communist party foundation day

এবারের প্রতিষ্ঠা দিবসের আহ্বান

সম্পাদকীয় বিভাগ

আভাস রায়চৌধুরি

১৯১৭ সালে রুশ দেশের শ্রমিক শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সমগ্র বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সামনে নতুন দিনের স্বপ্ন, নতুন পৃথিবীর পথ উন্মোচিত করে। রুশ বিপ্লবের প্রভাবে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত উপনিবেশের মতোই ভারতেও স্বাধীনতা সংগ্রামের গুণগত পরিবর্তন ঘটে। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম অনেক বেশি স্পষ্ট, সংগঠিত এবং প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এই সময়েই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধীজীর অংশগ্রহণ। গান্ধীজীর নেতৃত্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে প্রকৃত অর্থে গণসংগ্রামে রূপান্তরিত করে। গান্ধীজীর সংগ্রামের বার্তা তরুণ প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছিল। তেমনি সমকালীন পৃথিবীতে পুঁজিবাদের বিকল্প হিসাবে সমাজতন্ত্র সম্পর্কেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ইতিমধ্যে চলমান সশস্ত্র বিপ্লববাদ তার নিজস্ব ধারায় প্রবাহিত হচ্ছিল। রুশ বিপ্লবের প্রভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে শ্রমিক বিপ্লব তাত্ত্বিক ও মতাদর্শগত আকার থেকে ফলিত রাজনীতির বাস্তব সত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে পৃথিবীব্যাপী বিপ্লব প্রত্যাশী তরুণ প্রজন্ম এবং শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে বিপ্লব, নতুন পৃথিবী, সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ শুরু হয়েছে। ভারতেও স্বাধীনতা সংগ্রাম জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে।

এমনই দ্রোহকালে ১৯২০ সালে ১৭ অক্টোবর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্টদের লক্ষ্য ছিল দেশের মাটিতে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং একই সঙ্গে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যেই, ১৯২১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে কমিউনিস্টরা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করে। পূর্ণ স্বাধীনতা বলতে কমিউনিস্টরা ঘোষণা করেছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে জাতীয় মুক্তির পাশাপাশি ভারতীয় সমাজে শ্রেণি শোষণ এবং সামাজিক নিপীড়ন উৎখাত করা। জাতীয় কংগ্রেস তখনও এই প্রস্তাব গ্রহণ করার অবস্থায় পৌঁছায়নি। আবারও পরের বছর গয়া অধিবেশনে কমিউনিস্টরা পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করে। সেখানেও ওই প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। তারপর ১৯২৩ থেকে ১৯২৯-৩০ সাল পর্যন্ত পেশোয়ারে, কানপুর ও মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসক কমিউনিস্টদের উপর দমনপীড়ন নামিয়ে আনে। ১৯২৫সালে সর্বভারতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে কমিউনিস্টরা দেশের মধ্যে সংগঠিতভাবে কাজ শুরু করে। অচিরেই ব্রিটিশ ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়।

১৯১৭ থেকে ১৯৪৭, এই তিন দশক ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম স্পষ্টভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্র অর্জন করেছে। আবার আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির তীব্র জটিলতার এই পর্ব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বিতর্কিত সময়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও স্বাধীনতার চরিত্র, সদ্য স্বাধীন ভারতের সমাজ, অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি, শ্রমিকশ্রেণি ও শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের মত ও পথের বহু বিতর্ক দেখা দিয়েছে কমিউনিস্ট আন্দোলনে। কিন্তু ভারতের শ্রমজীবী মানুষ ও ভারতীয় জনগণের মুক্তির সংগ্রামে কমিউনিস্টদের সংগ্রামে আন্তরিকতার কোনও অভাব ছিল না। ভারতীয় সমাজে মানবমুক্তির সংগ্রাম আজও বহমান। সেদিন ব্রিটিশ ভারতে কমিউনিস্টরা ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসকের আক্রমণের নিশানায়। আজ রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের নিশানায় কমিউনিস্টরা। শুধু কমিউনিস্ট কিংবা বামপন্থী নয়, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ যুক্তিবাদ এবং প্রগতিশীল চিন্তায় বিশ্বাসী সকলেই আজ ভারত রাষ্ট্রকাঠামোর ক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।

সংসদ ও সংসদ বহির্ভূত পথের সংগ্রাম

কমিউনিস্টরা ১৯৫২সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন থেকেই ভারতের সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে কেরালায় প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত রাজ্য সরকার গঠিত হয়। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ অল্প সময়ের জন্য পরপর দুটি যুক্ত ফ্রন্ট সরকারে সিপিআই(এম) সহ বামপন্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৭৭-২০১১ ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারে সিপিআই (এম) অন্যতম নেতৃত্বকারী ভূমিকা পালন করেছে। ত্রিপুরাতেও দুটি পর্বে দীর্ঘ সময়ের বামফ্রন্ট সরকারে সিপিআই(এম) নেতৃত্ব দিয়েছে। কেরালায় বাম গণতান্ত্রিক সরকারে সিপিআই (এম) নেতৃত্বকারী ভূমিকা পালন করেছে।

২০২৬ সালে পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর এই মুহূর্তে ভারতের কোনও রাজ্যেই কমিউনিস্টরা সরকারে নেই। এতে আজকের ভারতের হিন্দুত্ব-কর্পোরেট এবং তাদের রাজনৈতিক পাহারাদাররা অত্যন্ত খুশি। গত ৪ মে সন্ধ্যায় দিল্লিতে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘আজ দেশে একটিও রাজ্য নেই, যেখানে কমিউনিস্ট পার্টির সরকার আছে। একটাও নেই।...এটা শুধু একটা ক্ষমতার বদল নয়, ভাবনার বদল। এটা দেখায় বিকশিত হতে থাকা ভারত কোন দিশায় আগে চলতে চায়।’’ দক্ষিণপন্থী রাজনীতির এই পরিবেশে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য আসলে আরএসএস-বিজেপি’র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রত্যাশার প্রতিফলন। ২০১৮ সালে ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে বামপন্থীদের পরাস্ত করে প্রথমবার বিজেপি জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী একই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন।

পাটি কর্মসূচিতে সংসদ ও সংসদ বহির্ভূত সংগ্রামের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ও গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে সিপিআই(এম)। উভয় ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ভারতীয় সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের জন্যই কাজ করে যাওয়া। ভারতের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সিপিআই(এম) এই কাজই করে চলেছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্র কখনও কমিউনিস্টদের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। বরং সংসদীয় গণতন্ত্র শাসকশ্রেণি ও গোষ্ঠীর দ্বারা আক্রান্ত হলে কমিউনিস্টরা গণতন্ত্রের ভূলুণ্ঠিত পতাকাকে উর্ধ্বে তুলে ধরেছে। আজ আবার আমাদের দেশে কমিউনিস্টদের এই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

কোনও সন্দেহ নেই, আজকের নয়া-উদারবাদী ভারতে লুটেরা ও ক্রোনি পুঁজির সর্বব্যাপী আধিপত্যের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ সিপিআই(এম) সহ বামপন্থীরা। হিন্দুত্ব-কর্পোরেট আধিপত্যের স্বার্থে ভারতে নয়া-ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরএসএস-বিজেপি’র প্রকল্পের সামনে কমিউনিস্টরাই প্রধান বাধা। তাই তো বামপন্থীদের নির্বাচনী পরাজয়ে রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থীরা উৎসাহিত। ৪ মে সন্ধ্যায় দিল্লিতে আরএসএস প্রচারক স্পষ্টভাবেই নিজস্ব মতাদর্শের জয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বী মতাদর্শের পরাজয়ের প্রতি দিকনির্দেশ করেছেন। আবার এই মন্তব্যেই প্রতিদ্বন্দ্বী মতবাদের প্রাসঙ্গিকতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। আসলে রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থা ও কর্পোরেট হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য মতাদর্শগত এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে হয়। নচেৎ নিঃশেষ হয়ে যাওয়া অনিবার্য। সিপিআই (এম) এই দ্বিমাত্রিক সংগ্রাম গড়ে তুলতে সচেষ্ট ও আন্তরিক।

সব পথ এখন দিল্লির দিকে

আজকের পৃথিবীতে নয়া-উদারবাদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নয়া-ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা ও রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। নয়া-ফ্যাসিবাদের অন্যতম একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটা হিটলার-মুসোলিনির মতো বুর্জোয়া নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বাতিল করছে না। বুর্জোয়া নির্বাচনী ব্যবস্থার বহিরঙ্গ ধরে রেখে দীর্ঘকালীন লক্ষ্য নিয়ে ভিতর থেকে এই ব্যবস্থাকে কারসাজি করে ভঙ্গুর করে রাখা, যাতে বুর্জোয়া গণতন্ত্র শ্রমিকশ্রেণি ও শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর যতটুকু প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাও যেন প্রতিফলিত না হয়। এসআইআর প্রক্রিয়া ভারতীয় গণতন্ত্রের উপর এই ধরনের একটি বড় আঘাত।

বিহার নির্বাচনের প্রাক্কালে সেখানে এসআইআর শুরু হয় এবং শুরু থেকেই বিতর্ক। কয়েক লক্ষ বৈধ নাগরিকের নাম বাদ যায়। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া আরও অনেক জটিল এবং বৈধ নাগরিকদের ভোটাধিকারের উপর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ষড়যন্ত্রমূলক আক্রমণ সংগঠিত হয়েছে। অষ্টাদশ বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ২৭ লক্ষ বৈধ নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছেন। তৎকালীন রাজ্য সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশন কেউই গণতন্ত্রের প্রতি এত বড় বিশ্বাসঘাতকতার দায় অস্বীকার করতে পারে না। আরএসএস’র কোর অ্যা জেন্ডা এসআইআর। এই অ্যা জেন্ডা কার্যকর করার মাধ্যমে আরএসএস তার সঙ্কীর্ণ রাজনীতি প্রয়োগ করতে চেষ্টা করছে। এসআইআর প্রক্রিয়াও সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের দ্বিমেরুকরণের রাজনীতির অন্যতম উপাদানে পরিণত হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ শুধু ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তাই নয়, অস্তিত্ব সঙ্কট ও ভয়ের পরিবেশে দিনযাপন করছেন।

এখন ষোলোটি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলে এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে। শুরু থেকেই পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতোই অসংখ্য বিতর্ক, ধোঁয়াশা, অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যেই ১৩ কোটির বেশি মানুষের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতায় নির্দ্বিধায় বলা যায়, আসলে এসআইআর গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, রাজনৈতিক গণহত্যা, যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক হিন্দুত্বের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ পূরণে ব্যবহৃত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে একটি সর্বভারতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে এসআইআর প্রক্রিয়ায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের স্বৈরাচারী, পক্ষপাতদুষ্ট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভূমিকা স্পষ্ট হয়েছে। আরএসএস-বিজেপি' র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সম্পূর্ণ বেআইনি পদ্ধতিতে তিনি লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন বলে অভিযোগ। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং তাঁর শাস্তির দাবিতে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ারও সংস্কারের দাবি জানাচ্ছে। অভিযুক্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরকার আড়াল করার চেষ্টা করছে। আন্দোলন ভাঙতে, আন্দোলনকারীদের দমন করতে রাজধানীকে দিল্লি পুলিশ অবরুদ্ধ যুদ্ধনগরীতে পরিণত করেছে। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন রুখতে করতে গোটা দিল্লিতে ব্যাপক পুলিশি আগ্রাসন চলছে। এমনকি, সরকার ১ অক্টোবর দিল্লিমুখী সমস্ত দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল করে দেয়। তাতে অবশ্য ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরের চারপাশে বামপন্থী শ্রমিক, ছাত্র, যুব, মহিলা সংগঠন এবং দলগুলির বিক্ষোভ আটকানো যায়নি।

পক্ষপাতদুষ্ট মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চলছে। এই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রস্থল এখন দিল্লির যন্তর মন্তর। যন্তর মন্তর এখন ভারতে গণতন্ত্র ফেরানোর আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এখন যন্তর মন্তরে যেকোনও ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ সিদ্ধান্ত আসলে জনগণের আন্দোলনের সামনে হিন্দুত্ব-কর্পোরেটের ভয় ও অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ। কেন্দ্রীয় কমিটির সভা স্থগিত রেখে সিপিআই(এম)’র সমস্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ওই দিনের বিক্ষোভ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, পুলিশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন এবং আটক হয়েছেন। এই ঘটনা অতীতে কখনও ঘটেনি। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর সরকারের নির্যাতন সুপ্রিম কোর্ট, এমনকি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চ ও মিডিয়াতে তীব্রভাবে সমালোচিত হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনারের হলো সাংবিধানিক পদ। এই পদের গরিমা ও দায়িত্ব কখনোই কোনো প্রশ্নের সামনে আসা উচিত নয়। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমার সাংবিধানিক পদের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেননি। শাসক দলকে ক্ষমতায় রাখা বা প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁর পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীরা ছাড়া কেউই সমর্থন করছেন না। আমাদের প্রতিবেশী, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতাপ্রাপ্ত অনেক দেশের থেকে সীমাবদ্ধতা নিয়েও আমাদের দেশের গণতন্ত্রের শক্তিশালী অবস্থানের অন্যতম দুটি কারণ হলো, বহুত্ববাদের স্বীকৃতি এবং স্বাধীন স্বতন্ত্র নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করা। ২০১৪ থেকে চলমান আরএসএস-বিজেপি সরকার ভারতীয় গণতন্ত্রের এই অন্যতম দুই প্রধান ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করে চলেছে। প্রতিবাদে সমগ্র দেশ গর্জে উঠেছে। বারো বছরের অভিজ্ঞতায় ভারতবাসী উপলব্ধি করছেন তাঁদের জীবন-জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ দেশি-বিদেশি কর্পোরেটের লুটের শিকার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে আজ রাজনৈতিক হিন্দুত্বের বিদ্বেষ-বিভাজনের প্রচারে চিঁড়ে খুব একটা ভিজছে না। জাতি, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ, অঞ্চল, সংস্কৃতি নির্বিশেষে নয়া-ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যের প্রবণতাসম্পন্ন আরএসএস-বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ সরব হচ্ছেন। জনতার এই সংগ্রামে সামনের সারিতে রয়েছে এদেশের কমিউনিস্টরা।

লক্ষ্য কমিউনিস্টরা, আক্রান্ত ভারত ভাবনা

রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীরা কুৎসিত, বিকৃত ও বেপরোয়াভাবে কমিউনিস্টদের হিন্দুবিরোধী হিসাবে প্রচার করছে। এই হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। হিন্দু পরিচয়ের মানুষদের আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে তাদেরকে সংগঠিত করার হাতিয়ার হলো ‘হিন্দুত্ব’। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্ম সম্পর্কে মার্কসবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির অপব্যাখ্যা হচ্ছে। পৃথিবীর সব দেশেই যখন ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র দুর্বল হয়, পরিবর্তে মৌলবাদ শক্তিশালী হয় তখন এই ঘটনাই ঘটে। আসলে যে বিদ্বেষ-বিভাজনের বিষাক্ত পথে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদীরা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, সেই পরিবেশকেই অটুট রাখতে চায় ওরা। যাতে নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কাজের অমিল রাজ্যের মানুষ ধরতে না পারেন।

আমাদের দেশের মনীষীরা আমাদের দেশ ও সমাজে সকলকেই ‘মানুষ’ হিসাবে দেখেছেন। নিজের দেশ আর সমাজের প্রতি ভালোবাসা যদি প্রকৃতই ভালোবাসা হয়, তাহলে তা কখনোই প্রতিবেশী বা অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কিংবা ঘৃণার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে না। বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব ধর্মচেতনা ছিল। এই চেতনা ‘ভারত ভাবনা’য় স্পষ্টভাবে সম্পৃক্ত এবং প্রতিফলিত। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের ধর্মচেতনা নিয়েও বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ সহ ভারত মনীষীরা বিশ্বমানবতার কথা বলেছেন। বিশ্বের অঙ্গনে ভারতকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার সঙ্গে কমিউনিস্টদের মানুষের প্রতি ভালোবাসা কিংবা দায়বদ্ধতার কোনও বিরোধ নেই। পথের স্বাতন্ত্র্য নিয়েও কিন্তু লক্ষ্যের কোনও পার্থক্য নেই। ১৮৯৩ সালে শিকাগো বক্তৃতায় বিবেকানন্দ কিংবা ১৯৩৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম সম্পর্কে বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ, সবার উপর মানুষ সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে ঈশ্বর কল্পনা আছে কিন্তু কোনও মৌলবাদ নেই।

ভারতীয় সমাজে ভাববাদ, বস্তুবাদ, ধর্মচেতনা, নাস্তিক্য সবকিছুরই অস্তিত্ব আছে মার্কসবাদীর বস্তুবাদী জগৎকে বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করে। মানুষের ইহজাগতিক দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণার নিরসন এই জগতেই করতে চায়। ভাববাদীরা তা গ্রহণ না করতেই পারেন। কিন্তু মার্কসবাদীরা কখনও কোথাও কোনও সমাজেই সাধারণ মানুষের ধর্মচেতনা কিংবা ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করেনি। কারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করা মার্কসবাদীদের পদ্ধতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। ভারতের সমাজে ভাববাদ, বস্তুবাদ, ধর্মচেতনা, নাস্তিক্য এসবের দ্বন্দ্ব চলছেই। যদি আক্রমণ করে, খতম করে মানুষের চিন্তা-চেতনা কিংবা জ্ঞানচর্চাকে অবলুপ্ত করা যেত, তাহলে ভারতীয় সমাজে আজ চার্বাক দর্শনের কোনও অস্তিত্বই থাকতো না। কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইউরোপের সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের দিনে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার ঘোষণা মতো নয়া-উদারবাদেই ইতিহাস থেমে যেত। পৃথিবীজুড়ে আজও নয়া-উদারবাদের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম অব্যাহত থাকতো না।

মার্কস, লেনিন যত আক্রান্ত হবেন ততই তাঁদের প্রাসঙ্গিকতা বাড়বে। যারা তাঁদের কথা জানেন না তাঁদেরও জানার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। যেমন অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না, তেমনি পেটের খিদে যখন শক্ত সামর্থ্য শরীরকে বেঁকিয়ে দেয়, তখন বারে বারে ফিরে আসেন মার্কস। এখন তো পশ্চিমবাংলায় শুধুমাত্র মার্কস, লেনিন কিংবা কমিউনিস্ট স্বাধীনতা সংগ্রামীরাই আক্রান্ত নয়; আক্রান্ত রবীন্দ্রনাথ, গান্ধীজী, সুভাষচন্দ্র, আম্বেদকর, রাহুল সংকৃত্যায়ন প্রমূখ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, বহুত্ববাদী, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ‘ভারত ভাবনা’র নির্মাতারা।

স্বৈরাচারের টিকি যেখানে বাঁধা

১৯৯১ সালে পুঁজিবাদী বিশ্বের অংশ হিসাবে ভারতেও নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি চালু হয়। খোলা বাজার অর্থনীতির স্বার্থে কাঠামোগত সংস্কারের নামে তখন থেকেই অর্থনীতি পরিচালনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের অবনমনের সূত্রপাত। নয়া উদারবাদের বেপরোয়া প্রয়োগ তিন দশক অতিক্রম করে গেছে। ২০১৪ সাল থেকে চলমান হিন্দুত্ব-কর্পোরেট শাসনে লুটেরা পুঁজি ও ক্রোনি পুঁজির দাপটে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র বিপর্যয়ের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী লুটে নির্দিষ্ট কয়েকটি কর্পোরেটের মুনাফা বাড়লেও দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমানভাবে নিম্নগামী।

আজ শ্রমিক, কৃষক, খেতমজুর, মধ্যবিত্ত কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত এবং তরুণ প্রজন্ম কেউ ভালো নেই। প্রত্যেকের জীবনে সংকট ও অনিশ্চয়তার আশঙ্কা। পৃথিবীর ‘তরুণতম’ দেশ ভারত, অথচ বেকারত্বের হারে পৃথিবীর শীর্ষ স্থানে ভারত। নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি ভারতের সমাজ অর্থনীতিতে সৃষ্টি করেছে গভীরতম বৈষম্য। এখানে এক শতাংশ মানুষের হাতে সমাজের ৪১শতাংশের বেশি সম্পদের দখলদারি। অপার সম্ভাবনাময় ভারতীয় সমাজ অর্থনীতির এ শুধু লজ্জা কিংবা যন্ত্রণা নয়, গভীরতর অসুখের প্রতিচ্ছবি।

গত ১২বছরের অভিজ্ঞতায় মানুষের উপলব্ধি, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ‘পদপ্রার্থী’ নরেন্দ্র মোদীর প্রতিশ্রুতিতে তারা ঠকেছেন। দেশে ‘সুদিন’ আসলে লুটেরা পুঁজি এবং ক্রোনি পুঁজির। সর্বব্যাপী লুট এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত। তরুণ প্রজন্ম তা উপলব্ধি করছেন। সর্বত্র নেই রাজ্যের গোলকধাঁধায় কর্পোরেটের মুনাফা তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ কিংবা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবি এক-একটি নির্দিষ্ট স্ফুলিঙ্গ। আসল বারুদের স্তূপ অর্থনৈতিক বিপর্যয়, জীবন-জীবিকার সঙ্কট এবং অন্ধকারময় ভবিষ্যৎ। তাই তো মানুষ রুখে দাঁড়াতে চাইছেন।
আরএসএস-বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে। বিপরীতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মেহনতিদের রাজনীতির পক্ষে আমাদের শ্রেণি সমাবেশ ঘটানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। সম্ভাবনা কার্যকর করতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিতে হবে। আরএসএস’র বিরুদ্ধে খেটেখাওয়া মানুষের মধ্যে শ্রেণি ঘৃণা সঞ্চারিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে মতাদর্শ ও রাজনীতির নিরন্তন সংগ্রাম এবং হিন্দুত্ব কর্পোরেটের আধিপত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শ্রমজীবী মানুষের কাজ, মজুরি, জমি, আবাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতিটি সংগ্রামের দ্বান্দ্বিক ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। নিঃসন্দেহে এই দ্বিমুখী লড়াই অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়, বরং বিকল্পহীন এবং অনিবার্য।


রাজনৈতিক হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে মতাদর্শ ও রাজনীতির নিরন্তন সংগ্রাম এবং হিন্দুত্ব কর্পোরেটের আধিপত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শ্রমজীবী মানুষের কাজ, মজুরি, জমি, আবাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতিটি সংগ্রামের দ্বান্দ্বিক ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি। নিঃসন্দেহে এই দ্বিমুখী লড়াই অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়, বরং বিকল্পহীন এবং অনিবার্য।

Comments :0

Login to leave a comment