Editorial

তানাশাহী ভয় পেয়েছে

সম্পাদকীয় বিভাগ

নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন আরএসএস-বিজেপি সরকারের পতনের বাঁশি কার্যত বাজিয়ে দিয়েছে দেশের ছাত্র-যুব সমাজ। রাজধানীর একেবারে কেন্দ্রস্থলে সারা দেশ থেকে আসা নব যৌবনের ঢল মোদী-শাহদের বুঝিয়ে দিয়েছে তানাশাহী চলবে না। আর দেশবাসীর মনেও এই দৃঢ় বিশ্বাস সঞ্চয় করে দিয়েছে দেশের মেরুদণ্ড ছাত্র-যুব সমাজের স্বপ্ন হত্যাকারীদের জমানা শেষ হতে চলেছে। ককরোচ জনতা পার্টির এবং পরিবেশ আন্দোলনের নেতা সোনাম ওয়াঙচুকের আহ্বানে সংসদ চলো অভিযান যে শুধু দিল্লি নয় গোটা ভারতবর্ষকেই নাড়িয়ে দেবে, এমনকি বিদেশেও তার ধাক্কা পৌঁছে যাবে তা সরকার আন্দাজ করতে পেরেছিল। তাই এই অভিযান বানচাল করতে এবং ফ্লপ শো-য়ে পরিণত করতে আঁটঘাট বেঁধে আগাম পরিকল্পনা করে সব রকমের ব্যবস্থা নিয়েছিল সরকার।
দু’দিন আগেই গভীর রাতে অতর্কিত অভিযান চালিয়ে অনশনরত ওয়াঙচুককে তুলে নিয়ে গিয়ে আটক করে রাখে হাসপাতালে। ভেবেছিল ওয়াঙচুককে সরালে যন্তর মন্তরের অবস্থান-অনশন ঝিমিয়ে যাবে। কিন্তু হয়েছে উলটো। প্রতিবাদী স্পৃহা যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে। নতুন নতুন ছেলে-মেয়েরা নতুন করে অনশনে যুক্ত হয়ে যায়। এমনকি দে‍‌শের সব রাজ্যে, সব শহরে, বিশ্ব বিদ্যালয়ে অসংখ্য প্রতীকী অনশন অবস্থান শুরু হয়ে যায়। পাশাপাশি যন্তর মন্তর সব বয়সি মানুষের স্রোত কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেন মোদী-শাহরা।
সংসদ চলো অর্থাৎ মিছিল, জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষণা হয়। সংসদ ভবনের চারদিকে সব রাস্তায় স্তরে স্তরে ব্যারিকেড তৈরি করে নিঃশ্চিদ্র বেষ্টনী বানা‍নো হয়। গোটা এলাকায় নেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সর্বত্র প্রিজন ভ্যান, জল কামানের ছড়াছড়ি। হাজার হাজার দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে দুর্ভেদ্য দুর্গ বানানো হয় সংসদ ভবনকে। ছাত্র-যুবদের পেটানোর জন্য পুলিশের লাঠি হাতে পেশাদার বহিরাগতদের মোতায়েন করা হয়। কিন্তু হাজারে হাজারে, লাখে লাখে তরুণের প্লাবন সব ভাসিয়ে দেয় মুহূর্তে। অসহায় পুলিশ-আধা সেনা মরিয়া ও বেপরোয়া হয়ে হিংস্র, বর্বর ও পৈশাচিক আক্রমণ নামিয়ে আনে। কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় অন্ধকার করেও প্লাবন আটকানো যায়নি। জলকামান হয়ে গেছে পুতুল খেলার নামান্তর। হিংস্র জানোয়ারের মতো নির্বিচারে লাঠি পেটা করে শত শত ছেলে-মেয়েকে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত করেছে মূর্তিমান অমানুষ পুলিশ। মেয়েদের ওপর হামলা হয়েছে, অত্যন্ত কুৎসিতভাবে। জোর করে কতকে তুলে নিয়ে গেছে তার কোনও হিসাব নেই।
এত করেও ঠেকানো যায়নি যৌবনের বিক্রমকে। তারা কথা রেখেছে। মোদী-শাহদের দম্ভ চূর্ণ করে পৌঁছে গেছে একেবারে সংসদ ভবনের প্রধান গেটে। বাইরে যখন বিক্ষোভ, সংসদের ভেতরে বিরোধীদের কণ্ঠে তা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। উত্তাল হয়েছে সংসদ। ছাত্র-যুবরা সংসদের ফটকে পৌঁছে গেছে খবর পেয়েই মোদী আর অপেক্ষা করেননি। চটজলদি সংসদ ছেড়ে রীতিমতো পালিয়ে গেলেন।
ছাত্র-যুব সমাজের আন্দোলনের এমন অভাবনীয় তীব্রতা মোদী সরকারকে বাধ্য করেছে মাথা নোয়াতে। চরম ঔদ্ধত্যকে সরিয়ে বাধ্য হয়েছে আলোচনায় বসতে। আন্দোলনকারীদের পক্ষে লিখিত দাবি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। মূল দাবি ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ। পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। নিট, এনটিএ তুলে দেওয়া। শিক্ষায় বেসরকারিকরণ বন্ধ করা। শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি ইত্যাদি। আন্দোলন বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অংশের মানুষ যেমন যুক্ত হয়েছেন তেমনি বেকারি, কর্মসংস্থান, কৃষকের ফসলের দাম, মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকের মজুরি ইত্যাদি জরুরি বিষয়গুলিও সামনে এসে গেছে। এসেছে গণতন্ত্রের কথা, সংবিধানের কথা, ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা, নাগরিক অধিকারের কথা। শুরু হয় ককরোজ জনতা পার্টির নেতৃত্ব। আজ তা জাতীয় গণআন্দোলনের চেহারা নিয়ে ভারতীয় তথা ভারতবর্ষের মৌলিক ভাবনার ধ্বজা উড়িয়ে দিয়েছে। সকল ভারতবাসীর জন্য আসল ভারত নির্মাণের যাত্রা এখন থেকেই শুরু হোক।

Comments :0

Login to leave a comment