Post Editorial

বইয়ের বিরুদ্ধে বুলডোজার কখনও জেতেনি

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

সুদীপ সেনগুপ্ত

এই শারদোৎসবের দিনগুলিতে এক অভূতপূর্ব, লড়াইয়ের সাক্ষী থাকলো আমাদের পশ্চিমবঙ্গ। লড়াইয়ের এই পটভূমি কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি; বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এর প্লট সাজানো শুরু হয়েছিল। বিজেপি খুব ভালো করেই জানে, ক্ষমতার মসনদে বসার পর তাদের আসল ও আপসহীন বিরোধী শক্তি কেবল কমিউনিস্টরাই। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) জন্মলগ্ন থেকেই তাদের স্পষ্ট ঘোষণা ছিল—সঙ্ঘের মূল তিন শত্রু হলো মুসলমান, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্ট। ঠিক সেই কারণেই ক্ষমতায় এসেই তারা কমিউনিস্টদের দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাবাদর্শের ওপর প্রথম আঘাত হানতে শুরু করে। তথাকথিত সনাতনী ধ্যানধারণার ধোঁয়া তুলে তারা বোঝাতে চায়, যা কিছু বামপন্থী বা যা কিছু তাদের মতের বাইরে, তাই নাকি ভারত-বিদ্বেষী। বামপন্থা মানেই যেন দেশপ্রেমহীনতা, বামপন্থা মানেই নাকি দেশদ্রোহিতা! ‘ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে’—এই ধরনের তৈরি করা স্লোগানের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তারা সাধারণ মানুষের মনে বিষাক্ত বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দেওয়ার লাগাতার চেষ্টা চালিয়েছে।

তবে আমরা প্রথম থেকেই জানতাম, এই জনবিরোধী বিজেপি সরকারের আসল নিশানা বাংলার খেটে খাওয়া, সাধারণ মেহনতী মানুষ। ক্ষমতায় এসে এক মাসও সময় নেয়নি তারা; প্রথম আঘাত নেমে আসে নিরীহ হকার এবং বস্তিবাসী মানুষদের ওপর। যখন অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তি রাস্তায় দাঁড়ানোর সাহস দেখাতে পারেনি, তখন বামপন্থীরাই সর্বশক্তি দিয়ে ব্যাপকতম ঐক্য ও গণমঞ্চ গড়ে তুলে মানুষকে বাঁচাতে রুখে দাঁড়ায়। সেই লড়াই ছড়িয়ে পড়ে বাংলার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। জনতার সেই ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধের মুখে বহু জায়গায় পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা। প্রশাসন আর আদালতকে হাতিয়ার বানিয়েও সর্বত্র গরিবের রুটিরুজি কেড়ে নেওয়া বা বস্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আসলে এদের আসল উদ্দেশ্য হলো বাংলাকে গুজরাটের আদলে আদানি-আম্বানিদের হাতে বিক্রি করে দেওয়া। ঠিক সেই কারণেই গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চল থেকে শুরু করে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রের মূল্যবান জমি থেকে গরিব মানুষকে উচ্ছেদ করে আদানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। গোটা রাজ্যজুড়ে আজ চলছে গরিব উৎখাতের এক বর্বর যজ্ঞ।

বিজেপি সরকার কায়েম হওয়ার কয়েক মাসের মাথাতেই দরজায় কড়া নাড়ে বাঙালির প্রাণের শারদোৎসব। এই উৎসব শুধু একটা ধর্মীয় আচার নয়; এটি ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও ভাষা নির্বিশেষে আপামর মানুষের মিলনের মহোৎসব। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এই চিরন্তন ভাবনাই বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য। সেই আনন্দে মেতে উঠতে সারা বছর ধরে প্রস্তুতি নেয় ধর্মনির্বিশেষে বাঙালি-অবাঙালি প্রতিটি মানুষ। নতুন পোশাকের গন্ধ, আনন্দ, খাওয়াদাওয়া আর চেনা-অচেনা মানুষের মহামিলনে এ যেন এক অন্তহীন প্রাণের মেলা।

কিন্তু এই আনন্দকেও বরদাস্ত করতে পারেনি বিজেপি। উৎসবের সেই ধর্মনিরপেক্ষ ও মুক্ত আবহের ওপর তারা শুরু থেকেই বিষাক্ত আক্রমণ শানাতে শুরু করে। ভিনরাজ্যের বাগেশ্বর বাবা থেকে শুরু করে স্থানীয় বিজেপি নেতারা হুংকার দিতে শুরু করলেন—শারদোৎসব নাকি শুধুই সনাতনী হিন্দুদের, এখানে কোনো বিধর্মী বা প্রগতিশীল মানুষের স্থান নেই! উত্তর ভারতীয় রীতি চাপিয়ে দিয়ে নিরামিষ খাওয়ার নিদান, নবরাত্রির মতো আচার পালনের তালিবানি ফতোয়া দিয়ে তারা বাঙালির প্রাণোচ্ছ্বল উৎসবের আবহকে বিষিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু যখন তারা বুঝল বাংলার মানুষ এই অনুশাসন মেনে নেবে না এবং বামপন্থীরাই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে, তখনই তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠল বামপন্থীরা।

খোদ মুখ্যমন্ত্রীর তরফ থেকে ফরমান জারি হলো—বইয়ের স্টলে নাকি ‘শারদোৎসব’ লেখা যাবে না, লিখতে হবে ‘দুর্গোৎসব’ বা ‘দুর্গাপূজা’; নয়তো স্টলই খুলতে দেওয়া হবে না! ‘রাজা যাহা বলে পারিষদগণে বলে তার শতগুণ’—শাসকের অনুগামী পারিষদরা গলা চড়িয়ে বলতে শুরু করল, যারা নাস্তিক, ধর্ম মানে না, তারা কেন পুজোর সময় বইয়ের স্টল দেবে? তাদের দাবি, বামপন্থীদের স্টলে নাকি শুধু লেনিন, স্তালিন আর মার্কসের লেখা থাকে, যাদের সঙ্গে ভারতের কোনো যোগ নেই। এই বইগুলোকে ধ্বংস করে নাকি রক্ষা করতে হবে ভারতীয় সংস্কৃতি! শুধু তাই নয়, বুকস্টলের বিরোধিতায় ‘বামবধ’এর হোডিং লাগিয়ে প্রচার চালানো হলো যে স্টল করার কোনো দরকার নেই, তার চেয়ে বরং মহিলাদের হাতে তরোয়াল আর ত্রিশূল তুলে দেওয়া হোক—সেটাই নাকি আসল সমাজসেবা!

একই অন্ধ আক্রোশে বিজেপি আক্রমণ নামিয়ে এনেছে শিক্ষার আঙিনায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠগুলোকে একে একে নিশানা করা হয়েছে। শিক্ষকদের বদলি করার জন্য নতুন কালা বিল পাস করানো হয়েছে। কারণ তারা জানে, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। মানুষ যত জানবে, যত পড়বে, ততই সে সমাজকে চিনবে, শোষণের স্বরূপ উন্মোচন করবে এবং মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কোটি কোটি মানুষের সর্বস্বান্ত হওয়ার খেলা ধরে ফেলবে। তাই তারা চায় না মানুষ সচেতন হোক। তাদের উদ্দেশ্য হলো একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে মানুষকে শিক্ষিত করা, ইতিহাসকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের একমাত্র নায়ক হিসেবে তুলে ধরা। আর এই কারণেই সমস্ত প্রগতিশীল চিন্তার বইয়ের ওপর তাদের এত রাগ, এত ক্ষোভ।

তারা যে কতটা অমানুষিক ও বর্বর হতে পারে, এটা মানুষ এবার চোখের সামনে দেখলেন। শারদোৎসবে বামপন্থীদের বইয়ের স্টল কোনো নতুন ঘটনা নয়। সেই ১৯৫২-৫৩ সাল থেকে এই ঐতিহ্য চলে আসছে। পুলিশ-প্রশাসনকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চিঠি দেওয়া হয়, পৌরসভা এলাকায় নির্ধারিত কর জমা দেওয়া হয়, বিদ্যুৎ পর্ষদ বা সিইএসসি থেকে আলাদা মিটার এনে আলো জ্বালিয়ে এই স্টল খোলা হয়। এই স্টল কেবল রাজনৈতিক প্রচারের জায়গা নয়, এ হলো সুস্থ সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। পুজোর প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখার পাশাপাশি মানুষ বই কেনে—নতুন জামার মতোই নতুন বই কেনা বাঙালির এক অবিচ্ছেদ্য ট্র্যাডিশন। শারদীয়া পত্রিকা, নতুন গল্প, কবিতা ও উপন্যাসের মধ্য দিয়ে সাহিত্যপ্রেমী মানুষ উৎসবকে বরণ করে নেয়। কত সহস্র নতুন লেখার জন্ম হয় এই সময়ে।

এবার সেই মুক্ত চিন্তার প্রতীক বইয়ের স্টলের ওপর নামিয়ে আনা হলো বর্বরোচিত হামলা। গোটা কলকাতা ও রাজ্যজুড়ে যেখানেই বিজেপির শক্তি আছে, যেখানেই তারা ২০-৩০ জন সমাজবিরোধীকে জড়ো করতে পেরেছে, সেখানেই বুকস্টল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নাগেরবাজার, ব্যারাকপুর, লেক গার্ডেন্স, এন্টালি সহ সর্বত্র প্রায় দেড় শতাধিক স্টলে তাণ্ডব চালানো হয়েছে। কেবল স্টল ভাঙাই নয়, বইগুলোকে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে রাজপথে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ থেকে শুরু করে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’—কোনো কিছুই এই পাষণ্ডদের হাত থেকে রেহাই পায়নি!

কী এক বিকৃত উল্লাস! যেন ঠিক নাৎসিদের কায়দায় রাইখস্টাগে আগুন লাগানোর পর কমিউনিস্টদের ওপর আক্রমণ আর প্রকাশ্য রাস্তায় বই পোড়ানোর সেই অন্ধকার ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে। এই উন্মাদনার সঙ্গে সঙ্গেই বামপন্থী কর্মীদের ওপরও সরাসরি শারীরিক আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু মাথা নত করেনি বাংলার মানুষ। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যেখানেই হামলা হয়েছে, সেখানেই লাল পতাকা কাঁধে নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছেন বামকর্মীরা। সেই অবিচল প্রতিরোধের জেরেই একের পর এক স্টল আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডে যখন বুলডোজার আর আবর্জনা ফেলার কর্পোরেশনের গাড়ি নিয়ে আসা হয়েছিল বইগুলোকে আবর্জনার মতো ফেলে দেওয়ার জন্য, যখন শয়ে শয়ে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে বুকস্টল ভেঙে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল—তখন সাধারণ মানুষ ও বামপন্থীরা বুক চিতিয়ে বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়েছিল। লাল পতাকার সেই লৌহকঠিন বাধার মুখে প্রশাসন ও তাদের বুলডোজার পিছু হটতে বাধ্য হয়। মানুষের সম্মিলিত প্রতিরক্ষার কাছে চুরমার হয়ে যায় ফ্যাসিবাদের আস্ফালন।  অন্যদিকে, অদ্ভুত বিষয় হলো, এই বছর নতুন গজিয়ে ওঠা গেরুয়া শিবিরের শাখা সংগঠনগুলোর বুকস্টল কিন্তু নির্বিঘ্নে চলেছে—তাদের গায়ে প্রশাসন হাত দেয়নি।

এ বছর বইয়ের ওপর আঘাত এসেছে, বইয়ের পাতায় লাথি মারা হয়েছে, স্টল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা কুর্নিশ জানাই বাংলার আপামর মানুষকে! যত বেশি হামলা হয়েছে, বইকে ভালোবাসার তাগিদ মানুষের মনে তত বেশি আগুন জ্বালিয়েছে। সাধারণ মানুষ বুঝেছে, এই আক্রমণ শুধু একটা স্টলের ওপর নয়, বাংলার সংস্কৃতি ও বিবেকের ওপর। প্রাথমিক হিসেবে এখনও পর্যন্ত ২২৭টিরও বেশি বুকস্টল হামলার মুখে পড়েছে, যার মধ্যে মাত্র গুটিকয়েক হয়তো সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে, কিন্তু বাকি সমস্ত জায়গায় মানুষ নিজের হাতে পাহারা দিয়ে স্টল চালু রেখেছে। পুলিশ আর বিজেপি মিলে যা বন্ধ করতে চেয়েছিল, মানুষ তাকে দ্বিগুণ উৎসাহে বাঁচিয়ে রেখেছে।

হামলা চালিয়ে কি স্টলের সংখ্যা কমানো গেছে? একদমই না। যে কটা জেলার হিসেব পাওয়া গেছে, দেখা যাচ্ছে গতবারের তুলনায় এবার স্টলের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বই বিক্রির হিসেব তো সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছে ! শুধু যাদবপুরের ৮বি স্টলেই যেখানে গত বছর বিক্রি হয়েছিল প্রায় সাড়ে চার থেকে টাকার বই, সেখানে এবার সমস্ত রেকর্ড ভেঙে তা ছাড়িয়ে গেছে ১৬ লক্ষ টাকারও বেশি! গোটা রাজ্যে বই বিক্রি বেড়েছে দেড় গুণেরও বেশি।

হাইকোর্টের রায়ের কথা উল্লেখ করে পুলিশের পক্ষ থেকে সমস্ত স্টল বন্ধের হন্য তৎপর হয়। কোনো রায় কি আছে যে বাংলায় বুকস্টল করা যাবে না? যে রায়ের দোহাই দেওয়া হচ্ছে, তা ছিল নির্দিষ্টভাবে বনগাঁর একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে। অথচ এরা সেই ছুতোয় পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী আর জঞ্জাল ফেলার গাড়ি নিয়ে বই তুলে ফেলতে এসেছিল! বই কি ওদের চোখে আবর্জনা? এর চেয়ে বড় ফ্যাসিবাদী মানসিকতা আর কী হতে পারে? যাদবপুরের স্টলে নিয়ম মেনে সিইএসসি’র সংযোগ নেওয়া ছিল, পুলিশ-প্রশাসনকে যথারীতি জানানো হয়েছিল। এরা উপদ্রব করতে পারে বুঝেই কর্মীরা এবার আরও বেশি সতর্ক ছিল। রাস্তার ধারে যখন শত শত জামাকাপড়ের দোকান বসতে পারে, অন্যান্য অস্থায়ী স্টল বসতে পারে, তখন বুকস্টলে কিসের বাধা? যাদবপুরে আমাদের স্টলের পাশেই গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে নতুন একটা স্টল বসানো হয়েছিল। তাদের স্টল ছিল ঠিকই, কিন্তু সেখানে বই ছিল না, বই পড়ার মানুষ ছিল না, বইপ্রেমীদের কোনো ভিড় ছিল না।

লজ্জা হওয়া উচিত এই আক্রমণকারীদের! বই পুড়িয়ে কী লাভ হলো ওদের? মানুষ দূরদূরান্ত থেকে শুধু বই কেনার জন্য যাদবপুরে ছুটে এসেছে। সাধারণ মানুষ এসে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেছে, ‘বইয়ের স্টলে হামলা করবে? ইন্টারনেটে সেই ছবি দেখেছি বলেই আজ আমরা এখানে বই কিনতে এসেছি!’ ঠাকুর দেখার পাশাপাশি মানুষ লাইন দিয়ে বই কিনে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আমাদের বুকস্টলে কী থাকে না? সেখানে মার্কসীয় সাহিত্য তো থাকেই, তার পাশাপাশি থাকে ছোটদের রূপকথা, কিশোর সাহিত্য, বিজ্ঞান, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ, আদি শঙ্করাচার্য কিংবা গৌতম বুদ্ধের দর্শন। মানুষের যা প্রয়োজন, যা তাদের চেতনাকে জাগ্রত করে, সেই সমস্ত বই-ই সেখানে থাকে।

‘বাম বধ’ আর ‘বই বধ’ করার যে হিংস্র রাজনীতি শুরু হয়েছে, তার শেষ পরিণতি খুব ভয়ানক হতে চলেছে। বাংলার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এই ঔদ্ধত্য কোনোদিন মেনে নেবে না। দুর্গোৎসবের নামে মানুষের মৃত্যু ঘটানো, পুজো কমিটির দখল নেওয়া, দুবার খুঁটিপুজো করে মুখ্যমন্ত্রীর সস্তা কৃতিত্ব জাহির করা আর পারিষদ বাহিনীকে দিয়ে নিজেদের স্টলকে সেরা পুরস্কার পাইয়ে দেওয়ার যে রাজনীতি চলছে, তার দায় মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর দলকেই নিতে হবে।

বাংলা কোনোদিন বাইরের চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশ বা তালিবানি অনুশাসন মেনে নেয়নি, আজও নেবে না। আমরা পুজোয় কী খাব, কী পরব, কী পড়ব—তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার কোনো শক্তির নেই। যে কারণেই বুকস্টলের পাশাপাশি বাংলার অলিগলিতে মাংস, মাছ আর বিরিয়ানির দোকানগুলোতেও এবার রেকর্ড বিক্রি হয়েছে—মানুষ ভরপুর নিজেদের পছন্দের খাবার খেয়ে এই ধর্মান্ধ ফতোয়ার মুখে সপাটে চড় মেরেছে। মানুষকে কূপমণ্ডূকতার অন্ধকারে বন্দি করে সমাজকে ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা যারা করেছে, ইতিহাসের পাতায় তারা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। বিশ্ব ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফ্যাসিবাদের আস্ফালন যখন মাত্রা ছাড়ায়, তখন সাধারণ মানুষই রাজপথে নেমে এসে এদের ঔদ্ধত্য গুঁড়িয়ে দেয়। আমরা হিটলার ও মুসোলিনির অন্তিম পরিণতি ভুলে যাইনি। শেষ মুহূর্তে নিজের তৈরি বাঙ্কারে ঢুকে নিজের রিভলভার মাথায় ঠেকিয়ে হিটলারকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল, আর সাধারণ ক্ষুব্ধ মানুষ মুসোলিনিকে প্রকাশ্য দিবালোকে ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। বাংলার মাটিতে যারা বই পোড়ানোর রাজনীতি করছে, তাদের জন্যও ভবিষ্যতে সেই একই ইতিহাস অপেক্ষা করছে।

আসুন, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে, প্রগতিশীল বামপন্থী এবং সাধারণ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের এক ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলে এই বর্বর ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে শামিল হই। বইয়ের জয় হোক, মানুষের জয় হোক!
 

Comments :0

Login to leave a comment