বাসব বসাক
‘ন্যায় দো ইয়া মার দো’, অর্থাৎ হয় ন্যায় দাও না হয় মেরেই দাও আমাদের– গত ৩ জুলাই থেকে এই স্লোগানে উত্তাল মধ্য প্রদেশের ছাত্তারপুর জেলার কুপি গ্রাম। আদিবাসী প্রধান কুপি গ্রামের বারানা নদীর সেতুর নিচে কয়েকশো’ মানুষ পায়ের পাতা ডোবা স্বচ্ছতোয়া নদীর বুকে চিতা সাজিয়ে শুয়ে আছেন। গত ৬ জুলাই থেকে জয় কিষান সংগঠনের নেতা অমিত ভাটনগরের সঙ্গে সেখানে অনশন শুরু করেছেন বেশ কয়েকজন। কারা এরা? এরা বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের গোন্ড ও কোল জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ; যারা ভারতের আদিমতম জনজাতি গোষ্ঠীগুলির অন্যতম। আর্যদের ভারতে আগমনেরও অনেক আগে, আনুমানিক ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকেই এই এলাকায় কোলদের বাস। গবেষকদের মতে গোন্ড জনজাতির মানুষের ইতিহাসও অন্তত ৪০০০ বছরের পুরানো। ঋগ্বেদ বা মার্কন্ডেয় পুরাণেও কোল জনজাতির উল্লেখ আছে। নবম শতাব্দীতে গোন্ড রাজার রাজত্ব চলেছে এ’ অঞ্চলে। ১৫৬৪-তে গোন্ড রাজ্যের রানি দুর্গাদেবী বীরাঙ্গনার মতোই আকবরের সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করেছেন রাজ্য রক্ষায়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ১৮৩১-৩২ এর কোল বিদ্রোহ অথবা ১৯১০-এ ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে গোণ্ডদের বস্তার বিদ্রোহ ইতিহাসের পাতায় আজও অমলিন। গোণ্ড শব্দের অর্থই হলো সবুজ পাহাড়ের মানুষ। উষর বুন্দেলখণ্ডের জল জমি পাহাড় জঙ্গল– সব কিছুই ঐতিহাসিকভাবেই তাদের। অথচ তথাকথিত উন্নয়নের ধাক্কায় কেন আর বেতোয়া নদীর অন্তর্বর্তী বুন্দেলখণ্ডের বিস্তীর্ণ এলাকার জল জমি জঙ্গলের হাজার বছরের উত্তরাধিকার থেকে উৎখাত হতে হচ্ছে এই প্রাচীন জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষগুলোকে। কেন ও বেতোয়া নদী দু’টিকে জুড়ে দেওয়ার জন্য ৪৪৬০৫ কোটি টাকার এক সুবিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। ইতিমধ্যেই গত ২০২৪-এর ২৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী খাজুরাহোতে মহাযজ্ঞ করে সূচনা করেছেন ভারতের এই প্রথম নদী সংযোগ প্রকল্পটির। এর আগে ২০২১-এর ২২ মার্চেই কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রক উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশ সরকারের সঙ্গে এই প্রকল্প বিষয়ক চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ২২১ কিলোমিটার খাল কেটে এবং আরও ২ কিলোমিটার সুড়ঙ্গ তৈরি ক’রে সংযুক্ত করা হবে নদী দুটিকে। মধ্য প্রদেশের ছত্তারপুর জেলায় কেন নদীর ওপর গড়ে তোলা হবে ৭৮.৮ মিটার উঁচু দৌধন বাঁধ। স্থাপিত হবে ১০৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। সঙ্গে থাকবে আরও ২৭ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও। নদী সংযোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে নদীর নিম্ন প্রবাহে তৈরি হবে কোঠা ব্যারাজ এবং আরও দু’টি বাঁধ– ওর বাঁধ ও বিনা বাঁধ। কেন ও বেতোয়া দুটিই যমুনার উপ নদী। ইতিহাসের কর্ণাবতী ও বেত্রাবতীই আজকের কেন ও বেতোয়া। ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ কেন নদী মধ্য প্রদেশের কৈমুর পাহাড়ে জন্ম নিয়ে উত্তর বাহিনী হয়ে পান্না অরণ্য আর বুন্দেলখণ্ডের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উত্তর প্রদেশের চিল্লা গ্রামের কাছে যমুনায় মিশেছে। আর ৫৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ বেতোয়া রাইসিনের কাছে বিন্ধ্যা পর্বত থেকে উৎপত্তি লাভ ক’রে উত্তর মুখে বুন্দেলখণ্ডের বুক চিরে বয়ে গিয়ে মিশেছে যমুনায়। সরকারের দাবি এ দু’টি নদীর সংযুক্তি ঘটলে বুন্দেলখণ্ডের মধ্যবর্তী মধ্য প্রদেশের পান্না, টিকমগড়, ছাত্তারপুর, বিদিশা অথবা উত্তর প্রদেশের বান্দা, মাহোবা, ঝাঁসির মতো ১৩ টি জেলা মুক্তি পাবে তীব্র জল সঙ্কট থেকে। সেচ সেবিত হবে ১০.৬২ লক্ষ হেক্টর জমি। সংস্থান হবে ৬২ লক্ষ মানুষের পানীয় জলের। উপরি পাওনা হিসাবে জলবিদ্যুৎ তো আছেই। কেন-বেতোয়া নদী সংযুক্তির মধ্যেই বুঝি লুকিয়ে আছে উষর তাপদগ্ধ বুন্দেলখণ্ডের সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা হ’য়ে ওঠার মূল মন্ত্রটি। যদিও আইআইটি, মুম্বাইয়ের বিজ্ঞানীরা নদী সংযুক্তির ফলে বুন্দেলখণ্ডের মাটি ও বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হওয়ার কারণে সেপ্টেম্বরে অন্তত ১২ শতাংশ কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে যে কথা সরকার জানাচ্ছে না তা হলো এই প্রকল্প রূপায়ণের পথে তীব্র জলস্রোতে স্রেফ ডুবে যেতে চলেছে ব্যাঘ্র সংরক্ষণের জন্য খ্যাত পান্না জাতীয় উদ্যানের ৯৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। কেন ঘড়িয়াল অভয়ারণ্যও চরম ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছে। একইভাবে বিপন্নতার মুখে পড়বে শকুনের দল। কেননা ওই এলাকাটি ইতিমধ্যেই বিপন্ন শকুনদের বাসা বাঁধার অন্যতম কেন্দ্র। কাটা পড়তে চলেছে অন্তত ৩০ লক্ষ গাছ। সেই সঙ্গে বাস্তুহারা হতে চলেছে গোণ্ড ও কোল জনজাতির প্রায় সাত হাজার পরিবার – সরকারি হিসাবেই ছাত্তারপুরে ৫২২৮ টি পরিবার এবং পান্নায় ১৪০০ টি পরিবার; যদিও সংখ্যাটি আসলে আরও কিছু বেশিই। সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যানের নিবিড়তম অঞ্চলে নির্মাণ কাজের অনুমোদনের বৈধতা থেকে শুরু করে অতি দ্রুততায় পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়া— কোনও কিছুই প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়। সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অন ড্যামস রিভার অ্যা ন্ড পিপলের পক্ষ থেকে শ্রী হিমাংশু ঠক্কর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন পরিবেশ ছাড়পত্রের প্রতিটি ধাপেই উপেক্ষিত হয়েছে বিশেষজ্ঞদের মত। এমনকি মহামান্য সর্বোচ্চ আদালতের কেন্দ্রীয় বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটিও বন্যপ্রাণ বিষয়ক ছাড়পত্র ও এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এতগুলো পরিবারেরই বা কী হবে? কোথায় যাবে এরা নিজেদের সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে! সরকার প্রথমে একতরফা পরিবার পিছু মাত্র পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করেছিল। তারই প্রতিবাদে গত এপ্রিলে আদিবাসী জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ, বিশেষত মহিলারা নদীর তীরে কখনো প্রতীকী চিতা সাজিয়ে, কখনো গলায় ফাঁসির দড়ি জড়িয়ে প্রতিবাদ জানানো শুরু করেন। পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে গায়ে জন্মভূমির মাটি লেপে গলায় প্রতীকী ফাঁস লাগিয়ে খোলা আকাশের নিচে চিতা সাজিয়ে শুয়ে থাকে দিনের পর দিন। ন্যায়ের দাবিতে আদিবাসীদের তেজোদীপ্ত চিতা আন্দোলনের কাছে সাময়িকভাবে মাথা নত করতে বাধ্য হয় সরকার। সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর আন্দোলন প্রত্যাহার করেন তাঁরা। কিন্তু আশাভঙ্গ হয় অচিরেই। কার্যত তাদের কোনও দাবিই মানেনি সরকার। নিয়ম মোতাবেক গ্রাম সভার অনুমোদন এমনকি কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই ক্ষতিপূরণের অর্থ পাঁচ লাখ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে বারো লাখ করা হয়, যদিও তাদের দাবি ছিল পরিবার পিছু ন্যূনতম ২৫ লক্ষ টাকা। সরকার জানিয়ে দিয়েছে আর এক পয়সাও বাড়ানো সম্ভব নয় ক্ষতিপূরণের অঙ্ক। বুন্দেলখণ্ডের ভূমিপুত্র গোণ্ড, কোল ও অন্যান্য আদিবাসীদের যাবতীয় দাবি নস্যাৎ ক’রে, বহু সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে অর্জিত বনাধিকার আইনকে উড়িয়ে দিয়ে প্রকল্প রূপায়ণে নামানো হয় তথাকথিত উন্নয়নের বুলডোজার। ইতিমধ্যেই জেসিবি-র শাসনে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ৩০০ ’র বেশি বাড়ি। কাটা পড়েছে বারো হাজারেরও বেশি গাছ। গ্রামের পর গ্রাম ঘিরে কেটে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ।
আদিবাসীরা তাই নতুন উদ্যোমে শুরু করেছে চিতা আন্দোলন। নতুন করে অনশন শুরু করেছেন অমিত ভাটনগর। অনশনে যোগ দিয়েছেন মাঝগাঁও ও রুঞ্ঝ সেচ প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরাও। সরকার কার্যত আদিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর আগে গত ৮ মে অমিত ভাটনগর সহ আন্দোলনের মাথাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মিথ্যা মামলায়। আটকানো হয়েছিল আদিবাসীদের দিল্লি যাত্রা। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর আবারও নতুন করে মামলা করা হয়েছে অন্তত ২৫০ জনের বিরুদ্ধে। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পের অন্তর্বর্তী দৌধন বাঁধ নির্মাণের জন্য ৩৩৮৯ কোটি টাকার বরাত পেয়েছে হায়দরাবাদ নির্ভর এনসিসি লিমিটেড। ছত্তিশগড়ের হাসদেও আরন্দ হোক বা ওডিশার সিজমালি পাহাড়, গ্রেট নিকোবর হোক বা বুন্দেলখণ্ড– বর্তমান বিজেপি সরকার আদতে এই ভারত ভূমির আদিমতম জনজাতিগোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে দাঁত নখ বের করে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত প্রাণ, বুলডোজার প্রেমী সরকারের প্রান্তিক মানুষদের উচ্ছেদের ব্লুপ্রিন্ট সর্বত্র একই, তা সে এই রাজ্যের হকার উচ্ছেদই হোক বা বুন্দেলখণ্ডের আদিম জনগোষ্ঠীকে ভিটেমাটি ছাড়া করাই হোক। আর যাঁরা এসবের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে তাঁদের গায়ে সেঁটে দেওয়া হবে উন্নয়ন বিরোধিতার তকমা, ঠিক যেমন ছত্তারপুরের জেলা আধিকারিক অমিত ভাটনগরদের উন্নয়ন বিরোধী হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এমনকি জল জমি পাহাড় জঙ্গলে আদিবাসীদের চিরায়ত অধিকারের প্রশ্ন তুললে চাই কি আপনাকে আর্বান নকশাল এমন কি রাষ্ট্রদ্রোহী হিসাবে দাগিয়ে দিয়ে ‘গুন্ডা দমন’ আইনে বিনা বিচারে জেলেও পুরে দিতে পারে এই সরকার।
অমিত ভাটনগর সহ একাধিক আদিবাসী এই মুহূর্তে গোড়ালি ডোবা জলে কাঠের চিতা সাজিয়ে আমরণ অনশন করছে আদিবাসী জনজাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে। ছত্তারপুরের বারানা নদীর তীরে চরম উৎকন্ঠায় ন্যায় অথবা মৃত্যুর প্রতীক্ষায় দিন যাপন করছে কয়েকশো’ আদিবাসী। আওয়াজ উঠছে ন্যায় দো ইয়া মার দো। আওয়াজ উঠছে জমির বদলে জমি দাও। না; মূল ধারার মিডিয়ায় এতটুকু অনুরণন নেই সেই আওয়াজের। যেমন নেই সোনাম ওয়াঙচুকের অনশনের খবর, তেমনই নেই অমিত ভাটনগরদের আমরণ অনশন নিয়ে এতটুকুও আলোচনা। কিন্তু আদিবাসীদের সেই আকুল আর্তি কি পৌঁছাবে না আমাদের কানেও? আমাদের প্রিয় স্বদেশভূমির জল জমি জঙ্গলের এহেন কর্পোরেট লুট দেখেও কি মুখে কুলুপ এঁটে থাকবো আমরা? আমরা কি ভুলে যাবো এই সত্য, যে এ দেশটা আসলে ওই আদিম জনগোষ্ঠীভুক্ত প্রান্তিক মানুষগুলোরই, যাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে সর্বাত্মক যুদ্ধে নেমেছে সরকার!
Comments :0