Development and Unemployment

মমতার উন্নয়নে এত বেকার এল কিভাবে

সম্পাদকীয় বিভাগ

অর্ধেন্দু সেন
কতো আবেদন জমা পড়েছে যুবসাথী প্রকল্পে সহায়তার জন্য? অন্তত ৮৪ লক্ষ। অনলাইন আবেদনপত্র ধরলে মোট সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। কি  বলবেন? সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ ? মমতা কিন্তু বেকায়দায়। নতুন প্রকল্পে সাড়া মিলেছে এটা আনন্দের কথা। আবেদনকারীরা বুঝবে যে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা না থাকলে এতদিনে তাদের পকেটে টাকা ঢোকা শুরু হয়ে যেত। তারা আশায় আশায় থাকবে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত। ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন ঘটবে মমতার তাই ‌আশা। কিন্তু রাজ্যে এত বেকার ছেলেমেয়ে এল কোত্থেকে? আবেদনকারীকে কর্মহীন হতে হবে। এটা কিন্তু প্রকল্পের শর্ত।  ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে মমতা নাকি ২ কোটি নতুন চাকরি দিয়েছেন। বছরে ১৪ লক্ষ। এতদিন রাজ্যের মানুষ বুঝে উঠতে পারেননি এই চাকরি কোথায় হলো। কারা পেল। এখন নতুন করে বুঝতে হচ্ছে ২ কোটি চাকরি হবার পরেও এক কোটি বেকার কোথা থেকে এল? কোথায় আত্মগোপন করেছিল তারা?
প্রতি বছর বেঙ্গল বিজনেস সামিটের শেষ পর্বে মমতা ঘোষণা করেন কতো বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। সংখ্যাটা সাধারণত দুই লক্ষ কোটির একটু বেশিই হয়। মোট বিনিয়োগ নিশ্চয়ই কুড়ি লক্ষ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। সেই সঙ্গে নিশ্চয়ই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কর্মসংস্থান। কিন্তু তাই যদি হয় তাহলে তো মুখ্যমন্ত্রীকে রোজই কোথাও না কোথাও ফিতে কাটতে হয়। তাতো আমরা দেখি না! এই সমস্যার সমাধান করেছে এমএসএমই— ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। আগে আমরা বলতাম এসএসআই-ক্ষুদ্রশিল্প। এককালে সেলফ হেল্প গ্রুপ নামও চালু ছিল। নাম যাই হোক ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগ হয়, কর্মসংস্থান হয়, রপ্তানিও হয়। কিন্তু জমির সমস্যা হয়না আর ফিতে কাটতে হয় না।
এনডিটিভি-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে টিএমসি’র এক সাংসদকে বলতে শুনলাম বছরে ১৪ লক্ষ চাকরির বেশিরভাগ হয়েছে এমএসএমই -তে  যার সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ৯০ লক্ষে। দিল্লিতে বিদেশি ডেলিগেটদের সমাগম হলে পিএম মোদী রাস্তার ধারে পাঁচিল তুলে দেন যাতে গরিব মানুষ তাঁদের চোখে না পড়ে। বাংলায় এমএসএমই আড়াল করে চাকরি প্রাপ্তদের। বহু বছর ক্ষুদ্র শিল্প দপ্তরে কাজ করেছি বলে জানি এই শিল্পে প্রধান সমস্যা হলো অর্ডার পাওয়া আর পাওয়া গেলে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল জোগাড় করা। ১৯৯০-এর দশকের উদারীকরণের পরে এই সমস্যা নিশ্চয়ই কমেছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে নিশ্চয়ই ক্ষুদ্র শিল্পকে একটা ভালো জায়গায় পৌঁছে দেওয়া যেত। মমতা সরকার যে কিছুই করেনি তা বলছি না।  বিশেষ বিশেষ জায়গায় বিশ্ব বাংলা বিপণন কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ভালো উদ্যোগ। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা নগণ্য। এমএসএমই -র সংখ্যায় আমরা দেশে দ্বিতীয়। কিন্তু মোট বাণিজ্যের নিরিখে আমরা পিছিয়ে।
সম্ভাবনা কিন্তু ছিল আরও ভালো করবার। বাম সরকারই জমিটা প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন। কেন্দ্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও বাম জমানায় রাজ্য ক্ষুদ্র শিল্পে সাফল্য পায় যার ভিত্তি ছিল কৃষিতে সাফল্য। বৃহৎ শিল্পে সে সুযোগ পাওয়া যায়নি কারণ লাইসেন্স রাজ শেষ হবার পরেও শিল্পপতিরা কেন্দ্রের পছন্দমতো বিনিয়োগ করেছে। হলদিয়া পেট্রোকেমিকালসের কথা সবার মনে আছে। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় অর্থনীতিতে উদারীকরণ এল। যে ব্যবস্থা এতদিন ছিল ক্ষুদ্র শিল্পের সহায়ক সে হয়ে গেল তার ঘোর বিরোধী। তাই ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গেও নতুন শিল্পনীতি গ্রহণ করতে হয়।
বামফ্রন্টের প্রধান অস্ত্র ছিল জমি বণ্টন এবং বর্গাদারদের নথিভুক্তি। পশ্চিমবঙ্গ ১৯৬০-এর দশকের সবুজ বিপ্লবে উপকৃত হয়নি। ১৯৮০ পর্যন্ত কৃষিতে কোনও উন্নতি হয়নি। তারপর মোট উৎপাদন তো বাড়লই রাজ্য ধান আলু এবং শাক সবজি চাষে অন্য রাজ্যদের ছাড়িয়ে গেল। রাজ্যে তখন ক্ষুদ্র শিল্পে যে উন্নতি হয়েছিল তা এরই ফল। মমতা এসে জমি বণ্টন বন্ধ করে দিয়েছেন। যে জমি একসময়ে প্রান্তিক চাষির হাতে এসেছিল তাও ফিরে গেছে বড় চাষির হাতে। বর্গা রেকর্ড এখন বর্গাদারের কাজে লাগে না। এমতাবস্থায় ক্ষুদ্র শিল্পে কেন সুদিন আসবে? মহাকালের কৃপা?
কিন্তু ভালো কাজ তো চিরকাল আড়াল করা যায় না। বাংলায় বেকারত্ব অন্য রাজ্যের তুলনায় যে কম সে কথা তো কেন্দ্রের সর্বশেষ রিপোর্টই বলছে। মুখ্যমন্ত্রী সে কথা নিজে জানিয়েছেন সাংবাদিক সম্মেলনে। ২০২৫-এর সমীক্ষায় দেখা গেছে আমাদের রাজ্যে বেকারি ২.২ পারসেন্ট যেখানে গোটা দেশের গড় ৩.২ পারসেন্ট। এমনিতে কেন্দ্রের কোনও রিপোর্টকে মুখ্যমন্ত্রী মূল্য দেন না। আইএমএফ যাদের রিপোর্টকে ভুল বলে সে রিপোর্ট আমরা মেনে নেব? এই একটা রিপোর্ট কিন্তু ওনার পছন্দ হয়েছে। কেউ বলেনি যে এই রিপোর্ট ভুল। তবে এর জন্য যদি ক্রেডিট নিতে হয় তাহলে তা তামিলনাডু, কর্নাটক, অন্ধ্র আর ওডিশার মুখ্যমন্ত্রীদের বাদ দিয়ে নিশ্চয়ই নয়! পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা এখন ২৫ লক্ষ তো হবেই। মোদীজি যখন চাকরি দেবার কথা বলেন তিনি ইউক্রেন আর ইজরায়েলের চাকরি হিসাব নিয়েই বলেন। মমতা যখন কর্মসংস্থানের হিসাব দেন তখন কিছু রাজ্যকে ধরে নিয়েই তা দেওয়া উচিত।
মুখ্যমন্ত্রী এও জানিয়েছেন যে ১ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষ দারিদ্রসীমার উপরে উঠে গেছেন। অতি সম্প্রতি আমরা দেখেছি এসআইআর-এ একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের নাম বাদ গেল বিপুল সংখ্যায়। মমতা যাদের দারিদ্রসীমার নিচ থেকে টেনে তুলেছেন তাঁদের মধ্যে তৃণমূল সম্রদায়ের সংখ্যাধিক্য থাকতেই পারে। সেটা বড় কথা নয়। দুঃখের বিষয় এই যে বাম আমলে দারিদ্র কমেছিল গ্রামেগঞ্জে। এখন শহরাঞ্চল এই সুযোগ বেশি পাচ্ছে। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে পশ্চিমবঙ্গ ছিল এক নম্বর উন্নত রাজ্য। ছোটবেলায় দেখা চৌরঙ্গিতে কাঁচি সিগারেট আর ব্রুকবন্ড চায়ের ঝলমলে বিজ্ঞাপন কি কোনোদিন ভুলতে পারব? সেই উন্নয়ন কিন্তু সীমাবদ্ধ ছিল চৌরঙ্গি আর পার্ক স্ট্রিটের মধ্যে। বামেরাই এই গণ্ডি পেরিয়ে উন্নয়নকে ছড়িয়ে দেয় পুরো রাজ্যে। এখন আবার উন্নয়নের পরিধি সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র বাড়ছে অনেক বেশি। উন্নয়নের এই মডেলে আমাদের আপত্তি আছ বৈকি।
মমতার উন্নয়নের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কিছু অনুদান প্রকল্পে বিপুল অর্থ স্রেফ বিলি করে দেওয়া। একই সঙ্গে সরকারের উপার্জন না বাড়লে এই খয়রাতি একসময়ে বাধ্য হয়ে চালিয়ে যেতে হয় ধারের টাকায়। মমতা যেমন ৬-৮ লক্ষ কোটি টাকা ধার করেছেন। এই টাকা সময়মতো ফেরত না পেলে ব্যাঙ্ক আর টাকা দেবে না। তখন আর রাখঢাক না করে আদানি আম্বানিদের শরণাপন্ন হতে হবে।

২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে মমতা নাকি ২ কোটি নতুন চাকরি দিয়েছেন। বছরে ১৪ লক্ষ। এতদিন রাজ্যের মানুষ বুঝে উঠতে পারেননি এই চাকরি কোথায় হলো। কারা পেল। এখন নতুন করে বুঝতে হচ্ছে ২ কোটি চাকরি হবার পরেও এক কোটি বেকার কোথা থেকে এল? কোথায় আত্মগোপন করেছিল তারা?

Comments :0

Login to leave a comment