Jungle Raaj

জঙ্গলের রাজত্ব

সম্পাদকীয় বিভাগ

পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা আর রাজ্য প্রশাসনের প্রশ্রয়ে দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়ে গেছে যে পশ্চিমবঙ্গে কার্যত জঙ্গলের রাজত্ব কায়েম হয়ে গেছে। আইন শৃঙ্খলার প্রশ্নে, নীতি-আদর্শ-মূল্যবোধের প্রশ্নে গত এক দশক ধরে মা-মাটি-মানুষের নামে যা চলছে তা কোনও সভ্য সমাজে চলতে পারে না। তা না হলে গত আগস্ট মাসে আর জি কর হাসপাতালের সেই নৃশংসতা ও বর্বরতার পর পানাগড়ের ঘটনা ঘটতে পারে না। কলকাতার বুকে সরকারি মেডিক্যা ল কলেজে কর্মরত অবস্থায় চিকিৎসক তরুণীকে পৈশাচিক বর্বরতা ধর্ষণ ও খুনের পর গোটা রাজ্য তোলপাড় হয়ে গেলেও বিন্দুমাত্র শিক্ষা গ্রহণ করেনি রাজ্যের স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও পুলিশ মন্ত্রী। তাই দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকার কোনও পরিবর্তন হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও পুলিশ মন্ত্রীও বহাল তবিয়তে পদ আঁকড়ে মধুর ভাষণ বিতরণ করে যাচ্ছেন।
জাতীয় সড়কের ওপর সওয়ারি এক তরুণীকে উত্ত্যক্ত করে মদ্যপ যুবকরা গাড়ি নিয়ে ধাওয়া করে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার দূরে গিয়ে ধাক্কা মারে এবং তরুণীর মৃত্যু অনিবার্য করে তোলে। জাতীয় সড়কে জোরদার পুলিশি টহল থাকার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে কোনও পুলি‍‌শের দেখা মেলেনি। শেষপর্যন্ত পুলিশ তদন্তে নামলেও মূল ঘটনাকে আড়াল করতে নতুন চিত্রনাট্য হাজির করে দিয়েছে। রাজ্যজুড়ে ৯৫ শতাংশ ঘটনায় যেভাবে পুলিশ দুষ্কৃতী-অপরাধীদের আড়াল করতে যেভাবে নতুন ভাষ্য হাজির করে এবং সেই পথেই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হচ্ছে না। মদ্যপ যুবকরা তরুণীর গাড়িকে ধাওয়া করেছে পুলিশ সরাসরি তা নাকচ করে দিয়েছে এবং গোটা ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলে সাজাতে চাইছে। পুলিশ মন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় পুলিশ যদি তাতে সফল হয় তাহলে সহজেই বলে দেওয়া যাবে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনও ঘটনাই ঘটেনি। এটাই এখন এই রাজ্যের নির্মম বাস্তবতা।
এখন প্রশ্ন হলো কোনও ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষকরে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ কেন এতটা নিষ্ক্রিয় এবং অপরাধীদের আড়ালে এতটা সক্রিয় হয়ে ওঠে? গত ১৪ বছরে দলদাসে পরিণত হওয়া মেরুদণ্ডহীন পুলিশ শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের হুকুম তালিম করাই একমাত্র কর্তব্য বলে মনে করে। শাসকের দাসত্ব করতে গিয়ে আইন-সংবিধানকে চিরতরে টাটা বাইবাই করে দিয়েছে। আসলে এরাজ্যে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শাসক দলের অস্তিত্ব। অপরাধী-দুষ্কৃতীরা মনে করে এটা তাদের সরকার। এই সরকারের দৌলতেই তারা নিরাপদে ও অবাধে যেকোনও ধরনের অপরাধ ও দুষ্কৃতীমূলক কাজ করে পার পেয়ে যেতে পারে। ঘুষখোররা ঘুষ নিতে পারে। তোলাবাজরা তোলা তুলতে পারে। দুর্নীতিবাজ দুর্নীতির পথে কোটি কোটি টাকা কামাতে পারে। আর অসামাজিক, বিকৃতমনারা নারীদের ওপর যথেচ্ছাচার চালাতে পারে। যে অপরাধী-দুষ্কৃতীরা শাসকের হয়ে ভোট লুট করে, বিরোধীদের ঠেঙিয়ে হাসপাতালে পাঠায়, সরকারের বিরুদ্ধে ট্যাঁফো করতে দেয় না, সর্বত্র এক ভয়ের-আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে রাখে তাদের লুটে খাবার, রাতারাতি বড়লোক হবার, অবৈধ উপায়ে টাকা কামানোর সুযোগ করে না দেওয়া হয়, সর্বোপরি নারী ভোগের বিকৃত লালসা পূরণের সুযোগ দেওয়া না হয় তাহলে সরকার তো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। অতএব দুষ্কৃতী-অপরাধীরা যত দুষ্কর্ম, যত অপরাধই করুক না কেন তাদের সুরক্ষিত রাখা সরকারের দায়।
 

Comments :0

Login to leave a comment