রমিকরা। আর অন্য রাজ্যের শ্রমিকদের কম মজুরিতে খাটিয়ে নেওয়া যাবে।
প্রসঙ্গত হলদিয়ার কারখানাগুলির প্রকার ভিন্ন। মূলত পেট্রোরসায়ন নির্ভর কারখানা হলদিয়া জুড়ে। ভারতবর্ষের মধ্যে দক্ষ শ্রমিকদের তালিকায় প্রথম সারিতেই রয়েছে হলদিয়ার শ্রমিকরা। অথচ সবথেকে বঞ্চিত হলদিয়ার শ্রমিকরাই। সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপিকে সুযোগ করে দিচ্ছে তৃনমূল। আসলে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তার বাহিনীও বিজেপি হয়েছে। তৃনমূল কারখানার তোলা আদায়ে বিজেপিকে সঙ্গে নিয়েই চলে। ফলে এই দুই দলের প্রধান কাজ কারখানার কর্তৃপক্ষের হয়ে কথা বলা। যেহেতু হলদিয়ায় এখন মোট শ্রমিকের আশি শতাংশই অস্থায়ী তাই প্রতিবাদ করার সাহস হয়না তাদের। ভয় থাকে কাজ চলে যাওয়ার।
ইতিমধ্যেই বন্দরেও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বামপন্থীরাইএর প্রতিবাদ করছে, পাশে থেকেছে শ্রমিকদের। রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারের সময় শিল্পাঞ্চলে ঠিকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিয়ম ছিল ঠিকাদার পরিবর্তন হলেও শ্রমিক পরিবর্তন হবেনা। তৃনমূল শাসনে সেসবের কোনও বালাই নেই। ঠিকাদার পরিবর্তন হয়, পুরানো শ্রমিক ছাঁটাই করে। আর টাকার বিনিময়ে নতুন শ্রমিক নেওয়া হয়। নতুন শ্রমিক নেওয়ার সুবিধা, পুরানো শ্রমিকের থেকে কম মজুরিতে কাজে রাখা যাবে, সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে প্রচুর মুনাফা বাড়ানো যাবে। হলদিয়ার এমন অচলাবস্থার বিরুদ্ধেই বামফ্রন্টের লড়াই। প্রায় ধ্বংসের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা হলদিয়াকে পুনরুজ্জীবনের ডাক দিয়ে নির্বাচনী প্রচার করছেন হলদিয়ার সিপিআই(এম) প্রার্থী অশোক কুমার পাত্র। প্রতিটি ওয়ার্ড, বৃহত্তর হলদিয়ার গ্রাম পঞ্চায়েত গুলিতে সিপিআই(এম) প্রার্থীর প্রচারে লোক বাড়ছে। অশোক কুমার পাত্র প্রচারের ফাঁকে বলেন "হলদিয়া গড়ে তুলেছিল বামফ্রন্ট সরকার। আজকের হলদিয়াকে তার পুরানো অবস্থায় নিয়ে যেতে পারবো আমরাই। মানুষের কাছে আমাদের কথা তুলে ধরছি। মানুষজনই উপলব্ধি করছেন। একটা তৈরি শিল্পাঞ্চল ধ্বংস করছে তৃণমূল আর তাকে সহায়তা করছে বিজেপি। এখানে কাজ না পেয়ে যেতে হচ্ছে ভিন রাজ্যে। এ অবস্থার পরিবর্তন হবেই।"
Comments :0