‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর কথা নয়, রবিবার নেতাজী ইন্ডোরের মঞ্চ থেকে রাজ্য সরকারের ধর্মীয় পরিচয় নিয়েই সরাসরি বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ১১ হাজার কণ্ঠে গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে তাঁর ঘোষণা, ‘‘টিকা, শিখা, ধুতি, তুলসীর সরকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। গো-মাতাকে রক্ষা করার সরকার ক্ষমতায়।’’ একই মঞ্চে সাধু-সন্তদের নির্ভয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার আহ্বান এবং তাঁদের ‘অপমান’ করলে জেলে পাঠানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে সরকারের সাংবিধানিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাঙ্গুর জাগরণ মঞ্চ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ও সনাতন সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি এখানে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আসিনি, এসেছি একজন সনাতন হিসাবে।’’ এরপরই সাধু-সন্তদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘‘মন খুলে গীতাপাঠ করুন, গীতা বিতরণ করুন, হনুমান চালিশা পাঠ করুন, শাঁখ-মৃদঙ্গ-খঞ্জরি বাজান, হরেকৃষ্ণ বলুন। কোনও ভয় নেই। মৌসম বদলে গিয়েছে, জমানাও বদলে গিয়েছে।’’
সাধু-সন্তদের ‘অপমান’ করা হলে জেলে পাঠানোর হুমকিও দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সাম্প্রতিক বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর ছবি পোড়ানোর ঘটনায় গ্রেপ্তারির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সাধু-সন্তদের অপমান বরদাস্ত করবে না। সরকারি সংবাদসূত্রগুলিতেও তাঁর এই বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল সরকারের পরিচয় সংক্রান্ত ঘোষণা। ‘‘টিকা, শিখা, ধুতি, তুলসীর সরকার’’ এবং ‘‘গো-মাতা রক্ষার সরকার’’—এই বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠছে, সংবিধানের শপথ নেওয়া একজন মুখ্যমন্ত্রী কি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়কে সরকারের পরিচয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন? সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বক্তব্যের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
এই অনুষ্ঠান থেকেই আগামী ২৯ ডিসেম্বর কলকাতায় ১০ লক্ষ কণ্ঠে গীতাপাঠের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই অনুষ্ঠানে আরএসএস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবতের উপস্থিতির কথাও তিনি জানিয়েছেন।
এদিনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, কুরুক্ষেত্রে আয়োজিত গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্যাভিলিয়ন দেওয়া হবে এবং সরকারি প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। স্বামী রামভদ্রাচার্যের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। আগামী জানুয়ারিতে ব্রিগেডে ১০০০ কুণ্ডের ধর্মসভার আয়োজনের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
এই ধারাবাহিক কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজ্য রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি প্রশাসন ও একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মধ্যে সীমারেখা কোথায় থাকবে? কারণ মুখ্যমন্ত্রী নিজেই যখন সরকারের পরিচয় ধর্মীয় প্রতীকের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করছেন, তখন সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এর আগে রবিবার সকালে বিজেপি-র সল্টলেক দপ্তরে সাংবাদিক বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে কমিশনের তিন আধিকারিকের মধ্যে কোনও মতবিরোধ নেই বলে দাবি করেন তিনি। শনিবারের বৈঠকের ছবি দেখিয়ে তাঁর বক্তব্য, সিদ্ধান্তটি তিন নির্বাচন কমিশনারের সম্মতিতেই হয়েছে। পাশাপাশি সিপিআই(এম)-কে আক্রমণ করে তৃণমূলের সঙ্গে তাদের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
Comments :0