JOURNEY — GOMUKHA — AVIK CHATARJEE — MUKTADHARA — 4th YEAR — 25 JULY 2026

ভ্রমণ — স্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ — অভীক চ্যাটার্জি — মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ২৫ জুলাই ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

JOURNEY  GOMUKHA  AVIK CHATARJEE  MUKTADHARA  4th YEAR  25 JULY 2026

ভ্রমণস্মৃতির মণিকোঠায় গোমুখ

          অভীক চ্যাটার্জী 

মুক্তধারা৪র্থ বর্ষ —  ২৫ জুলাই ২০২৬

 

সপ্তম পর্ব

ভোর হওয়ার আগেই আমাদের কাজকর্ম শুরু। আজ থেকে শুরু হবে আমাদের ট্রেক। তার আগে মা গঙ্গার পুজো। আমরা সবাই সেই ভোর বেলায় স্নান করে তৈরি হয়ে গঙ্গোত্রী মন্দিরে চললাম মা গঙ্গার পুজো দিতে, সূর্য তখনও হিমালয়ের পেছন থেকে উঁকি দেননি।

মন্দিরের চাতালে তখন কয়েকজন মানুষ এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বেশিরভাগই ট্রেকার, যারা একটু পরেই পাড়ি দেবে তেরো কিলোমিটার দূরে ভুজবাসার উদ্দেশ্যে। পূবের আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট পাখিরা পাখার ভরে গঙ্গা পার করছে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস বয়ে চলেছে অবিরত। যদিও স্নার করার দরুন ঠান্ডা সে ভাবে লাগছেনা আমাদের।

পুজো দেওয়ার পর আমরা তৈরি হয়ে নিলাম। আমাদের গাইড ভদ্রলোক এসে গেছেন সময় মত। আমরা তৈরি হয়ে মা গঙ্গার উদ্দেশ্যে প্রণাম ঠুকে এগোতে শুরু করলাম। এখানে আমাদের পোশাকের একটা বিবরণ দিয়ে দেওয়া ভালো। আজকের দিনে আমার কাছে যে সব ট্রেক গিয়ার রয়েছে, তার তুলনায় সে পোশাক স্বপ্নাতীত। আমি পরেছি উলিকটের পাজামা আর জ্যাকেট। আমার বাবা পরেছেন ফরমাল শার্ট আর প্যান্ট। মেসোমশাই ফরমাল শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট(যদিও ট্রেকিং জিনস পরাটা খুব সুবিধাজনক নয়)। আর মা ও দুই মাসী পরেছেন শাড়ি ও কার্ডিগান। আমি আজকের দিনে ট্রেকিংয়ের সময় শাড়ির কথা ভাবতেই পারি না। আর সেই সময় তিনজন মহিলা একটা পুরো ট্রেক করে ফেলেছিলেন শাড়ি পরে।

"হর হর গঙ্গে, হর হর মহাদেব।"

আমরা পাড়ি দিলাম গঙ্গার উৎস সন্ধানে। আজ আমাদের উদ্দেশ্য হলো ফরেস্ট চেকপোস্ট, চিরবাসা আর গিলা পাহাড় হয়ে ভুজবসায় গিয়ে রাত্রি যাপন। দূরত্ব তেরো কিলোমিটারের চেয়ে একটু বেশি।

দুশো থেকে আড়াইশো মিটার এগিয়েই আমরা রাস্তার পাশের ছোট্ট একটা পাথুরে খাঁজ দিয়ে পাহাড়ের পথে ঢুকে পড়লাম। এবার আমাদের সঙ্গী গগনচুম্বী মহীরূহ আর মোনালের ডাক। পাথুরে পথে পাথরের উপর পা ফেলে ফেলে আমরা এগিয়ে চললাম। দূরে পাহাড়ের গায়ে বরফের চাদরের উপর সূর্যের লাল রং লেগেছে। পাখিরা উড়ে চলেছে হিমালয়ের দিকে। পাখিরাও কি পাহাড় ভালোবাসে? জানা নেই।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ এঁকেবেঁকে চলেছে। আর সেই পথে আমরা। মাঝে মাঝে পিঠে বোঝা নিয়ে খচ্চরের দল চলেছে। তাদের খুরের শব্দ অনেক দুর থেকে শোনা যায়। তার সাথে শোনা যায় তাদের গলার ঘণ্টার শব্দ। পাখির ডাক, খুরের আওয়াজ আর ঘণ্টার ধ্বনি একসাথে এক অসম্ভব সুন্দর কোলাজ তৈরি করে। অরণ্য বনানীর মাঝে ভোরের মিঠে আলোয় সেই কোলাজ বড় মোহময়। সে আমাদের পথচলার আনন্দকে আরও একটু ত্বরান্বিত করে দেয়। ধীরে ধীরে ফরেস্ট চেক পোস্ট আসে। ছোট্ট কাঠের গুমটিঘর। একজন উর্দিধারি আমাদের পারমিট চেক করে নিয়ে আমাদের আগে ছেড়ে দিলো। আমরা দু কিলোমিটার এসে গেছি। আরও এগারো কিলোমিটার বাকি।

জঙ্গলের পথে এগিয়ে চলতে চলতে মাঝে মাঝে ভুজ্জপত্রের গাছ দেখা যাচ্ছে। কাগজ আবিষ্কারের আগে ভুজ্জ পত্রে লিখে রাখা হতো প্রয়োজনীয় নথি। এটি মূলত গাছের বাকল, যা শুকিয়ে নিয়ে তার ভেতরের অংশ লেখার জন্যে ব্যবহার করা হতো। এরকমই বহু গল্প করতে করতে আমাদের গাইড আমাদের নিয়ে চললেন হিমালয়ের পথে। ছোট ছোট নালা পড়ছে মাঝে মাঝে। সেখানে জল জমে বরফ হয়ে গেছে রাতের ঠান্ডাতে। পা দিলেই পা হড়কে যায়। আমরা খুব সাবধানে এগিয়ে চললাম। এবার ধীরে ধীরে অরণ্য হালকা হয়ে আসছে। সামনে দেখা যাচ্ছে রুক্ষ পাথুরে চড়াই। দূরত্বের সাথে সাথে কাঠিন্য যে আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। এবার পথ খোলা আকাশের নিচে। সামনে উন্নত শির হিমালয়। আমরা বুঝতে পারলাম, হিমালয়ের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।

চলবে

Comments :0

Login to leave a comment