Post Editorial

গেরুয়াকরণই স্কুলস্তরে পাঠ্যসূচি পরিবর্তনের মূল অভিমুখ

সম্পাদকীয় বিভাগ


শ্রুতিনাথ প্রহরাজ 
রাজ্যে নতুন সরকার যেভাবে সরকারি স্কুলগুলিতে বন্দেমাতরম সঙ্গীতের প্রথম ১২লাইন ছেড়ে পুরো অংশ গাওয়া বাধ্যতামূলক করেছে, তা নিয়ে বিতর্কের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এ ধরনের যে কোনও সিদ্ধান্ত-এদেশের ধর্মনিরপেক্ষ বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ভাবনার পরিপন্থী। ভগবতগীতা বা কোরান বা বাইবেলের কোনও অংশ যে কেউ ধর্মস্থানে বা বাড়িতে বসে পাঠ করতে পারেন, আপত্তির প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু তা যদি শাসকদলের রাজনৈতিক স্বার্থে (এদেশে যেমন শিক্ষার গেরুয়াকরণের কর্মসূচি) রাষ্ট্রের উদ্যোগে শিক্ষাঙ্গনে নিরপরাধ ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে প্রার্থনা সঙ্গীত হিসাবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তার ফল স্কুলের ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিসরে নেতিবাচক হতে বাধ্য।  
এখন রাজ্য এবং কেন্দ্র দুই সরকারেরই ইঞ্জিন নাগপুর থেকে রিমোটে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে আগামী পাঁচ বছর রাজ্যের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। রাষ্ট্র ক্ষমতায় (কেন্দ্র-রাজ্য উভয় ক্ষেত্রেই) হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক ও প্রচারক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) নিয়ন্ত্রণ যত বাড়বে, এই পরিবর্তনের গতি পাল্লা দিয়ে ততটাই বাড়তে থাকবে। এই বাংলার দীর্ঘদিনের লালিত কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরম্পরার সঙ্গে এই পরিবর্তন কতটা মানানসই হবে সেটাই এখন প্রধান বিচার্য বিষয় এবং অভিজ্ঞতার নিরিখে খানিকটা আশঙ্কারও।
রাজ্যের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গড়ে উঠতে মাসাধিক কাল সময় লেগেছে। এর প্রধান কারণ হলো, গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রকে আরএসএস’র সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করা-যার মধ্যে অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রক অন্যতম। বিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত দু’জনেই সঙ্ঘের ঘনিষ্ঠ মানুষ। তাই শুরুতেই ঘোষণা করা হয়েছে, ‘২০২৮সালের মধ্যে রাজ্যের শিক্ষার খোলনোলচে পালটে দেওয়া হবে।’ ইতিমধ্যে ঘোষণা অনুযায়ী বিদ্যালয় শিক্ষার পাঠক্রম ও পাঠ্যসূচি বদলানোর জন্য কমিটি তৈরি হয়েছে। বলা হয়েছে নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ দ্রুত কার্যকর করবার প্রশ্নে এই কমিটি কাজ করবে। এই কমিটি ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে, স্কুলের বাংলা বই থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতা সরিয়ে ২০২৭ সাল থেকে ‘শিবাজী উৎসব’ পড়ানো হবে। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, পাঠ্যসূচি বদলের প্রধান অভিমুখ এর থেকেই পরিষ্কার।
বিগত সরকারের দেড় দশক সময়কালে এ রাজ্যের প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ, মধ্যশিক্ষা পর্ষদ, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদগুলি কার্যত অকেজো করে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছিল। শিক্ষা দুর্নীতির একটা বড় অংশ এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে কাজে লাগিয়ে করা হয়েছে। তারও আগে আমরা লক্ষ্য করেছি, পাঠ্যসূচি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাজ্য শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পর্ষদের (এসসিইআরটি) পাশাপাশি বিদ্যালয় শিক্ষার পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত এই সংস্থাগুলি একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। বিশেষজ্ঞ ছাড়াও সর্বস্তরের শিক্ষকরা এই পাঠ্যসূচি বদল প্রক্রিয়ায় মতো বিনিময়ের সুযোগ পেতেন। নতুন সরকার যে কমিটি করেছে সেখানে এই সংস্থাগুলির ভূমিকা কী হবে তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। শিক্ষায় বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণের লক্ষ্যে দেশজুড়ে শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনায় কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা যত বাড়ছে, রাজ্যভিত্তিক শিক্ষা পরিচালনার এই সংস্থাগুলির অস্তিত্বের বিপন্নতা তৈরি হচ্ছে। বিগত সরকার এই স্বশাসিত সংস্থাগুলির গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছিল। সেই থেকে এগুলির পরিচালনায় সাধারণ শিক্ষকদের ভূমিকা ছিল না বললেই চলে। বর্তমান সরকার নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির পথ ধরে এগুলির ঝাঁপ বন্ধ করে দেয় কিনা তাই এখন প্রধান বিচার্য বিষয়। যদি তা না হয়, তবে এই সংস্থাগুলির পরিচালনায় সর্বস্তরের শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই পাঠ্যসূচির আমূল সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে পারস্পরিক মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রথম দফায় এনডিএ সরকার তৈরি হওয়ার পর তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী মুরলীমনোহর যোশীর নেতৃত্বে পাঠ্যসূচির গেরুয়াকরণের কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। যদিও যোশী তখন এই ‘গেরুয়াকরণ’ শব্দটা মানতে চাননি। তাঁর মতে ওটা ছিল পাঠ্যসূচির সামগ্রিক যৌক্তিকরণ কর্মসূচি। অথচ সেই সময় যা ঘটেছিল তা ছত্রে ছত্রে অযৌক্তিক। সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠদের নিয়ে রাতারাতি ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্কের (এনসিএফ) মাধ্যমে নতুনভাবে সবটা তৈরি করে, পাঠ্যসূচির দ্রুত হিন্দুত্বকরণের চেষ্টা হয়েছিল। জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পর্ষদের (এনসিইআরটি) তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যপুস্তকগুলি রাতারাতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যেগুলি তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রগতিশীল, মুক্তমনা, যুক্তিবাদী শিক্ষাবিদদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। রোমিলা থাপার, রামশরণ শর্মা প্রমূখ খ্যাতনামা ইতিহাসবিদদের রচনাগুলি এনসিইআরটি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। 
সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের বইগুলিতে মারাত্মক সব পরিবর্তন লিপিবদ্ধ করা হয়, যা শুধু ইতিহাসের বিকৃতি নয় অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক। সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যবইতে লেখা হয়েছিল, ‘আমরা মনুর সন্তান বলেই মনুষ্য বা মানব নামে পরিচিত।’ ‘বিজ্ঞানীরা উদ্ভিদকে জড় পদার্থ হিসাবে গণ্য করেন, অপরদিকে হিন্দুরা সেগুলিকে সজীব ও প্রাণযুক্ত বলে মনে করেন!’ ইতিহাসকেও নানাভাবে বিকৃত করা হয়। এনসিইআরটি’র প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বই থেকে গোমাংস ভক্ষণ ও পশু বলিদান অংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক ও শিলালিপির আলোকে পুরাণ ও মহাকাব্যিক ঐতিহ্যের সমালোচনামূলক মূল্যায়ন, বর্ণভেদ প্রথার শোষণমূলক ও আদর্শগত দিক, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা থাকা সত্ত্বেও অশোকের প্রতি ব্রাহ্মণদের শত্রুতার ব্যাখ্যা ইত্যাদি অধ্যায়গুলি ইতিহাস বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। নতুন ইতিহাসের বইগুলিতে হিন্দু সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম এবং মুসলিম শাসকদের কার্যকালকে ছোট করা হয়েছিল। এসব কাজেরই মতাদর্শগত ভিত্তি ছিল মূলতঃ বর্জনমূলক হিন্দু জাতীয়তাবাদ যা ভারতীয় সংবিধানের আত্মিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণ গ্রহণমূলক যার সাথে এই সংস্কার মেলে না। তবু আরএসএস পাঠ্যসূচির এই সংস্কারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল, কারণ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথম রাষ্ট্রক্ষমতায় আরএসএস’র সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর ভূমিকায় এসেছিল। ওরা জানতো, ইতিহাসের এ ধরনের সাম্প্রদায়িক ভাষ্য হলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের হাতিয়ার। তাই, কুতুবমিনারকে বলা হয়েছিল বিষ্ণুস্তম্ভ, তাজমহলকে একটি শিবমন্দিরের নামে তেজো মহাল ইত্যাদি।
নয়া জাতীয় শিক্ষানীতির মাধ্যমে আরএসএস-বিজেপি সরকার রাজ্যগুলির ক্ষমতা অনেকটাই খর্ব করেছে। স্কুলশিক্ষার কাঠামো একতরফা বদলে ৫+৩+৩+৪ করা হয়েছে। এখন এই নতুন কাঠামোর উপযোগী অভিন্ন ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ২০২৩ তৈরি করা হয়েছে। এই এনসিএফ-র প্রধান লক্ষ্যই হলো নতুন শিক্ষানীতি কার্যকর করবার মধ্য দিয়ে, এদেশে দীর্ঘদিনের লালিত বৈচিত্রের মধ্যে একতার ঐতিহ্যের শ্বাসরোধ করা। অথচ, প্রথম এনডিএ সরকার পতনের পর প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলে ২০০৫ সালে তৈরি হওয়া নতুন এনসিএফ-র দলিলে স্পষ্ট বলা ছিল, এদেশের শিক্ষা পরিকাঠামোয় একটি বিস্তৃত পরিসর রাখা উচিত, যার ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজ্যে পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যপুস্তক প্রস্তুত করা যেতে পারে। এর দ্বারা সেই বৈচিত্রের মধ্যে একতার সুরকে রক্ষা করা সম্ভব। এনসিএফ ২০২৩ -এর ঠিক উলটো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। ভারত সম্পর্কিত ধারণা ও প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান চর্চার নামে নতুন পাঠ্য বই লেখা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে এনসিইআরটি-র কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটিয়ে একে ‘ডিমড টু বি ইউনিভার্সিটি’ বা প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর মাথায় বসানো হয়েছে এ দেশের তন্ত্রমন্ত্র ও রামায়ণের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক দীনেশ প্রসাদ সাকলানিকে। ঠিক যেমন সুদর্শন রাওকে আনা হয়েছিল ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পর্ষদ (আইসিএইচআর)’এর মাথায় মতাদর্শগত পরিবর্তন ও বিকৃত ইতিহাস রচনার লক্ষ্যে। ফান্ডিং-এর কাজ সরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেও (ইউজিসি) শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণের কাজে পুরোদস্তুর যুক্ত করা হচ্ছে। সেখানেও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি। একইভাবে সমস্ত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সংস্থা, আইআইটি সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দখলদারি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, শিক্ষার সর্বস্তরে সার্বজনীন মূল্যবোধের পরিবর্তে ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞানের আড়ালে সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের শিক্ষা প্রচলন করা।  
নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে গত ১২ বছরে দেশজুড়ে পাঠ্যসূচির যে পরিবর্তন হয়েছে, আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম কিছু হবে এমনটা ভাবা ভুল। কারণ এখানেও রাজ্যের বাস্তবতাকে এড়িয়ে এনসিইআরটি ও এনসিএফ মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করবে। একনজরে গত প্রায় একদশকে বিজ্ঞান ইতিহাস সহ অন্যান্য পাঠ্যপুস্তকগুলিতে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে বা আনার চেষ্টা চলছে তা একঝলক দেখে নেওয়া যেতে পারে। তবেই আশঙ্কার কারণ স্পষ্ট হবে। হিন্দুত্বের আদর্শ এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ভারতবর্ষের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রাচীন পরম্পরাকে অস্বীকার করে ইতিহাসের পুনর্লিখন চলছে। যা দেখে ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব বলতে বাধ্য হয়েছেন, “এরা হিস্ট্রি নয়, হিস্টিরিয়া তৈরি করতে চাইছে”। ভারতীয় ইতিহাসের বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক যে ধারণা বর্তমান, তাকে বিকল্প ভাষ্য তৈরির মাধ্যমে পালটে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে দানব হিসাবে তুলে ধরতে, তাদের অন্য অবদানগুলিকে মুছে ফেলা বা বিকৃত করার চেষ্টা হচ্ছে। এটি এই সময়ের একটি গুরুতর সমস্যা, যার সম্ভাব্য সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক পরিণতিতে দেশের ঐক্য সংহতি ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র বিপদের মুখে পড়েছে।

চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বে কোপ পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের বহু দেশে ধর্মীয় সম্প্রদায়িক শক্তি ও রক্ষণশীল গোষ্ঠী ডারউইনের এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেছে। তবু অনেক দেশে পড়ানো চলছে। পাকিস্তান সহ সৌদি আরব, ওমান, আলজেরিয়া, মরক্কোতে ডারউইন নিষিদ্ধ। হিন্দুত্ববাদীদের চাপে পড়ে ভারতও সেই তালিকাভুক্ত হলো। বাদ পড়েছে মাধ্যমিক স্তরের পর্যায় সারণিও, যা রসায়ন শাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতা আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর অবদানের অংশ এবং গান্ধীহত্যার পর্ব অনেকটাই ছোট করা হয়েছে। এখন আর বোঝা যাবে না কে বা কারা ছিলেন গান্ধীহত্যার ষড়যন্ত্রকারী। বাবরি মসজিদ ধ্বংস, গুজরাটের দাঙ্গা ইত্যাদি যে যে বিষয়গুলি চর্চায় বর্তমান কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদলের অস্বস্তি বাড়তে পারে, পরিকল্পনামাফিক তার সবটাই বাদ দেওয়া হয়েছে অথবা শিরোনামের এমন বদল করা হয়েছে যাতে প্রকৃত দোষীদের আড়াল করা যায়। এদেশে নানা সময়ে ‘সংস্কৃতির সংঘাত’, ‘শিল্প বিপ্লব’, ‘গণতন্ত্র ও বৈচিত্র’, ‘গণতন্ত্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ’, ‘জনপ্রিয় সংগ্রাম ও সামাজিক আন্দোলন’ ইত্যাদি অধ্যায়গুলি নানা স্তরের পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের বই থেকে বর্ণভেদ প্রথা যা এদেশের এক চরম অভিশাপ, তাকে অনেকটাই ছোট করা হয়েছে। ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের অনুসারী শাসকদলের কাছে এটাই কাম্য। 
মুঘল যুগ ও দিল্লি সুলতানী আমলের ইতিহাসের বেশিরভাগ অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। যেটুকু আছে তাও ইতিহাসকে বিকৃত করে। সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে সরস্বতীর নাম যুক্ত হয়েছে। আর্যরাই এদেশের প্রাচীন অধিবাসী, আর্যরাই শ্রেষ্ঠ—এই ভ্রান্ত ধারণা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয়গুলিকে পরিকল্পনামাফিক বিকৃত করা হচ্ছে। ইতিহাসের বইতে বলা হয়েছে, সুলতানদের বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য হিন্দু রাজাদের দেবতারা অস্ত্র সরবরাহ করেছেন! বিজ্ঞানের সাথে পৌরাণিক কাহিনি ও কল্পবিজ্ঞানের মিশেল ঘটিয়ে অদ্ভুত সব গল্পকথা বিজ্ঞানের অংশ হিসাবে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। ইংরেজি ও গণিতের বইয়ের নাম পালটে সন্তুর, ম্যাথস মেলা, বাঁশুরি, পূর্বী, গণিত প্রকাশ ইত্যাদি উদ্ভট সব নাম রাখা হচ্ছে! নতুন করে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচি আরও বদলে লক্ষ্যে সঙ্ঘ প্রচারক ও সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে স্বতন্ত্র সিলেবাস কমিটি তৈরি হয়েছে। ছাত্র ও শিক্ষকদের সংগঠনগুলি এ নিয়ে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েও লাভ হয়নি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কত বিপদ অপেক্ষা করে আছে কে জানে?
এখন আশঙ্কা এ রাজ্যের স্কুলস্তরে পাঠ্যসূচির যে পরিবর্তন ঘটতে চলেছে তার প্রধান অভিমুখ নিয়ে। রাজ্যের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র মেনে প্রকৃত অর্থে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়ে যদি আধুনিক, বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর পাঠ্যসূচি নির্মাণ হয়, অবশ্যই তার সমর্থনে সরকারকে সাধুবাদ জানাবো। আর তা না করে যদি এনসিইআরটি-র এখনকার সিলেবাস এ রাজ্যে অন্ধ অনুকরণ করা হয় তবে  শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত সর্বস্তরের মানুষকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আন্দোলনে শামিল হতেই হবে। হিন্দুত্ববাদের ল্যাবরেটরিতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের এভাবে গিনিপিগ হতে দেখে আমরা চুপ থাকতে পারি না।

Comments :0

Login to leave a comment