রণদীপ মিত্র
দক্ষিণী ‘অ্যাকশন থ্রিলার’ এখন বেশ জনপ্রিয়। যেখানে দেখা যায় ‘বাহুবলী’র নানান
‘রঙিন’ চরিত্র একাধারে নিয়ন্ত্রণ করছেন রাজনীতি, সরকারকে। কথায় কথায় লালচোখ, এক ইশারায় বিপক্ষকে ‘খতম’ করে দেওয়ার কাহিনি বেশ আকর্ষণ করে অনুরাগীদের। তবে সিনেমার পর্দায় বা মোবাইলের স্ক্রিনে এই আস্বাদ গ্রহণের খুব একটা সূযোগ নেই ধূসর জনপদে। যেখানে দিনের আলো ফুটতেই ধুলো ওড়া শুরু হয় ৩০-৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে। ৮-১০ হাজার একর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা খাদান আর পাথর ভাঙার কল যার উৎস। বিস্তীর্ণ এই জনপদের নাম পাঁচামী। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পাথর বলয়। যেখানে সিংহভাগ বাসিন্দার রুটি রুজির সংস্থান হয় পাথরের ধুলো মেখে দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে। স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণী সিনেমার স্বাদ নেওয়ার টান খুব একটা জন্মায় না তাঁদের। সাম্প্রতিককালে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়া ‘ওটিটি’র সদস্যপদ গ্রহণের ভাবনা তাঁদের স্বপ্নেও আসে না। তবে দক্ষিণের কোনও এক ‘অ্যাকশন’ মুভি যদি এঁদের দেখানো হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই ভেসে আসবে মন্তব্য, ‘এ তো আমরা প্রতিদিন নিজের চোখে দেখছি’।
‘টুলু সাম্রাজ্যে’র বিস্তারই তো পাঁচামীর গতরে খাটা মানুষগুলোর কাছে দক্ষিণী সিনেমার সমার্থক। আজ টুলু মণ্ডল লুটের সাম্রাজ্যের অধিপতি হিসাবে চর্চিত নাম। আছে আরও অনেক। তবে টুলু টেক্কা দিয়েছে সবাইকে। ‘ডিফেন্ডার’ গাড়িটি দাঁড়ানোর সাথে সাথেই দরজা খুলে আগে প্রথমে সাফারি পরিহিত দুই নিরাপত্তারক্ষীর বেরিয়ে আসা, তাঁরা দরজা খুললেই তবেই ‘মালিকে’র মাটিতে পা দেওয়ার দৃশ্যই তো পাঁচামীর কাছে দক্ষিণী সিনেমার আয়না। পেছনের গাড়ি থেকে জনা পনেরো যুবক ছুটে আসা মালিককে ‘কনভয়’ করার ছবি চেলি ভেঙে বোল্ডার করা সুমতি, ময়না, লখীরামরা হাঁ করেই দেখে এসেছেন। কোটি টাকার নিচে কোনো গাড়িতে চাপতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য নন পাঁচামীর ‘ডিসিআর সম্রাট’ টুলু ওরফে মহম্মদ নিজামুদ্দীন। ‘রেঞ্জ রোভার’, ‘মার্সিডিজ’, ‘বিএমডব্লিউ’, ‘অডি’... কী নেই টুলুর। এক-একটি গাড়ির দাম আড়াই থেকে তিন কোটি। পঞ্চাশ লাখের ‘ফরচুনার’, ‘ইনোভা’ চাপেন তাঁর কর্মচারীরা!
লুটের বহর:
শুধু পাঁচামী থেকে গড়ে প্রতিদিন পাথর বোঝাই হয়ে বেরোনো লরি-ডাম্পারের সংখ্যা কম করে দু’হাজার। গড়ে যদি তিরিশ টন করেও পাথর বোঝাই করে থাকে তাহলে গাড়ি পিছু রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়ায় ন্যূনতম ছয় হাজার টাকা। দু’হাজার গাড়ির দরুন এক কোটি বিশ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ে হয়ে থাকে প্রতিদিন। তবে এলাকার মতো, টাকার অঙ্ক আরও বেশি। মরশুম অনুযায়ী এই সংগ্রহ ওঠা-নামা করে। আদায়কৃত অর্থের কতটুকু জমা পড়ে এসেছে সরকারি কোষাগারে ? মাসে বড়জোর দশ কোটি। বাকিটা স্রেফ লুট হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি ভূমি দপ্তর গোটা বীরভূমের নানা পাথর বলয়ের রাজস্ব আদায়ের একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে এনেছে। তাতেই স্তম্ভিত করেছে লুটের অঙ্ক। গত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বীরভূমে পাথর থেকে রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ ৭২ কোটি ৭৮ লক্ষ টাকা। যেখানে গত এপ্রিল মাসে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৯ কোটি, মার্চে ছিল ১ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২২কোটি এবং জানুয়ারি মাসে ছিল ২১ কোটি টাকা। বলার অপেক্ষা রাখে না, লুট হয়ে যাওয়া সিংহভাগ টাকার ভরকেন্দ্র অবশ্যই ছিল পাঁচামী। আর সেই ভরকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রক ‘শৌখিন’ টুলু মণ্ডলের জীবন যাপনের সাথে দক্ষিনী সিনেমার ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ চরিত্রের মিল পাওয়া তো স্বাভাবিক।
নজর পড়লেই হলো :
অপেক্ষা ছিল স্রেফ টুলুর ‘নজর’ পড়ার। সে খাদান হোক বা ক্রাশার, বিল্ডিং হোক বা জমি— মালিকের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনও দাম ছিল না। ‘মণ্ডলে’র পছন্দই শেষকথা। দামও ঠিক করে দিত ‘মণ্ডল’ই। নিজের সখের সম্পত্তি ফ্যাল ফ্যাল চোখে হাতছাড়া হতে দেখা মানুষের সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবে না। নিজের মেয়ের বিয়ের আসর যে বিরাট মাঠে বসিয়েছিল টুলু মণ্ডল সেই জমিও হস্তাগত করেছিলেন জোর করে। একাধিক মালিক ছিল জমির। সবাইকে টাকা ধরিয়ে জমি রেকর্ড করে নিয়েছিলেন নিজের নামে। জমিহারাদের মধ্যে একজন সিউড়ির নিখিল অঙ্কুর। অবশেষে মামলা করেছেন সাহস করে। এই বিয়েতে পাত পড়েছিল বলিউডের, শ’কোটি উপরে খরচে হওয়া এই বিয়ের আয়োজন চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল সকলের। এই একটি জমি নমূনা মাত্র। তালিকা করলে গুণে শেষ করা যাবে না। প্রশাসন-পুলিশ জানত না এসব ? পুলিশ-প্রশাসন-রাজনৈতিক নেতাদের নানা স্তরের ফিরিস্তি না দিয়ে একবাক্যে বলা যায় রাজ্যের সরকার সব জানত। সরকারের মদতেই চলেছে লুটেরার দাপট। নিচের তলার সরকারী কর্মী-আধিকারিক-শাসকদলের নেতারা স্রেফ সহযোগী হয়ে ‘ভেট’ গ্রহণ করে এসেছেন। তা না হলে নিজের ব্যবসার সুবিধার জন্য নদীরবুকে আস্ত কজওয়ে বানানো যায়!
কজওয়ের কাহিনি :
নির্বিচারে বালি উত্তোলনের ফলে বছর দুয়েক আগে ফাটল ধরা পড়ে সিউড়ির উপকণ্ঠে থাকা ময়ূরাক্ষী নদীর উপর তিলপাড়া ব্যারেজে। দিন কয়েকের মধ্যে জল বিভাজিকার দেওয়াল ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় উত্তরবঙ্গের সাথে যোগাযোগের অন্যতম এই পথে যানচলাচল। পাঁচামীর পাথর সরবরাহের মধ্যে পড়ে বিপাকে। ‘মুশকিল আসান’ করে দেন এই টুলু মণ্ডলই। তিলপাড়া ব্যারেজের পাশে নিজের খরচায় বানিয়ে দেন আস্ত কজওয়ে। পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে। নেই কোনও নকশার অনুমোদন। নেই দরপত্র। নেই পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র। নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ করে সেচ দপ্তরের একপাতার একটি ‘নো-অবজেকশন’কে হাতিয়ার করে ব্যবসার ক্ষতি আটকাতে ময়ূরাক্ষীর বুক চিরে দাঁড় করিয়ে দেন কজওয়ে। বিনিময়ে গাড়ি পিছু দু’শো টাকা করে আদায় করে খরচের ঢের বেশি অঙ্ক টুলু মণ্ডল পকেটস্থ করেন বলেই অভিযোগ।
লুটের জনপদে কাজের আকাল :
দেদার লুটের সাম্রাজ্যে কাঁচা টাকার পাহাড় জমে মালিকপক্ষের ঘরে ঘরে। শুধু টুলু নয়, টুলুর স্নেহধন্য , তাঁর আত্বীয় , পরিজন, পেয়াদা ও জো-হুজুরি করা অগুণিত মালিক বেশ জমিয়ে করছেনে রোজগার। পাঁচামী সাক্ষী হয়েছে, একের পর এক বিদেশি ক্রাশার ইউনিটের, নিত্য নতুন যন্ত্রপাতি আমদানির। সুইডেনের নামী কোম্পানিও ব্যবসা ফেঁদে ফেলেছে এই পাঁচামীতে। কিন্তু কাজের আকালে ধুঁকছেন পাথর শ্রমিকরা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, বিস্তীর্ণ এই শিল্পাঞ্চলেও আজ পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। নিজেদের লুটের পথ সুষ্ঠু রাখতে আমদানি হয়েছে ‘চারাই’ প্রথা। মহল্লা বেছে বেছে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে জায়গা। সেখানে মহিলারা লাঠি হাতে গাড়ি থামায়। পাথর লেবেল করার নামে গাড়ি পিছু পঞ্চাশ-একশো টাকা করে আদায় করে। আসলে এটা হচ্ছে মালিকপক্ষের নিজেদের দূর্নীতির সাথে গোটা আদিবাসী সমাজকে জড়িয়ে নেওয়ার কৌশল। এতে তো ভবিষ্যৎ নেই। বুঝতে পেরেই তো বিকল্প জীবিকার সন্ধানের দিশাহারা হয়ে বিঁভুইয়ে ছুট লাগাচ্ছেন আদিবাসীরা।
স্বাস্থ্যের জুটেছে তাচ্ছিল্য :
মালিকপক্ষের বাণিজ্যের ‘স্বাস্থ্য’ যাতে বেহাল না হয় তার দিকে ঢের নজর রেখেছে সরকার। বিনিময়ে গরিবের স্বাস্থ্য কী পরিমাণ খেসারত দিয়েছে তাঁর নমুনা পাঁচামী ভরকেন্দ্র ভাঁড়কাটা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, টিবি রোগী পাঁচামীর ঘরে ঘরে। দিনে কম করে একশো রোগীর পা পড়ে ভাঁড়কাটা হাসপাতালে। চিকিৎসক একজন। আসেন সপ্তাহে তিন দিন। বাকি চারদিন হাসপাতাল চলে চিকিৎসক ছাড়াই। আছেন একজন ফার্মাসিস্ট। কোনোমতে সামাল দেন। দু’জন নার্সের নাভিশ্বাস ওঠে রোগীর ভিড় সামলাতে।
নাবালিকা গর্ভবতী :
পাঁচামী এলাকায় মোট গর্ভবতীর তিরিশ শতাংশই নাবালিকা। অভাবের তাড়নায় মেয়েকে বেশিদিন ঘরে বসিয়ে রাখতে ভরসা পান না হতদরিদ্র মা-বাবারা। তাই বিয়ের বয়সের ধারেকাছে পৌঁছোনোর অনেক আগেই কোনোমতে পাত্র জুটিয়ে দায়িত্ব সারেন কন্যা সন্তানের জন্মদাতারা। ফলাফল কী ? স্বাস্থ্যের উপর চরম আঘাত সইতে হয় মেয়েদের। বয়সের আগেই হতে হয় গর্ভবতী। এছাড়াও সামাজিক নজরদারির অভাবে দিকভ্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটে চলেছে নিয়মিত। স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ছ’-সাত মাসে এই এলাকায় গর্ভবতীর সংখ্যা ৩০১। যার মধ্যে নাবালিকার সংখ্যা ৯৬! পনেরো বছরের নিচের গর্ভবতী হয়েছেন ৬ জন! বাকিদের বয়স ১৫-১৯-র মধ্যে। এই প্রবণতায় চিন্তার ভাঁজ স্বাস্থ্য দপ্তরের কপালেও। তারাও নিরূপায়। সামগ্রিক উদ্যোগ ছাড়া এটা রোধ করা সম্ভব নয় বলে মানছেন সকলেই।
শিক্ষায় ধাক্কা :
বিস্তীর্ণ পাথর বলয়ের শিক্ষার অন্যতম ভরসাস্থল গিরিজোর উচ্চ বিদ্যালয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, ছাত্র সংখ্যা কমতে কমতে প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। আগে যেখানে আটশোর ধারে পাশে থাকত পড়ুয়া। সেখানে এখন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চারশোর কিছু বেশি। স্থায়ী শিক্ষক পাঁচজন মোটে। আংশিক সময়ের তিনজন শিক্ষককে যোগ করে কোনোমতে চলছে পাঠদান। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত স্কুল ছাড়ছেন পড়ুয়ারা। কেউ চিরতরে বিদায় দিচ্ছেন শিক্ষাকে। কেউ ছেলেমেয়েকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ঝাড়খণ্ডের হস্টেলে। এই ভাঁড়কাটারই এনামুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৭২ জন পড়ুয়াকে পাঠদান করছেন মাত্র তিনজন শিক্ষক। পাঁচামী জুড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে আরও পাঁচটি। গড় করলে এই পাঁচ বিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্রের অনুপাত পয়তাল্লিশ শতাংশের উপরে। সমস্যা শুধু ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতেই নয়। সমস্যা রাস্তাঘাটের। কাঁদা পেরিয়ে, ডাম্পারের অবিরত চলাচলের উপর নজর রেখে স্কুলের পথে রওনা দিতে ভয় ভর করেছে বিপুল সংখ্যক পড়ুয়াদের মনে। আর হাবড়াপাহাড়ী অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র তো পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।
পাঁচামীর হরিণশিঙা, ঢোলকাটা, হাটগাছা, ভাঁড়কাটা, দেওয়ানগঞ্জ, সাগরবান্দি, শোলাগড়িয়া, জেঠিয়ার কালো পাথর আজ ‘সোনা’। পাহাড়ের এই ‘সোনা’ খুবলে খাচ্ছেন কারবারীরা। আর গ্রামপথের যন্ত্রণা কান্না জমাট ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েই থেকে যাচ্ছে —
পাহাড়ের বুক চিরে লুট হয় রোজ,
বুকফাটা যন্ত্রণার রাখে না কেউ খোঁজ
ধুলোয় ঢেকেছে গ্রাম, কাঁদে বনভূমি,
ক্ষমতার দাপটে আজ বিধ্বস্ত পাঁচামী।
Comments :0