ব্রাজিলের রাজনীতিতে ফের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার। রবিবারের নির্বাচনে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বড় ছেলে তথা সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে নজিরবিহীন চতুর্থবারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন ৮০ বছর বয়সি লুলা। জনমত সমীক্ষার পূর্বাভাসকে কার্যত ভুল প্রমাণ করে তার এই জয়। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থানের আবহে ব্রাজিলে লুলার প্রত্যাবর্তন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও নতুন তাৎপর্য তৈরি করেছে।
২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পরপর দু’বার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ছিলেন লুলা। ২০২২ সালে জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করে ফের ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। এ বারও মূল্যবৃদ্ধি, অতীতের দুর্নীতি বিতর্ক এবং সরকারের কাজকর্ম নিয়ে অসন্তোষের মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় তাকে। তা সত্ত্বেও নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিলেন এই প্রবীণ বামপন্থী নেতা।
নির্বাচনের প্রথম দফায় এগিয়ে ছিলেন ফ্লাভিও বলসোনারো। বাবার দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই প্রচারে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু ভোটদানের হার প্রত্যাশার তুলনায় বেশি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সুবিধা পেয়েছেন লুলা, এমনটাই মনে করছেন নির্বাচনী বিশ্লেষকরা।
পরামর্শদাতা সংস্থা থিঙ্ক পলিসির সহ-প্রতিষ্ঠাতা লিওনার্দো বারেটোর মতে, অনিশ্চিত পরিবর্তনের তুলনায় পরিচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপরই আস্থা রেখেছেন ভোটারদের একাংশ। তার বক্তব্য, মানুষ এমন এক পথ বেছে নিয়েছেন, যেখানে কিছু অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা বজায় থাকার নিশ্চয়তা রয়েছে।
লুলার এই জয়কে শুধু ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলের একাংশ। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে দক্ষিণপন্থী সরকারের প্রভাব বৃদ্ধির মধ্যে লুলার জয় সেই প্রবণতার বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে।
নির্বাচনী প্রচারে দারিদ্র্য, বৈষম্য, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা এবং বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে তার সরকারের পদক্ষেপগুলিকে সামনে রেখেছিলেন লুলা। পাশাপাশি, ফ্লাভিওর নেতৃত্বে বলসোনারো পরিবার ক্ষমতায় ফিরলে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে ব্যয় কমতে পারে এবং গত কয়েক দশকে অর্জিত সামাজিক অগ্রগতি ধাক্কা খেতে পারে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে লুলার জয় ওয়াশিংটনের কাছেও রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, এই জয়ের ফলে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষিণপন্থী সরকারগুলির প্রভাব আরও বাড়ানোর প্রচেষ্টা বাধার মুখে পড়তে পারে।
লুলার প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী সেলসো আমোরিম তাকে লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এই অঞ্চলে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে লুলার উপস্থিতি একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।
লুলার রাজনৈতিক জীবন অবশ্য বারবার উত্থান-পতনের সাক্ষী। দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তাকে কারাবন্দি থাকতে হয়েছিল। পরে সেই মামলায় তার সাজা বাতিল হওয়ায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ খুলে যায়। ২০২২ সালে জাইর বলসোনারোকে হারিয়ে ফের ক্ষমতায় ফেরেন তিনি। এ বার প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থেকেও চূড়ান্ত জয় পাওয়ার মাধ্যমে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আরেকটি নজির তৈরি করলেন লুলা।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় এলেও লুলার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ আইনসভা। কারণ, ব্রাজিলের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে রক্ষণশীল কংগ্রেস গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সংসদের দুই কক্ষেই বিরোধিতার মুখে পড়তে পারেন তিনি।
প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর লিবারেল পার্টি এবং তাদের সহযোগী দলগুলি নিম্নকক্ষে ২৮০টিরও বেশি আসন এবং সেনেটে ৫০টি পর্যন্ত আসন পেতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই হিসাব বাস্তবায়িত হলে আইনসভার দুই কক্ষেই দক্ষিণপন্থী শিবির শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে।
সাও পাওলোর গেতুলিও ভার্গাস ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক অলিভার স্টুয়েনকেলের মতে, শুরু থেকেই সংসদে লুলাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। তার আশঙ্কা, আইনসভার বিরোধিতার কারণে প্রেসিডেন্ট হিসেবে লুলার কার্যকর ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
রক্ষণশীল কংগ্রেসের কারণে সরকারি জোট গঠন, নীতি নির্ধারণ এবং সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে অনাস্থা প্রস্তাবের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
নির্বাচনী প্রচারে শ্রমজীবী মানুষ এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন লুলা। তার ঘোষণার মধ্যে ছিল সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে বিনামূল্যে গণপরিবহণ চালুর প্রস্তাব, যদিও তা কার্যকর করতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। পাশাপাশি, সরকারের প্রধান জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে ১৫ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
শ্রমিকদের অধিকার এবং কর্মসংস্থানের কাঠামো নিয়ে সাংবিধানিক সংশোধনের পক্ষেও সওয়াল করেছেন লুলা। এই উদ্যোগকে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের মধ্যে ব্রাজিলের অন্যতম বড় শ্রম সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবটি কংগ্রেসে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল।
তবে নতুন সংসদের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা তার জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলির বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলতে পারে। ব্যবসাবান্ধব কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে চাপ বাড়তে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে সরকারি ব্যয় এবং সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের উপর।
চতুর্থ দফার শাসনকালে লুলাকে সামলাতে হবে ব্রাজিলের অর্থনীতির একাধিক সমস্যা। উচ্চ সুদের হার, সরকারি ঋণের বৃদ্ধি এবং পরিবারের ঋণভার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছরে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ২.৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। অন্যদিকে, দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সরকারি ঋণের পরিমাণ ৮২ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে, যা কোভিড-১৯ অতিমারির পর সর্বোচ্চ স্তর।
সরকারি ব্যয় বৃদ্ধিকেই দেশের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী করছেন সমালোচকদের একাংশ। যদিও ঋণের বৃদ্ধির বড় অংশের জন্য সুদ বাবদ ব্যয়কেও দায়ী করা হচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মডেলের প্রতি লুলার অঙ্গীকার বজায় থাকায় আগামী দিনে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে খুব বেশি অগ্রগতি নাও হতে পারে।
পরিবারগুলির ঋণভার বৃদ্ধিও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রচারের সময় অনলাইন বেটিংয়ের উপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি এবং ঋণের বোঝা কমাতে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করেছিলেন লুলা।
অন্যদিকে, নতুন রক্ষণশীল কংগ্রেস ব্যবসায়িক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাঠামোগত সংস্কারের পক্ষে চাপ দিতে পারে। তাতে সরকারি ব্যয় কমানো এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, লুলার চতুর্থ দফার শাসন শুরু হতে চলেছে এক কঠিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে। একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ, অন্যদিকে সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণশীল কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেলেও সেই জয়কে বাস্তব সাফল্যে পরিণত করতে লুলাকে কতটা কঠিন পথ পেরোতে হয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলের।
Brazil President Election
ব্রাজিলে লুলার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন, চতুর্থবারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত
×
Comments :0