প্রতীম দে
মাত্র সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের একটি দ্বীপরাষ্ট্র। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা দশটি আগ্নেয় দ্বীপের সমষ্টি। অর্থনৈতিক শক্তি বা ফুটবল পরাশক্তি কোনও পরিচয়ই এতদিন ছিল না। কিন্তু ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে সেই দেশই এখন বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কেপ ভার্দে (কাবো ভার্দে) দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে অর্থ বা জনসংখ্যা নয়, সাহস, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাসই শেষ কথা।
বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নিয়েই কেপ ভার্দে ইতিহাস গড়েছে। গ্রুপ এইচ-এ স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তিনটি ড্র করেও তারা নকআউট পর্বে পৌঁছে গিয়েছে। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র এবং একই সময়ে স্পেনের কাছে উরুগুয়ের পরাজয়ের ফলে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করে তারা। এখন শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
কেপ ভার্দের এই যাত্রা কেবল ফুটবলের সাফল্য নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের নতুন ভাষ্য।
গোলরক্ষক ভোজিনহার গল্প
এই বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় নায়ক গোলরক্ষক ভোজিনহা। স্পেনের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে ক্লিন শিট। সব মিলিয়ে তিনি এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তার লড়াইকে "রূপকথা" বলে বর্ণনা করেছে।
প্রবাসীদের দেশ, প্রবাসীদের দল
কেপ ভার্দের জাতীয় দলের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো অধিকাংশ ফুটবলার ইউরোপে বেড়ে ওঠা বা সেখানে খেলা। পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স কিংবা বেলজিয়ামে জন্ম বা বেড়ে ওঠা বহু ফুটবলার নিজেদের শিকড়ের টানে কেপ ভার্দের হয়ে খেলেন। এই প্রবাসী নেটওয়ার্ক শুধু ফুটবলেই নয়, দেশের অর্থনীতিরও প্রধান ভিত্তি।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এক বিরল উদাহরণ
আফ্রিকার বহু দেশের তুলনায় কেপ ভার্দে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি নিয়মিত বহুদলীয় নির্বাচন, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।
২০২৬ সালে দেশটিতে সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েরই সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত।
আফ্রিকার অন্যতম কম দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামোর দেশ হিসেবেও কেপ ভার্দে পরিচিত।
অর্থনীতি: সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এগিয়ে চলা
প্রাকৃতিক সম্পদ প্রায় নেই বললেই চলে। কৃষিযোগ্য জমি খুবই সীমিত। বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় খাদ্য উৎপাদনও সীমিত।
তবুও দেশটির অর্থনীতি কয়েকটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে—
• পর্যটন
• সমুদ্র পরিবহণ
• মৎস্যসম্পদ
• প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স
• নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ
মোট দেশজ উৎপাদনের বড় অংশই আসে পরিষেবা খাত থেকে। ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও সাহায্য করেছে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে পর্যটন শিল্প পুনরুদ্ধার হওয়ায় অর্থনীতিতেও নতুন গতি এসেছে।
ফুটবল এখন অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের সাফল্যের ফলে দেশটির আন্তর্জাতিক পরিচিতি বহুগুণ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে এর ফলে পর্যটক সংখ্যা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক স্পনসর আসতে পারে। দেশীয় ফুটবল অবকাঠামো উন্নত হবে। ইউরোপীয় ক্লাবগুলির নজরে আসবে আরও বেশি কেপ ভার্দিয়ান ফুটবলার। "কেপ ভার্দে" ব্র্যান্ডের আন্তর্জাতিক মূল্যও বাড়বে।
বিশ্বকাপে তাদের সাফল্য ইতিমধ্যেই দেশটির প্রবাসী সমাজের মধ্যে ব্যাপক উৎসবের আবহ তৈরি করেছে।
ছোট দেশের বড় শিক্ষা
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্পগুলোর একটি নিঃসন্দেহে কেপ ভার্দে। যে দেশটির জনসংখ্যা অনেক বড় শহরের সমানও নয়, সেই দেশ বিশ্বমঞ্চে স্পেনকে আটকে দিয়েছে, উরুগুয়ের সঙ্গে লড়াই করেছে এবং নকআউটে জায়গা করে নিয়েছে।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব কিংবা ছোট জনসংখ্যা কোনও কিছুই তাদের স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। বরং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, প্রবাসী সমাজের অবদান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেখিয়ে দিয়েছে, উন্নয়ন শুধু সম্পদের উপর নির্ভর করে না। সুশাসন ও মানবসম্পদও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফুটবলের ভাষায় কেপ ভার্দে এখন শুধু একটি দল নয়, বরং এক প্রতীক। যেখানে ছোট্ট একটি দ্বীপ রাষ্ট্র বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, অসম্ভব বলে সত্যিই কিছু নেই।
Comments :0